প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনোয়ার হক: করোনা চিকিৎসায় বিড়ম্বনা, হয়রানি এবং বিপরীত চিত্র-৪

আনোয়ার হক: আব্বা নিয়মিত ফোন করেন, গিন্নির কাছ থেকে আমার অবস্থা জেনে আমার কন্ঠটা একটু শুনতে চান। যতদূর সম্ভব কন্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করি, কখনো পারি কখনো পারি না। বুঝতে পারি আব্বা চোখ মুচছেন। আম্মা বেঁচে থাকলে খুব কান্নাকাটি করতেন। কন্যা ফোন করে তার হসপিটালের কোভিড ইউনিটে ডিউটির ফাঁকে ফাঁকে। আমার সাথে কথোপকথন করে আমার কষ্ট বাড়াতে চায় না। বলে, “আমি কি বলি মন দিয়ে শোন, উত্তর দিও না।” কিছু উপদেশ দেয়, পরামর্শ দেয় আর সাহস জোগায়, “তোমার কিচ্ছু হবে না দেখো। কারণ তোমার ইমিউনিটি অভাবনীয় রকম ভাল। বড় জোর সাকুল্যে দুই সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হবে অক্সিজেন সাপোর্ট লাগছে বলে।” আত্মীয় স্বজন যারাই দেখতে আসেন সবার মুখে একই ধরনের কথা, “আপনার জন্য অসংখ্য মানুষের দোয়া আছে, শুধু মনের জোর ঠিক রাখেন। আল্লাহ একটি পরীক্ষায় ফেলেছেন, আপনি পাশ করে যাবেন ইনশাআল্লাহ।” মনে হয় যেন কেউ কেবিনে আসার আগে কথাগুলো কেউ শিখিয়ে দেয়!

আমি মনোবল হারাইনি কখনো, তারপরও দুই এক বার যে মৃত্যু ভয় তাড়া করেনি তা কিন্তু নয়; বিশেষ করে আইসিইউতে থাকার সময়কালে। কেবিনে স্থানান্তরিত হবার পর মনের জোর ও সাহস অনেক বেড়ে গিয়েছিল।

অক্সিজেন সাপোর্ট ক্রমাগত ৫, ৪, ৩, ২ লিটারে নামলো। আমি অধিকতর সময় অক্সিজেন টিউব খুলে রাখা শুরু করলাম। ২ লিঃ চলার ২৪ ঘন্টা পর অক্সিজেন সাপোর্ট বন্ধ করে দিয়ে পরবর্তী ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হলো আমাকে। ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ায় পরদিন সেকালের রাউন্ডে এসে প্রধান চিকিৎসক ক্যানোলা খুলে ফেলতে বললেন আর স্যালাইন দরকার নাই বলে। আমি বুঝলাম আমাকে ছাড়পত্র দেয়া চুড়ান্ত পদক্ষেপ এটি। এর পরদিন সকালে সব দেখে শুনে বুঝে প্রধান চিকিৎসক তাঁর সহকারীকে বললেন আমার ফাইল সামারী উনার বরাবরে সাবমিট করতে। আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, “কাকা, অনেক দিনতো হসপিটালে আছেন তাই সুস্থতা পুরাপুরি অনুভব করতে পারছেন না। আগামীকাল সকালে বাড়িতে চলে যান… ভাল লাগবে, অনেক বেশি সুস্থ বোধ করবেন।”

পরদিন সকালের রাউন্ডে এসে সামারী ফাইলে ডিসচার্জ ওর্ডার লিখে স্বাক্ষর করে রিলিজের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেন তাঁর টিমের একজন সিনিয়র ডাক্তারকে। ছোট ভাই একাউন্টস সেকশন থে‌কে বিল কপি নিয়ে এসে অপেক্ষায় থাকলো ঘন্টা দুয়েক। গিন্নি আমাদের জিনিসপত্র একজন সাহায্যকারীর সহায়তায় গুছিয়ে নিলেন যেন বিল পরিশোধ করে ডিসচার্জ অর্ডার হাতে পাওয়া মাত্রই রওনা হওয়া যায়। অনিক নামের ছেলেটি হুইল চেয়ার এনে রাখলো। সে বুঝালো এতো দিন শুয়ে শুয়ে কাটিয়েছেন হঠাৎ হাটতে গেলে খারাপ লাগতে পারে। আমি আপনাকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে আসবো। ফাঁকে ফাঁকে আয়া, বুয়া, বয়, বেয়ারা, ফুড ডেলিভারি বয়রা আসতে শুরু করলো বিদায়ী সাক্ষাৎ করতে। গিন্নি তাদের বকশিশ দিচ্ছেন। তারা হাসি মুখে বেরিয়ে যাচ্ছে। আহা… কি আনন্দময় দৃশ্য। স্বাক্ষর হওয়া ডিসচার্জ অর্ডার ফাইল একাউন্ট সেকশনে চলে গেছে, এখন বিল পরিশোধ করে দিন বলে ইন্টারকমে বার্তা পেয়ে ছোটভাই একাউন্ট সেকশনে চলে গেল বিল পরিশোধ করতে। গিন্নি ডক্টরস স্টেশনে গেলেন প্রেসক্রিপশন এন্ড এডভাইস সীট বুঝে নিতে।

আরও প্রায় আধা ঘন্টা পর হুইল চেয়ারে বসে লিফটে নীচে নেমে গাড়িতে বসলাম। এডভাইস অন ডিসচার্জ সিটটা পড়ে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম৷ অল্প কিছু খাওয়ার ওষুধ, দুইটি স্প্রে আর দুইটি এক্সারসাইজ নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা আছে তাতে এবং দুই সপ্তাহ পর প্রধান চিকিৎসক মহোদয়ের খাস কামড়ায় সাক্ষাতের পরামর্শ, আগের দিন ফোন করে চেম্বার সহকারীর কাছ থেকে সিডিউল নেয়া সাপেক্ষে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত