প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বপ্না রেজা: পারি না? পারি তো!

স্বপ্না রেজা: বাংলাদেশ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হয়েছিল। নিরস্ত্র বাঙালী চেতনার অস্ত্রে শত্রুমুক্ত হয়েছিল, দেশটার বুকে একটা স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের পতাকা উড়িয়েছিল। সেই দেশটার বয়স এখন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। ছুঁই ছুঁই বলছি কেনো, বলা যায় পঞ্চাশ। ঊনপঞ্চাশোর্ধ সেই দেশে খুব সহজ কাজ হলো, চুরির অভিযোগে শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা, অপরাধের অভিযোগে পুলিশ দ্বারা আটকৃত হয়ে জেলে যাওয়া, কন্যা শিশু নিজেকে নারী হিসেবে বুঝবার আগেই তাকে ধর্ষণ করা এবং কোন নারীর ভুলত্রুটি কিঞ্চিত দেখা গেলে তা নিয়ে অপ্রীতিকর মহাকাব্য রচনা করে ফেলা এবং এমন কী নির্যাতনের শিকার নারীর সম্পর্কে আপত্তিকর তথ্য বাজারজাত করা, নারীকে উল্টো আসামী করে বিচারের আওতায় আনা। এককথায় শিশু ও নারী সহজলভ্য এ সমাজে দোষারোপে ও অত্যাচারে।

সম্প্রতি মিডিয়ায় ধর্ষণের সংবাদে সয়লাব। স্ক্রলে যদি দশটা সংবাদ প্রচার করা হয়, তার মধ্যে ৮টাই ধর্ষণ সংক্রান্ত। মিডিয়া ভেবে নিয়েছে এতেই সমাজ থেকে ধর্ষণ উড়ে যাবে, উবে যাবে। তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজটিই করছেন তাদের ব্যতিব্যস্ততা তেমন কিছু বলে। অথচ আমরা কমবেশি সকলেই বেমালুম ভুলে যাচ্ছি যে, সমাজে যে সকল শিশুর মুখে সবে বোল ফুটেছে, কানে বেশ স্পষ্ট শুনতে করেছে, ছবি দেখে বুঝতে পারে যা দেখছে সেটা কী, ঠিক এমন একটা মুহুর্তে সেই শিশুগুলো ধর্ষণ শব্দটার সাথে পরিচিত হচ্ছে। যদি বলি কেবল পরিচয়, ঠিক বলা হবে না তাহলে। শিশুদের কৌতুহল মন আরো বেশি কৌতুহলী হয়ে উঠছে এবং তা বেশ পোক্তভাবে। বিশেষত পুরুষ শিশুরা জেনে যাচ্ছে একজন পুরুষ খুব সহজে কীভাবে, কোথায় নারীকে ধর্ষণ করে, ধর্ষণ করতে পারে। সেও একদিন পরিপূর্ণ পুরুষ হয়ে উঠবে। তার শরীরেও একদিন পুরুষত্বের সব বৈশিষ্ট্য দেখা যাবে। অপরদিকে কন্যা শিশু জেনে যাচ্ছে পুরুষরা নারীকে কীভাবে ধর্ষণ করে,ধর্ষণের পর হত্যা করে। পুরুষ সম্পর্কে তার ভেতর নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জন্মে। ভীতিকর অনুভুতি তৈরি হতে পারে। কন্যাশিশুর ভেতর আস্থা, বিশ^াসের জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে ওঠে। একটা সংবাদ প্রচারমাধ্যমে কতটুকু দেয়া যায়, দেখানো যায়, তা বোধহয় মিডিয়া কর্তপক্ষের ভাবা দরকার, ভাবা দরকার ছিল। কারণ, শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য সুস্থ তথ্য, গল্প, ঘটনা প্রচারণার, প্রচারের প্রয়োজনীয়তা কিন্ত কম নয়। পরিবেশ হলো মানবজীবনের প্রথম পাঠশালা যেখানে মিডিয়া সেই পরিবেশের একটা বড় অংশ।

ছোটবেলায় দেখতাম এক ধরনের পত্রিকায় পিন মারা থাকতো। ওসব পত্রিকাকে বলা হতো পিনআপ পত্রিকা। ঐসব পত্রিকা পড়ার বিষয়ে পরিবারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল মুখের শাসনেই নয়, বরয় পারিবারিক আচারআচরণে লিপিবদ্ধ ছিলো। যাইহোক, পত্রিকা বিক্রেতারা রাস্তায় বিছিয়ে রাখতো বিক্রির জন্য। যা ছিল অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ধরাছোয়ার বাইরে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য নিষেধ বলেই পিনআপ মারা থাকতো। এখন অনলাইনের যুগে পিন মারার কোন সুযোগ নেই। সবকিছুই ওপেন টু বায়োস্কোপের মতো। সেইসাথে যুক্ত হয়েছে মিডিয়াগুলোর লাগাতার নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে খবরভিত্তিক মিডিয়ার দিকে তাকালে নিজেকেই ইদানীং অসুস্থ মনে হয়। ভালো কোন খবর, ভালো কোন গল্প খুঁজে ফেরার সময় নেই যেন। ভালো কিছুর পরিবেশণা যে শিশু মনে ভালো কিছু ভাবনার সুযোগ করে দেয়, দিতে পারে সেসব কল্পনায়ও নেই তাদের। এসব কথা বলার মানে এই নয় যে, সমাজের অসংগতি, অন্যায় তুলে ধরবার দরকার নেই। অবশ্যই আছে। সৎ ভাবাপন্ন মিডিয়া যতটা পারে সমাজের অসংগতি, অন্যায় আর অবিচারকে তুলে ধরতে, উপস্থাপন করতে তা রাষ্ট্রের অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তা সম্ভব নয়। অনুসন্ধানী চোখ গোয়েন্দা সংস্থার চাইতেও সাংবাদিকের বেশি যদিনা তিনি অরাজনৈতিক এবং দেশপ্রেমের প্রশ্নে অবিভাজিত হয়ে থাকেন। প্রশ্নটা এখানেই বেশি । কারণ, পেশাগত ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে অনেকেই বিতর্কের উর্ধ্বে থাকতে পারেন না।

পুলিশ চারজন শিশুকে ধরে থানায় নিয়ে গেছে। যাদের বয়স ৯ এর নীচে। যে বয়সটা মায়ের কোলে থাকবার কথা তাদের সম্পর্কে ধর্ষণের অভিযোগ। শিশুগুলো কেমন করে চিৎকার করে কাঁদছিলো টিভির পর্দায় প্রচারিত সংবাদে তা দেখা যাচ্ছিলো। পুলিশ সদস্যদের বেশ বাহাদুর মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, পাশ থেকে কেউ বুঝিয়ে দিচ্ছেন এবার দেশ থেকে ধর্ষণের মতো অনৈতিক কাজটা দূর হবে। কারণ, পুলিশ চার শিশু ধর্ষককে ধরতে সক্ষম ও সমর্থ হয়েছেন। অনেক পূর্ণাঙ্গ ধর্ষক আছেন সমাজে, যাদেরকে পুলিশ ধরতে পারেননি কিংবা ধরেন না। যাইহোক, এমন সংবাদ মিডিয়ায় প্রচারের পর এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ১০ বছরের একজন পুরুষ শিশু তার মাকে প্রশ্ন করলো, মা, শিশুরা কী ধর্ষণ করতে পারে ? শিশুরা কী ধর্ষক হয়, মা ?

মা ভড়কে গেলেন। এমনিতে স্কুল বন্ধ। সেই সুবাদে পড়াশোনার ব্যস্ততা শিশুদের তেমন একটা নেই। মা ও বাবা দুজনই চাকুরীজীবী। দিনের প্রায় পুরোটা সময়ে তারা বাসার বাইরে থাকেন। ধর্ষণ শব্দ এটুকুন ছেলের মুখে শুনে ভীত হলেন। তড়িৎ জবাব মায়ের, না বাবা। শিশুরা ফুলের মতন পবিত্র হয়, সুন্দর হয়। শিশুদেরকে তাই সবাই ভালোবাসেন। শিশু মনে প্রশ্ন, তাহলে পুলিশ যে চারজন শিশুকে ধর্ষণের কারণে ধরে নিয়ে গেলো ? কেমন করে পুলিশের গাড়ীতে উঠালো ! মা বললেন, পুলিশ ভুল করেছে, বাবা। তাদের ভুল হয়েছে।

শিশুমনের প্রশ্ন শেষ হয় না। জানতে চায় যে ঐ চারজন শিশু কী তাদের খেলার সাথীকে ধর্ষন করেছিল। সবশেষে তার প্রশ্ন, ধর্ষণ কী এবং কেনো পুরুষ ধর্ষণ করে। প্রসঙ্গ পাল্টিয়েছেন মা। এই প্রশ্নের উত্তর মধ্যবিত্ত পরিবারের মা দেননি। দিলে কী হতো আর না দিলে কী হতো জানতে চাইলাম এবার। মাথা নিচু করে বললেন, আমি চাইনা এই বয়সে আমার শিশু ধর্ষণের মতো শব্দটার সাথে পরিচিত হোক, জানুক। অথচ এই সমাজে এমন অনেক পরিবার আছেন যারা বাস্তবতা, সচেতনতা এবং আধুনিকতার অজুহাত দেখিয়ে বলেন, শিশুদের সব জানতে দেয়া উচিত। এসব পরিবারের শিশুরা অবাধে, অনায়াসে পরিণত বয়সের আগেই অনেক কিছু জেনে যায়, শিখে যায়।

চারজন শিশু যে পরিবারের তার মাঝে আধুনিকতার ছাপ দেখা যায়নি। ওদেরকে ভ্যানে উঠানোর সময় ওরা হাত পা ছুড়ে কাঁদছিলো । এ্যটনি জেনারেল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই ঘটনায়। জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্টেট ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থণা করেছেন। একই সাথে প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় মেয়েশিশু ধর্ষণের খবর ছাপা হচ্ছে এবং যারা ধর্ষণ করছেন তারা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক।

ধর্ষণ হঠাৎ করে বাড়েনি, বেড়েই ছিল । আমরা এখন যারা নিজেদেরকে সচেতন বলে দাবী করছি হয়ত তারা কথা বলায়, প্রতিবাদ প্রকাশে কমজোর ছিলাম। ঘুমিয়ে ছিলাম। যাইহোক অনৈতিক কর্মকান্ড রোধ, প্রতিহত ও নির্মূলের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই দায়িত্ব রয়েছে, দায় রয়েছে। সকল ধরনের অপরাধ নিমূর্লের জন্য প্রথমত দরকার সুস্থ পরিবেশ। আইন প্রয়োগ করে অপরাধী ধরা সম্ভব, অপরাধকে নয়। অপরাধ দূর করবার জন্য উপযুক্ত সামাজিক শিক্ষা, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা জরুরী যা আইন প্রয়োগের পথকে স্বচ্ছ রাখবে।

আর নিজেদের জনপ্রিয়তার জন্য এমন কিছু অহরহ প্রচার না করি যাতে তার নেতিবাচক প্রভাব সমাজের শরীরে ক্ষত তৈরি করে আরো দূর্গন্ধ ছড়ায়। বরং ভালো কিছু নিয়ে ভালো একটা আন্দোলন করি যেন ভালোয় ভরে উঠে এই দেশ। পারি না ?

স্বপ্না রেজা: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

 

 

 

 

 

সর্বাধিক পঠিত