প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

২০১৯ সালে ২৪ হাজার অগ্নিকাণ্ডে ৩৩০ কোটি ৪১ লাখ টাকার ক্ষতি, মৃত ১৮৪

সুজন কৈরী : দেশে বেড়েছে বিদ্যুতের ব্যবহার। সেই সঙ্গে নকল ইলেক্ট্রনিক্স সামগ্রী ও অদক্ষ লোক দিয়ে কাজ করার কারণে ক্রমাগত বাড়ছে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা। প্রতিনিয়ত নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ আর লোকজনের অসচেতনতাই আগুন লাগার সংখ্যা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, অগ্নিকাণ্ড এড়াতে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের সঠিকমান ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া গ্যাসের চুলার সঠিক ব্যবহার ও যেখানে সেখানে সিগারেটের টুকরো ফেলার কারণেও ঘটছে অগ্নিদুর্ঘটনা।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্যমতে, গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ কারণে মোট ২৪ হাজার ৭৪টি অগ্নিকান্ড ঘটেছে। এতে ৩৩০ কোটি ৪১ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৪ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অগ্নি ঘটনাস্থল থেকে দমকল বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করেছেন ১ হাজার ৪২২ কোটি ৯২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫ টাকার বিভিন্ন সরঞ্জামাদি। অগ্নিদুর্ঘটনার ৫০ শতাংশের বেশি ঘটেছে চুলা, বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও সিগারেটের টুকরো- এই তিন কারণে। তিন কারণের মধ্যে চুলার আগুন থেকে ৪ হাজার ৪২৮টি, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে ৮ হাজার ৬৪৪ ও সিগারেটের টুকরো থেকে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ৪ হাজার ১৫৩টি।

ফায়ার সার্ভিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ওই তিন কারণ ছাড়াও খোলা বাতির ব্যবহার করায় ৬০৯টি, উত্তপ্ত ছাই বা জ্বালানী থেকে ৮৪৩টি, ছোটদের আগুন নিয়ে খেলা করায় ৯৪৫টি, যন্ত্রাংশে ঘর্ষণ জনিত কারণে ৩৩৪টি, অগ্নিসংযোগ ১৮১টি, হাঙ্গামা, উচ্ছৃক্সক্ষল জনতার আইন ভঙ্গ করে লাগিয়েছে ২৩৫টি, মাত্রাতিরক্ত তাপ সৃষ্টির কারণে ২০৬টি, মিস ফায়ার থেকে ৯৯৬টি, স্বত:স্ফুর্ত প্রজ্জ্বলন থেকে ৮২টি, চিমনি থেকে জলমত উৎক্ষেপণে ৪৮টি, স্থির বিদ্যুৎ থেকে ১৩৩টি, রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় ৬৭টি, বাজি পোড়ানোয় ৭২টি, জাহাজ-বিমান ও বন জঙ্গলের আগুন থেকে ৯৯টি অগ্নিকান্ড ঘটেছে।

এসব অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে ৮ হাজার ৪৬৬টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বাসগৃহ ও রান্নঘরে। এতে ক্ষতি হয়েছে ৮২ কোটি ৩৬ লাখ ১৬ হাজার ৪৬১ টাকার। গোশালা ও খরের গাদা থেকে সৃষ্ট ৪ হাজার ৭১৪টি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ ১৫ কোটি ৬৩ লাখ ৩৫ হাজার ১২০ টাকা। দোকান ও বাজারে ৪ হাজার ৭৫টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ক্ষতি হয়েছে ১৫৮ কোটি ১৮ লাখ ১২ হাজার ৭৩৪ টাকা। কারখানা ও গুদামে লেগেছে ১ হাজার ২৪৫টি অগ্নিকাণ্ড। ক্ষতি হয়েছে ২৯ কোটি ৪৭ লাখ ৬৯ হাজার ১৯৪ টাকা। বিভিন্ন অফিস, হাসপাতাল, স্কুল, বোডিং ও হোটেলে ৭৩৮টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার ৪১ টাকা। পাটের গুদাম, পাটকল, দোকান, বজরা ও পাট বহনকারী জাহাজে ২০৭টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৩২ হাজার ৯৫৩ টাকা। জাহাজ, অটোমোবাইল গাড়ী ও সাধারণ পরিবহনে ৩৬৪টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ক্ষতি হয়েছে ৫ কোটি ৬৭ লাখ ২০০ টাকা। বস্ত্র মিল ও সুতার গুদামে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ১৪৯টি। ক্ষতি হয়েছে ৩ কোটি ৭২ লাখ ১৬ হাজার ৪৪০ টাকা। ৪৫টি কয়লার স্তুপে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতি হয়েছে ১১ লাখ ১৪ হাজার ৪৪০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য কারণে ৪ হাজার ৮৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে ২৫ কোটি ৮৫ লাখ ৭২ হাজার ১৬১ টাকা।

২০১৯ সালে বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৮৪ জন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১২৫, চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৪, বরিশাল বিভাগে ৬, সিলেট বিভাগে ৪, রংপুর বিভাগে ৪ ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৮ বিভাগে ৯ হাজার ৭১৫টি নৌ, সড়ক, ভবন ও পাহাড় ধ্বসের ঘটনা ঘটেছে। ফায়ার ফাইটাররা গিয়ে ঘটনাস্থল থেকে ১৫ হাজার ৬৮৭ জনকে উদ্ধার করে।

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য মতে, গত বছর দেশের আট বিভাগে ৮২০টি নৌ দুর্ঘটনায় ৬৮৫ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ৩২২টি নৌ দুর্ঘটনায় ২৫০ জনের প্রাণহাণি হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১১১টি দুর্ঘটনায় ৯২, রাজশাহীতে ৮২ দুর্ঘটনায় ৫৬, খুলনায় ৫৬ দুর্ঘটনায় ৫৭, বরিশালে ২২ দুর্ঘটনায় ৩২, সিলেটে ৪৫ দুর্ঘটনায় ৫৫, রংপুরে ৮৯ দুর্ঘটনায় ৬৬ ও ময়মনসিংহে ৯৩ দুর্ঘটনায় ৭৭ জনের প্রাণহাণি হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ৬৬৮ জনকে। ৮ হাজার ৮১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৭৭৩ জন মারা গেছেন। উদ্ধার করা হয়েছে ১৪ হাজার ৮৭২ জনকে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১ হাজার ৪২৮টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৮৬ জন। চট্টগ্রামে ৯৫২টি দুর্ঘটনায় ৩৬৩, রাজশাহীতে ২ হাজার ১৭৬টি দুর্ঘটনায় ২৫৪, খুলনায় ১ হাজার ৪৭৮টি দুর্ঘটনায় ২০৩, বরিশালে ৩৭০টি দুর্ঘটনায় ১১২, সিলেটে ১৪৮টি দুর্ঘটনায় ২৯, রংপুরে ১ হাজার ৩১০টি দুর্ঘটনায় ১৭৮ ও ময়মনসিংহে ৯৫০ দুর্ঘটনায় ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

৬৬টি ভবন ধ্বসের ঘটনায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৫০টি ভবন ধ্বস হয়েছে। মারা গেছেন ১৬ জন। চট্টগ্রাম বিভাগে ৮টি ভবন ধ্বসে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

পাহাড় ধ্বসের ১৭ ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫টি ঘটনায় ১১ জন ও সিলেটে একটি পাহাড় ধ্বসে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিভাগে একটি পাহাড় ধ্বস হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এটাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ অগ্নিকাণ্ডে জীবন ও সম্পদের অনেক ক্ষতি হয়। অনেকেই মনে করেন, আগুন লাগলে দেখা যাবে, এ জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেন না। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে এসে সব ক্ষেত্রেই নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে অগ্নিকাণ্ডের সময় অন্তত ১০-১৫ মিনিট প্রতিরোধ করা যায়। আর সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতে হবে। সর্বোপরি অগ্নিকান্ডের ঘটনা কমাতে হলে অধিক সচেতনার প্রয়োজন রয়েছে।

অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার বেশির ভাগের সূত্রপাত শর্টসার্কিট থেকে। আমরা নিম্নমানের ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রাংশ অফিস, বাসা-বাড়ি, কারখানায় ব্যবহার করি। এসব যন্ত্রাংশ ঠিকঠাক আছে কি না, সে ব্যাপারেও আমরা উদাসীন। এর ফলে প্রায়ই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত