প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফিরোজ আহমেদ: আসলে পুলিশ বরগুনার ক্ষমতাসীন অংশটাকে রক্ষা করেছে

ফিরোজ আহমেদ : আইন বিষয়ে অজ্ঞতা কাকে বলে, কোন কোন বিবেচনা শাস্তি দেওয়ার ভিত্তি হতে পারে না, সেটার একটা আদর্শ দৃষ্টান্ত হয়তো মিন্নিকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া সংক্রান্ত রায়ের একটা বাক্য। ‘আয়শার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে তাকে অনুসরণ করে তার বয়সী মেয়েদের বিপথগামী হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই এ মামলায় তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়।’ জনতা জনতার মতো রায় চাইবে, কেউ ফাঁসি চায়, কেউ বেকসুর খালাস চায়। কিন্তু আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে ফাঁসি পেতে হবে বাকি নারীকূলের জন্য দৃষ্টান্ত হতে। এই রায় যিনি লেখেন, মনে হয়েছে তিনি হয়তো বিচারকের পদে না থাকলে মিন্নির ফাঁসির দাবিতে মিছিলেরই উদ্যোক্তা হতেন। কেউ ঠিক যতোটুকু অপরাধ করেছে, ততোটুকু শাস্তি পাবেন, এইটাই সভ্য আইনের দর্শন। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নৃশংস বর্বরতাটার জন্ম হয়েছিলো একজনকে শাস্তি দিয়ে বহু জনকে সন্তষ্ট ও অনুগত রাখার সংস্কৃতি থেকে। মেরে ফেলেই তো হয়, শূলে চড়ানো, ঝুলিয়ে রাখা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করা এগুলোও সেই প্রদর্শনী ও ভীতি সঞ্চারের মনোবৃত্তির সহজাত। বিচারকরাও হয়তো সভ্যভব্য হয়েছেন কিছুটা। তাই সপ্তাখানেক ঝুলিয়ে রাখার কথা বলা যাচ্ছে না, কিন্তু দৃষ্টান্ত তো থাকছে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নারীকূলকে পথগামী রাখার একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হলো বটে।
বিষয়টার একদম অন্য দিকটার কথা বলি। এই পুরো ঘটনাটা ঘটালো যে ক্ষমতা বলয়, যে মাদক কারবারি চক্র, যাদের সাথে সম্পর্কিত বরগুনার ক্ষমতাসীন পরিবার ও ব্যক্তিরা কেউ কেউ বিশেষ করে তাদের তরুণ পুত্রগণ, তাদের কী হলো? মিন্নির ফাঁসির দাবিটা আসলে তারাই তুলেছেন। মিন্নির শাস্তির দাবিতে সমাবেশগুলোও তারা আয়োজন করেছেন। কারণ মিন্নীকে সামনে ঠেলে দেওয়া মানে এই পুরো মাদকের চক্রকে আড়াল করা। মনে হবে খুনির সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জোরে মিন্নি স্বামীকে শায়েস্তা করতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটলো। দেখুন না পুলিশ না অন্য কেউ আর এই মাদক চক্র, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ আর তাদের পুত্রদের কথা বলছেন না। কেবল বলা হচ্ছে মিন্নি আর সেই রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো গুন্ডাদের কথা, যারা ঘটনাটা ঘটিয়েছে।

সমাজে সত্যি সত্যি দৃষ্টান্ত দেখাতে চাইলে যে কিশোর এবং প্রায় কিশোর সদ্য তরুণ চক্রটি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঘটালো, তাদের উৎপত্তির কারণটা নিয়েই ভাবা যেতে পারে। এই উৎপাত্তির জন্য যারা দায়ী, খুনের জন্য এই ছেলেগুলোকে শাস্তি যা পাবার তা দিয়েও তাদের বিষয়ে ভাবাটাই সামাজিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের একমাত্র উপায় ছিলো। কিন্তু যেহেতু বিচারকগণ ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই কিল মারার গোঁসাই, পুলিশের সাথে মাদক চক্রগুলোর সম্পর্ক যে আসলে কী, তারা ভাগ পান নাকি মুখ মুখ বুজে থাকেন, না আসলেই টম আর জেরির মতো অসম্ভব চেষ্টার পরও ভাগ্যের ফেরে ধরতে পারেন না, জানি না। কিন্তু সব মিলে মিন্নিকে আসামীর তালিকায় ঢোকানোও তাদেরই অবদান, সেই কারণেই মাদক চক্রের প্রভাব অসম্ভব না। অতএব মাদকচক্রকে রক্ষা করবার দৃঢ় জোশ নিয়ে মিন্নি নামের একটা মেয়ের ফাঁসির দাবিতে পুরো আয়োজন তৈরি করলো সত্যিকারের মাদকচক্রের হোতারা, জনতার একাংশকে তাতে জুড়ে দেওয়া হলো আর একজন মাননীয় দায়রা বিচারপতি সামাজিক দৃষ্টান্তের নামে মিন্নি নামের একটা মেয়ের ফাঁসির আদেশ দিয়ে দিলেন।

… মনোবৃত্তি সর্বদাই ভয়ঙ্কর। এই মামলাতেই অন্য দিকটা দেখা যাক। রিফাত হত্যার পরপরই প্রথম সুযোগে নয়ন বন্ডকে খুন করে আসলে পুলিশ বরগুনার ক্ষমতাসীন অংশটাকে রক্ষা করেছে। নয়নের বিচার হলে, তার মন্তব্যে কিংবা কথায় বা উপস্থিতিতেই স্থানীয় সংসদ সদস্যের পুত্রের সাথে তার সম্পর্কের কথা দিনরাত মনে করিয়ে দিতো। ফলে এইটা দৃষ্টান্ত হিসেবে ফাঁসিপন্থীদের আনন্দিত করলো, অন্যদিকে গোটা শহরটাকে ধ্বংস করা, তরুণদের মাদকাসক্ত করে কোটি কোটি টাকা কামানো অপরাধীদের রক্ষা করলো। হয়তো দেখা যাবে নয়ন বন্ডকে পরপারে পাঠাতেই এরা কোটিখানেক খরচা করেছে। বাক-স্বাধীনতা থাকলে পুলিশের মতোই এই বিচারপতির ওপর এই চক্রের প্রভাব বিষয়ে ইঙ্গিত করতো কেউ কেউ। তা যখন নেই, শুধু এইটুকু আশা করছি যে, এই রায়টাকে উচ্চআদালত আমলে নেবেন এবং সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত করবার মানসে কাউকে ফাঁসি দেওয়াটা যে আইয়ামে জাহেলিয়াতের প্রথা, সেটা এই বিচারককে বুঝিয়ে দেবেন। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত