প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাঈদ তারেক: মিন্নি-নয়ন বন্ডরা নষ্ট রাজনীতির বলি!

সাঈদ তারেক: মেয়েটির জবানবন্দী পড়লাম। ধরেই নেওয়া যায় পুরোটা সে এতে বলেনি। কিছু এড়িয়ে গেছে, কোথাও সংক্ষিপ্ত করেছে, বা কিছু তথ্য ধামাচাপা দিয়েছে। তারপরও যতোটুকু বলেছে, পড়ে যেকোনো সুস্থ মানুষেরই স্তম্ভিত হয়ে যাওয়ার কথা। কতোই বা বয়স ছেলে-মেয়েগুলোর। কলেজ পড়ুয়া, ষোলো থেকে আঠারোর মধ্যে, বিশের বেশি তো নয়। এই বয়সেই এই! কোন গুণটা রপ্ত নেই, গুন্ডামি-মাস্তানি নেশা বখাটেপনা বহুমাত্রিক প্রেম, একই সাথে দুই স্বামী, এক স্বামীকে শিক্ষা দিতে আর এক স্বামী লেলিয়ে দেওয়া। একটা জেলা শহরে তরুণ যুবকদের নীতি-নৈতিকতার এই হাল। ঘটনা ঘটার পরপর জানা গেছিলো বখাটেগুলো নাকি স্থানীয় কোনো সরকার দলীয় প্রভাবশালী নেতার ক্যাডার বাহিনী ছিলো। ফলে স্বভাবতই বেপরোয়া, দুর্দমনীয়।

তারপরও, এরা তো নিশ্চয়ই রাস্তাঘাটে জন্ম নেওয়া না, ফুটপাথেও বসবাস না। বাবা-মা আছে, ভাইবোন পরিবার পরিজনের সাথেই তো থাকতো। বাইরে যে গুনধররা এতো কীর্তিকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে বাবা-মা পরিবারের কেউই জানতো না। কখনো টেরও পায়নি। কেউ একজনও বাধা দেয়নি। কুপথ বিপথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেনি। আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দিয়ে রেখেছিলো। অথবা ভালো রাখার চেষ্টা করেও পারেনি! মিন্নি নামের মেয়েটার ফাঁসির আদেশে নানা মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখছি, কিন্তু কেউ কি খতিয়ে দেখেছেন এই প্রজন্মের ছেলে মেয়েগুলো কেন মিন্নি, পাপিয়া, সাবরিনা হয়ে যাচ্ছে? ছেলেগুলো কেন তস্কর দুর্বৃত্ত হয়ে উঠছে। গুণধরদের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন দেখলাম আর এক ছাত্রলীগ, সবুজ আল সাহবা।

বেশ কিছুদিন যাবৎই নানা ঘটনা সমাজকে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। চুরি, দুর্নীতি, লুটপাটের মহোৎসব, মিথ্যাচার আর নীতিহীনতার নির্লজ্জ চর্চা, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে তুচ্ছ উছিলায় হানাহানি খুনোখুনি, মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপের ভয়ংকর বিস্তৃতি। তরুণ, যুব সমাজের একটি অংশ লিপ্ত হচ্ছে তাবৎ গর্হিত কাজে। যাদের বয়স ষোলো থেকে চব্বিশের মধ্যে।

উদ্বেগটা এখানেই। কেন নব্বই পরবর্তী প্রজন্মের এই অধঃপতন। তিরিশ বছর দেশে গণতন্ত্রের সুবাতাস। এখন তো কোনো ডিক্টেটর বা ‘স্বেরাচার’ নেই। রাষ্ট্রক্ষমতার জবরদখলকারি নেই, তাহলে কেন এই তিরিশ বছরে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম এমন বেপরোয়া, দুর্দমনীয়। নানা কাজে আমাকে এই বয়সসীমার তরুণ-যুবকদের সান্নিধ্যে আসতে হয়। কেউ কেউ ভালো পাস দেওয়া। কিন্তু দুঃখ লাগে এদের অনেকের জ্ঞানের মাত্রা, নীতি-নৈতিকতাবোধ ভদ্রতা সৌজন্যতার দৈন্যদশা দেখে। অবাক হয়ে ভাবি, কী শিখিয়েছে এদের স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা। বাবা-মায়েরা। অনেককেই দেখি, নিজের নামের বানানটা পর্যন্ত ঠিকমতো লিখতে পারে না। কথা দিয়ে কথা রাখে না, সত্যের মুখোমুখি হবার সাহস নেই। পলায়নপর ভীতু এক আত্মকেন্দ্রিক প্রজন্ম। সরকারি রাজনীতির সাথে জড়িতদের অধিকাংশের মধ্যে প্রচণ্ড অর্থলিপ্সা, অল্প সময়ে অগাধ ধন-সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা এবং মোক্ষ হাসিলের জন্য যাবতীয় অন্যায় অপকর্মের পথ বেছে নেওয়া এক কমন ফিচার। যার প্রভাব পড়ছে গোটা তরুণ সমাজের ওপর। সবারই ভাবনায় তাৎক্ষণিকতা। জ্ঞান-বুদ্ধি হবার পর থেকে দেখছে এক শ্রেণির ছেলে-ছোকড়া লেখাপড়া না শিখে কোনো কাজ-কর্ম, চাকরিবাকরি না করে শুধু সরকারি দলের খাতায় নাম লিখিয়ে অল্প দিনে গাড়ি-বাড়ি বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যাচ্ছে। সুশিক্ষার অভাবে এটাকেই আদর্শ ধরে অন্যরা অপথে-কুপথে পা বাড়াচ্ছে, লিপ্ত হচ্ছে নানা অপরাধে। অথচ এরাই জাতির ভবিষ্যৎ। এক সময় এরাই নেতৃত্ব দেবে। দেশ চালাবে।

এক ভয়াবহ অশনি সংকেত। বলার অপেক্ষা রাখে না এ সবই হচ্ছে অসুস্থ রাজনীতির চর্চা, দীর্ঘদিন দেশে রাজনীতি না থাকা, জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি এবং সব কিছুই একটি বিশেষ গোষ্ঠীর কব্জায় নিয়ে নেওয়ার অনিবার্য কুফল। তিরিশ বছর আমরা শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করেছি, ক্ষমতায় যাওয়া টিকে থাকা নিয়ে মারামারি হানাহানি। উন্নয়নকে কেউ কেউ লুটপাটের মহোৎসবে পরিনত করেছে। তাবৎ রাষ্ট্রযন্ত্রকে ক্ষমতায় যাওয়া এবং টিকে থাকার হাতিয়ারে পরিণত করায় পাবলিক সার্ভেন্টরা হয়ে উঠেছে দুর্বিনীত। অনির্দিষ্টকাল ধরে মৌরসী পাট্টার গ্যারান্টিকে ওজিএল মনে করে কেউ কেউ দু’হাতে টাকা কাচিয়ে চলছে। এক সময় হাজার টাকা যার থাকতো সমাজে তাকে ‘হাজারি’ বলে বিশেষ সম্মান দেখানো হতো। যার থাকতো একলাখ সে হতো লাখপতি। বিশাল ব্যাপার। কোটিপতি কি জিনিস আমরা কল্পনাও করতে পারতাম না। আর এখন সরকারি অফিসের কেরানী, পিওন, ড্রাইভার, মিটার রিডারদেরও শত কোটি টাকার মালিক না হলে জাতে ওঠা হয় না। বসদের কী অবস্থা, কেউ ধারণাই করতে পারেন না।

প্রসঙ্গক্রমে কথাগুলো এসে গেলো তাই বললাম। ছোট্ট শহর বরগুনায় মিন্নি, রিফাত, নয়নরা যে অপকর্মগুলো ঘটিয়েছে- এ হচ্ছে একটি খন্ডচিত্র। সামগ্রিকভাবে তরুণ প্রজন্মের অস্থিরতা, শিক্ষাহীনতা, নীতিহীনতার একটি আকস্মিক প্রকাশ। যেমন গত কয়েকদিনে সিলেট এবং ঢাকায় ধরাপড়া ছাত্রলীগ পরিচয়ধারী কিছু কুলাঙ্গারের কীর্তিকাণ্ড এবং উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে সম্প্রতিকালে এ ধরনের ঘটনাগুলো লক্ষণীয়ভাবে বাড়ছে। হিসাবে তাই বলে। দীর্ঘদিন গুমোট পরিস্থিতি বিরাজ থাকলে এক সময় দুর্গন্ধই বেড়োয়। আমরা এখন সেই সময় পার করছি। বরগুনায় মেয়েটির সাজা হয়তো শেষ পর্যন্ত যাবজ্জীবনে এসে ঠেকবে। আপিল করে কয়েক বছরে জামিনও পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই মেয়েটিকে কেন্দ্র করে কতগুলো তরুণ জীবন শেষ হয়ে গেলো। একজন খুন হয়েছে আর একজন ক্রসফায়ারে গেছে। বাকি কজনও ফাঁসির আসামি। মেয়েটিই কি আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। এতোগুলো তরুণ জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার দায়ভার কার?

আমরা চাই না আর কেউ এভাবে নষ্ট রাজনীতির বলি হোক। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত