প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আনোয়ার হক: করোনা চিকিৎসায় বিড়ম্বনা, হয়রানি এবং বিপরীত চিত্র-২

আনোয়ার হক: একই এলাকার অন্য একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত এক আত্মীয় এসোসিয়েট প্রফেসরকে ফোন করা হলো পরামর্শের জন্য। তিনি সিটিস্ক্যানসহ পরীক্ষা নিরীক্ষার সব রিপোর্ট নিয়ে তাঁর কাছে যেতে বললেন এই জন্য যে তিনি তার হাসপাতালের করোনা বিভাগের প্রধানের সাথে কথা বলবেন। চেষ্টা তদবির করে দ্রুত ফেরত নিয়ে আসার শর্তযুক্ত মুচলেকায় স্বাক্ষর করে অনতিদূরের হাসপাতালটিতে পৌঁছানো হলো। সব দেখেশুনে এই হসপিটালের করোনা বিভাগীয় প্রধান বিষ্ময় প্রকাশ করলেন। বললেন, এই রোগীর তো ICUই দরকার নাই, লাইফ সাপোর্ট লাগবে কেন? যান, মুচলেকা দিয়ে ছাড়পত্র নিয়ে এক্ষুনি রোগী এখানে নিয়ে আসুন। আমরা কেবিনে রেখে চিকিৎসা করবো।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামি নামি করছে, এমন সময় একজন নার্স আমার একসেট পোশাক হাতে দিয়ে বললেন, এগুলো পরে নিন। এখান থেকে আপনাকে অন্য হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হবে। নিজে নিজে ট্রাউজার পরে ফেললাম। নার্স এবং ওয়ার্ল্ড বয় মিলে পাইপ/টিউব ম্যানেজ করে শার্ট পরিয়ে দিলেন। পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ হুইল চেয়ার এলো। আমাকে বেড থেকে নামিয়ে হুইল চেয়ারে বসিয়ে সেন্টাল অক্সিজেন মাস্ক খুলে পোর্টেবল সিলিন্ডারে যুক্ত মাস্ক মুখে চাপানো হলো। তারপর এম্বুলেন্সে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তৃতীয় হসপিটালে স্থানান্তরিত হলাম। বেডে উঠিয়ে সেন্ট্রাল অক্সিজেন মাস্ক পরানো হলো। একাধিক ডাক্তার, নার্স, বয় আমার নানান ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত রইলেন কয়েক মিনিট। লম্বা হয়ে শুয়ে থাকার পরামর্শ দিলেন। একজন টেকনিশিয়ান বেশ কিছু রক্ত নিলেন কিছু অতি জরুরী পরীক্ষার জন্য।
একজন চিকিৎসক একটি ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিকে সাতটি ইনজেকশন নিয়ে দ্রুত চলে আসতে বললেন আর আমাদের জানালেন হাজার ত্রিশেক টাকা রেডি রাখতে। সম্ভবত প্রতিটি ইনজেকশনের পরিমাণ ১০০ মিঃলিঃ যেটি প্রতিদিন সন্ধ্যার পর স্যালাইন টিউবের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হতো। এছাড়া প্রতিদিন নাভীর পাশে সহ মাসলে এবং স্যালাইনের মাধ্যমে বেশ কিছু ইনজেকশন দেয়া হতো। মুখেও কিছু ট্যাবলেট, ক্যাপসুল খাওয়ানো হতো।
তৃতীয় এই হসপিটালটিতে আমার জন্য একটা ডিলাক্স কেবিন বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল যেটার সাথে পূর্বতন হসপিটালের ICU-এর খুব আকাশ পাতাল পার্থক্য আছে বলে মনে হচ্ছিল না।
এখানে চিকিৎসার প্রতিটি দিন লিড ফিজিসিয়ান তাঁর চার সদস্যের টিম নিয়ে সকাল আটটায় এবং বিকেল পাঁচটায় আমাকে দেখতে আসতেন। কিছু পুরানো নির্দেশনা বাতিল/স্থগিত করে নতুন নির্দেশনা যুক্ত করতেন। টিমের ডাক্তারগণ সে মতে পালা করে দুই তিন ঘন্টা পর পর কেবিনে আসতেন। কেউ জ্বর, কেউ অক্সিজেন মাত্রা, কেউ রক্তচাপ ইত্যাদি পরীক্ষা করতেন আর আমাকে নানানভাবে সাহস জোগাতেন। নেত্রকোনা এলাকার (উপজাতি) দুটি ফুটফুটে মেয়ে নার্স পালা করে আমার ডিউটি করতো । তাঁদের সেবা মনে রাখার মত। “বাবা কেমন আছেন এখন?” বলে কেবিনে ঢুকতো। স্যালাইন বদল, ইঞ্জেকশন পুশ করা, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল খাওয়ানো ইত্যাদির জন্য ঘনঘনই আসতো ওরা। আর প্রয়োজনে কলিং বেল চাপলেতো হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতোই। যখন তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকতাম তখন ওদের কথা কানে এলে মনে হতো আমার কন্যাই যেন কথা বলছে! ছাড়পত্র পেয়ে হাসপাতাল ছাড়ার সময় মনে হচ্ছিল আমার দুটি মেয়েকেই যেন ছেড়ে যাচ্ছি! অন্যান্য নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়া, সেবাকর্মী সবার কাজই যথার্থ এবং যথেষ্ট মানোত্তীর্ণ বলে মনে হয়েছে আমার কাছে; এগুলো সবই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আমি সর্বোপরি এই হসপিটালটিকে কোন সার্টিফিকেট দিচ্ছি না। অন্যদের অভিজ্ঞতা আমার সাথে নাও মিলতে পারে। অনিক নামে ১৯-২০ বছর বয়সী বরিশালের ছেলে ওয়ার্ডবয়টা সবাইকে ছাড়িয়ে একটু বেশি আপন হয়ে উঠেছে। সে এখনো ফোন করে নিয়মিত খবর নেয় আমার। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত