প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনোয়ার হক: করোনা চিকিৎসায় বিড়ম্বনা, হয়রানি এবং বিপরীত চিত্র-৫

আনোয়ার হক:  ঢাকার রাস্তায় চিরচেনা ট্র্যাফিক জ্যাম, বিশৃঙ্খলা, অহেতুক প্রতিযোগিতা দেখতে দেখতে মধ্যম গতিতে এগুতে থাকি বাসার দিকে। কয়েকদিন আকাশ, রোদ, সূর্যের তীব্র আলো দেখার অনভ্যস্থ চোখে অন্য রকম অনুভূতি জাগায়। চোখ বন্ধ রাখি আধ এক মিনিট। আবার বাইরে তাকাই! বিভিন্ন ভবনে লাগানো নানান কোম্পানির সাইনবোর্ড দেখি, বুঝার চেষ্টা করি কতটা পথ পেরিয়ে কোথায় অবস্থান এখন। ঝুলন্ত ইন্টারনেট আর ক্যাবল টিভি লাইনের মাখামাখি দেখি আর ভাবি “কোন ঝুলন্ত তার থাকবে না ঢাকা শহরে!” কথাগুলো কি কোন অথরাইজড ব্যক্তি বলেছিলেন নাকি আমার মত কোন শৃঙ্খলা আর সৌন্দর্যকামী আমজনতার কেউ বলেছিল।

ভাবনায় আসে বিগত কয়েক দিনের হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্য সেবা কর্মীদের কথাবার্তা, আচার আচরণের ভিন্নতার চিত্রগুলো।
একই দেশে, একই শহরে, একই সরকারি অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকা তিনটি হাসপাতালের মধ্যে এতো পার্থক্য থাকে কি করে। তখন মনে পড়ে টিভি টকশোতে দেখা দেশের জ্ঞানী-গুণীদের মুখে বহুল উচ্চারিত সেই কথাঃ “এসব দেখার কি কেউ নাই?” আমার ভেতর থেকে নিঃশব্দ উত্তর আসেঃ দেখার যারা আছে তারা সিডেটিভ খেয়ে ঘুমিয়ে থাকে বলে দেখতে পায় না।

আমি তৃতীয় এবং শেষ হাসপাতালটিতে স্থানান্তরিত হবার পর প্রধান চিকিৎসক যখন প্রথম আমাকে দেখতে আসেন তখন তাঁর চারজন সহকর্মীকে আমার এক্স-রে রিপোর্ট, সিটিস্ক্যান রিপোর্ট, ইসিজি, ইকো, ব্লাডের রিপোর্টগুলো দেখতে বলেন। তারপর বলেন, “এই যার রিপোর্ট, যিনি নিজের হাতে নিজের খাবার খেতে পারেন তাকে আইসিইউতে রাখার প্রয়োজনটা কি ছিল? আর লাইফ সাপোর্ট লাগবে এমন প্রস্তাব দেয়ারই বা অর্থ কি?”
আসলে ডাক্তাররাও বোধহয় কেবল টাকার লালসায় গড়ে তোলা হাসপাতাল নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে জিম্মি। কর্তা ইচ্ছা কর্ম এবং বেতন ভাতা নিশ্চিত করার জন্য ফ্রন্টলাইনে থাকা চিকিৎসকরাই টার্গেট পূরনের শর্তমত এক অসহায় অবস্থার মধ্যে থাকেন আর তাই বদনামী পুরাটাই ডাক্তারদের কপালেই লেপ্টে থাকে। দেশের কয়টি প্রাইভেট হাসপাতালের মালিককে আমজনতার দেখার বা চেনার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়? মালিকরাতো পর্দার আড়ালে থেকেই তার লাভ লোকসানের হিসাব পেয়ে যান। সেই ভিত্তিতে নানান প্রতিভাধর বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীদের দিয়ে পলিসি, টার্গেট, কর্মপরিকল্পনার ছক তৈরি করে ফ্রন্টলাইনের কর্মীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। চোখ বন্ধ করে এসব ভাবতে ভাবতে অনেকটা পথই পাড়ি দেয়া হয়ে গেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝলাম বনানী পর্যন্ত চলে এসেছি।

দ্বিতীয় হাসপাতাল যারা আইসিইউতে রেখে ৩৬ ঘন্টায় আমার অবস্থা স্থিতিশীল করে তুলেছিল তাদের উপর তো সন্তুষ্টই ছিলাম আমরা। হঠাৎ লাইফ সাপোর্ট দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো কেন? আমার পরিবারের সদস্যরা ভর্তি ফর্মে এমন কি তথ্য দিয়েছিলেন যা দেখে তাদের ধারণা হয়েছিল যে বড় ভাল শিকার পাওয়া গেছে একট। চিপলে গাঢ় রস নংড়ানো যাবে। এই প্রশ্নগুলো এখনো আমার মাথা থেকে ডিলিট হচ্ছে না।
বাসায় এসে প্রচুর আনন্দ নিয়ে সবার আগে সিঁড়ি মাড়িয়ে উঠতে শুরু করে দোতলায় পৌঁছে গেলাম। তখনই দেখা দিল বিরাট এক বিপত্তি! ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাস, বুক ধড়ফড়ানি। মনে হচ্ছিল তীরে এসে বুঝি তরী ডুবে। হা করে জোরে জোরে শ্বাস-প্রশ্বাস চলাতে থাকলাম কয়েক মিনিট। অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এলে পালস অক্সোমিটারে আঙ্গুল ঢুকালামঃ অক্সিজেনের মাত্রা ৯৪ আর পালস ৯৯। তারপর এডভাইস সিটে দেখলাম স্পষ্ট লেখা আছে ১৫ দিন সম্পূর্ণ বেড রেস্ট অর্থাৎ ওভাবে সিঁড়ি বেয়ে ওঠা এডভাইসের খেলাপ হয়েছে যা অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। যার খেসারত দিলাম প্রায় আধাঘন্টা ব্যাপি।

আশ্বস্ত হয়ে ফ্রেস হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম আস্তে ধীরে। পোশাক পাল্টে ফ্রেস হতে হতে লাঞ্চের সময় হয়ে গেল। সংক্ষিপ্ত এবং পরিমিত লাঞ্চ গ্রহণ করে কয়েক কদম হেঁটে বিছানায় হেলান দিয়ে বসলাম কিছুক্ষণের জন্য। যোহর নামাজ আদায় করে এডভাস সিটে চোখ বুলিয়ে নিলাম দুবার। নিয়মিত দুটি এক্সারসাইজঃ ১. দুই ঘন্টা অন্তর আধা ঘন্টা উবু (পর্ন পজিশন) হয়ে শুয়ে থাকা এবং দৈহিক ৫-৬ বার ব্রেদিং এক্সারসাইজ করার নির্দেশনা দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম টিভি সুইসড অন করে ইউটিউবে এক্সারসাইজ দুটি ভাল করে দেখে দিতে হবে।

ঘুমাতে চেষ্টা করলাম৷ এটা সেটা ভাবতে ভাবতে ভাবতে বেশ কিছুটা সময় লাগলো ঘুমাতে। বিকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলাম গিন্নি এডভাইস অন ডিসচার্জ ফাইল ঘেঁটে ওষুধ পত্র গুছিয়ে রাখছেন সকাল, দুপুর, রাত আলাদা আলাদা করে। হাসপাতাল থেকে প্রেসক্রিপশনের সাত দিনের ওষুধ দিয়ে দেয়া হয়েছে। পনেরো দিনের জন্য প্রয়োজনীয় বাকি ওষুধ কেনার জন্য তালিকা প্রস্তুত হয়ে গেছে।

হালকা নাস্তা খেয়ে এডভাইস অন ডিসচার্জ ফাইলে আর একবার চোখ বুলিয়ে হাসপাতালের স্মৃতিচারণ করতে বসলাম দুজনে।

(সমাপ্ত)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত