প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: আমি, রশীদ হায়দার ও তাঁর কালজয়ী রচনা ‘স্মৃতি-৭১’

দীপক চৌধুরী: কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সুবক্তা রশীদ হায়দার আর আমাদের মধ্যে নেই এটাই খবর। বাংলাদেশের লেখালেখির যুদ্ধমাঠে তিনি ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ। এমন কোনও বিষয় নেই যা রশীদ ভাই জানতেন না। আমি জানি, রশীদ ভাই গল্পকার, ঔপন্যাসিক। ইতিহাসের বহু বাঁকে তাঁর আনাগোনা ছিল। বহুবার বলেছি, রশীদ হায়দার ভাই একটু কথা বলতে চাই। কখন আসবো? উত্তরে বলেছেন, ‘বলে ফেলো। এখনই বলে ফেলো।’
তিনি এমনই ছিলেন।

-ভাই, একটু সময় দেবেন, আমি বাসায় আসবো বা অন্যখানে! আপনার পছন্দের জায়গায়।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার অফিসে ( বাংলা একাডেমি)।

বলছি আশি সালের মাঝামাঝি সময়দিকের গল্প। সম্ভবত রশীদ ভাইও তখন ধানমন্ডিতে থাকতেন। আমি তখন জগন্নাথ হলে ইস্ট হাউজে কয়েকদিন ছিলাম। দারুণ মানবতাবাদী ছিলেন। বাংলা একাডেমির মুখপাত্র ‘উত্তরাধিকার’ বের হতো। লিখলে ভালো টাকা পারিশ্রমিক পাওয়া যায়। বহু গল্প এই পত্রিকায় ছাপা হয়েছে আমার। প্রথম তাঁর সঙ্গে যখন দেখা করতে যাই তখন ১৯৮৫-৮৬ খ্রিস্টাব্দের কথা। তিনি আমাকে চিনতেন না, সুনামগঞ্জের দিরাই হাওর অঞ্চল থেকে আসা একটি যুবক। ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’ নামে একটি গল্প নিয়ে হাজির হয়েছি। গল্পটি টেবিলের ওপর রেখে দিলেন।
-লেখাটি কী দয়া করে পড়ে দেখবেন, স্যার?
-কেন নয়?
আমার দিকে মাথা উঁচু করে তাকালেন রশীদ হায়দার।

-আমার তো এমন কেউ নেই, স্যার? যাঁর কথা আপনাকে বলতে পারি। রেফারেন্স দিতে পারি।
শুধু স্যার স্যার করছো কেন? রেফারেন্স নো নীড। কিছুরই দরকার নেই।
-আমার একমাত্র পরিচয়.. ..
থামিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি তো রোববার ঈদ সংখ্যায় একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প লিখেছ। বড় গল্প। গল্পের নামটা যেন, ‘দেশান্তর।’
আমি মাথা নিচু করি।
-জি, ঠিক বলেছেন।
-চমৎকার লিখেছো। দারুণ গল্প। তোমার বাড়িতো সুনামগঞ্জ, তাই না?
-জি।
-একাত্তর-এ মেঘালয়ের পাদদেশ মৈলাম ক্যাম্পে ছিলে নাকি?
-ছিলাম। তখন শিশুকাল ছিল।
একমাস পর বাংলা একাডেমিতে গেলাম গল্পের খোঁজ নিতে।
দোতলায় উঠতেই দেখা হয়ে গেল রশীদ হায়দারের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয় সহপাঠি এক বন্ধু ছিলো আমার সঙ্গী। হাতে থাকা কিছুকাগজ। রশীদ হায়দার বললেন, তোমরা আমার রুমে গিয়ে বসো। আমি আসছি।
ত্রিশ মিনিট পর এসে বললেন, স্যরি দেরি হয়ে গেছে। তোমার গল্পটার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন ডিজি সাহেব।
রশীদ হায়দারের মুখের দিকে তাকাই।
-আরেকজন বুড়ো লেখক লিখেছেন, বৃষ্টি ও রমণীগণ।
-জি, জানি না।
-ডিজি সাহেব মানে জানো তো কে? উনি ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক।
মাথা নাড়ি হ্যাঁ ভঙ্গিতে তবে আমরা নিরুত্তর থাকি।
-তুমি এতো সুন্দর গল্প লিখতে পারো কীভাবে? বাহ্ অসাধারণ লিখেছো। ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’।
আমি আবার মাথা নামিয়ে ফের উনার মুখোমুখি তাকাই।
-গল্প ভালো কিংবা অর্থবহ হয় কীভাবে?
রশীদ হায়দারের মুখের দিকে তাকাই। ‘জি বলবো আমি!’
-তুমিই তো বলবে, এখানে অন্য কেউ আছে নাকি?
আমতা আমতা করে বলি, জীবন থেকে নেওয়া ঘটনা আর কল্পনার মিশেল থাকলে গল্প মজার হয়, সুন্দর হয়, পড়তে ভালো লাগে। শুধু কল্পনায় গল্প ভালো লাগে না, ভালো লিখা যায় না।
অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন রশীদ হায়দার। একটু পর বলেন, চলো।
-চলো, ডিজি সাহেবের রুমে। উনি আপনাকে দেখতে চান।
-ভাই, তুমি করে বলেন আমাদের। একবার আপনি একবার তুমি। ভালো লাগে না। খুশি হবো তুমি করে বললে। আনন্দিত হবো।
আমার মুখ থেকে হাঁ-না শোনার বা কোনও কথা বলার প্রয়োজন মনে করেননি রশীদ হায়দার। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, আমাদের লোক দরকার।

ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের কক্ষ থেকে এলাম। চা-বিস্কিট খেয়েছি সেখানে। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা নয়, আমার নিজ জেলা, বাড়ি-গ্রাম সবকিছু জেনে নিয়েছেন হেনা সাহেব।
রশীদ হায়দারের সঙ্গে এভাবেই পরিচয় হয়েছিল আমার। শুধু ছোট্ট একটি বাক্য প্রথমদিন তিনি বলেছিলেন, ‘সাহিত্যগুণই একজন লেখকের প্রথম ও একমাত্র পরিচয়।’

অসংখ্য গল্প, উপন্যাস তিনি লিখেছেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ গবেষক রশীদ হায়দারের কালজয়ী রচনা বা শ্রেষ্ঠ অবদান, ‘স্মৃতি-৭১’। এটা পড়ে আমি অবাক হই। মনোমুগ্ধকর রচনা। প্রভু যেনো রশীদ হায়দারকে তাঁর প্রিয় জায়গায় স্থান দেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই এতো গুণী, নির্মোহ, মেধাবী ছিলেন যা প্রকাশ করা কঠিন।
লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।

 

 

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত