প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে জিতছে চীন

রাশিদ রিয়াজ : যদিও বিশে^র অধিকাংশ দেশ মন্দা থেকে পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা বন্ধ করে নতুন করে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে তখন চীনের অর্থনীতি ফের ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের আগের অগ্রগতিতে ফিরে গেছে এবং আগামীতে তা আরো প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। সিএনএন

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিসেবে চীনের অর্থনীতি মন্দা এড়াতে বাধ্যতামূলকভাবে বেশ আগেভাইগে লকডাউন আরোপ করে। বিশ্বব্যাংক বলছে এবছর চীনের জিডিপি বৃদ্ধি পাবে ১.৬ শতাংশ এবং বিশ^অর্থনীতির আকার থাকবে ৫.২ শতাংশ। শুধু লকডাউন আরোপ নয় চীনা নাগরিকদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিল চীন। এলাকাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক পাঠিয়ে ব্যাপকভাবে ঘরে ঘরে কোভিড পরীক্ষায় দেশটির নাগরিকরা যথেষ্ট পরিমানে সাড়া দেন। এলাকায় এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা তাবু খাটিয়ে সেবা দিতে শুরু করলে চীনা নাগরিকরা সেখানেও গিয়ে সেবা নেন। এধরনের বিশেষ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা অবকাঠামোর জন্যে চীন সরকার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে। এর ফলও পাওয়া যাচ্ছে এখন। এ বছর শেষে বিশ্ব জিডিপি’তে চীনের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি পাবে ১.১ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সিএনএন বিজনেস বলছে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের এ অংশ বৃদ্ধির পরিমাণ হবে গত বছরের চেয়ে ৩ গুণ বেশি। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিশ্ব অর্থনীতিতে অংশের পরিমান কিছুটা হ্রাস পাবে। এ বছর শেষে চীনের অর্থনীতির মূল্য দাঁড়াবে ১৪.৬ ট্রিলিয়ন যা গ্লোবাল জিডিপি’র প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ।

ম্যাককুয়ারি গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ল্যারি হু বলেন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে দক্ষতা অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশি। যে কারণে চীনের বার্ষিক ছুটির উৎসব গোল্ডেন উইক বা চন্দ্র উৎসব দেশটির নাগরিকরা উপভোগ করতে পারছেন। অন্তত ৬৩০ মিলিয়ন বা ৬৩ কোটি চীনা নাগরিক এ উপলক্ষে দেশে ও দেশের বাইরে ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করছেন এবং তা অর্থনীতিকে গতি ফিরিয়ে আনতে আরো সহায়তা করছে। গত বছর ভ্রমণের সঙ্গে তুলনায় এ হার ৮০ শতাংশ। চীনের কালচার এন্ড টুরিজম মন্ত্রণালয় বলছে এবছর ভ্রমণকারীদের ব্যয়ের পরিমান গতবছরের ভ্রমণকারীদের ব্যয়ের ৭০ শতাংশ যা অর্থমূল্যে ৭০ বিলিয়ন ডলার। এ পর্যন্ত সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছে ৫৮০ মিলিয়ন ডলার। গত বছরের তুলনায় মাত্র ১২ শতাংশ কম। হু বলেন চীন অর্থনীতির এ পুনরুদ্ধার উৎসাহ ব্যঞ্জক কারণ চীনে নাগরিকদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে শুরু করেছে, ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশেষত সেবাখাতে চাহিদাও বাড়ছে। এবং ্এধরনের পুনরুদ্ধার বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। কারণ ছুটির আগে থেকেই চীনের অর্থনীতি গতি পাওয়া শুরু করেছিল।

একটি বেসরকারি মিডিয়া গ্রুপ ক্যাক্সিনের জরিপে দেখা যাচ্ছে চীনের উৎপাদনশীল খাতে সম্প্রসারণ ঘটতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে আরেক জরিপে দেখা গেছে বরং উৎপাদনশীল খাতে কর্মব্যস্ততা গত সাত বছরের তুলনায় শীর্ষে পৌঁছেছে। গত সেপ্টেম্বরে পরিষেবা খাতে এধরনের চাঞ্চল্য এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায় ছাড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি চোখে পড়ে। ক্যাক্সিন ইনসাইট গ্রুপের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ওয়াং ঝি বলছেন সামগ্রিকভাবে চীনের অর্থনীতি মহামারী পরবর্তী পুনরুদ্ধারে দ্রুত গতি অর্জন করছে। ভোক্তাব্যয় বৃদ্ধি উৎসাহমূলক। কোভিড সত্ত্বেও চীন সরকার যে সব মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল তা দেখে দেশটির অর্থনীতিবিদরা কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন দেশটির অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে ভোক্তা ব্যয় হ্রাসের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু করকারখানাগুলোতে উৎপাদনের হার বরং শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বিশ্ব অর্থনীতিতে পণ্য যোগানে যে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে চীনা উদ্যোক্তারা সে কারণে দেশটির অর্থনীতি এধরনের অর্থনৈতিক যুদ্ধ উৎরে গেছে বলেই মনে হচ্ছে। অক্সফোর্ড ইকোনোমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ লুইস কুইজ এ মন্তব্য করে বলেন গবেষণা ও বিশ্লেষক গ্রুপের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে চীন এবছর বিশ্ব অর্থনীতিতে তার অংশ বৃদ্ধি করতে সমর্থ হবে। লুইস কুইজ বলেন ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যিক মনোমালিন্যের পরেও চীনে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিনিয়োগ ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাণিজ্যিক দরকষাকষি এখনো নাটকীয় পর্যায়ে আরো খারাপ হলেও অনেক মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি করছে। বরং চীনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বাধা অপসারিত করায় মার্কিন বিনিয়োগকারীরা নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে।

তবে মার্কিন বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ কোম্পানি ফিচ রেটিংস বলছে চীনে করোনাভাইরাসে গ্রামীন ও দরিদ্র নাগরিকদের বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাদের গড় আয় ৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এধরনের নাগরিকরা চীনের শ্রমঘন শিল্প, নির্মাণ ও উৎপাদনশীল খাতে কাজ করে। ৮০ মিলিয়ন বা ৮ কোটি চীনা নাগরিক ইতিমধ্যে কাজ হারিয়েছে। আরো ৯ মিলিয়ন কাজ হারাতে যাচ্ছে। এদের বছরে গড় আয় ছিল ৭ হাজার ৩৫০ ডলার। এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভবত উচ্চ আয়ের দিকে ঝুঁকছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক বিরোধ অব্যাহত থাকলে চীনের প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর অর্ধ শতাংশ করে হ্রাস পাবে। কিন্তু উন্নত দেশগুলো যদি চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধে ওয়াশিংটনের পক্ষ নেয় তাহলে বেইজিংয়ের প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হারে হ্রাস পাবে।

সর্বাধিক পঠিত