প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফরিদ কবির: একটা নষ্ট দেশই হয়তো আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই

ফরিদ কবির: ছেলেবেলায় অঙ্কের ক্লাসেই আমাদেরকে প্রথম ভেজাল শেখানো হয়েছিলো!
সেই গণিতটিতে আমাদের শেখানো হয়েছিলো- কতো সের দুধে কতোটা পানি মেশালে লাভ বেশি হবে!

পুরান ঢাকার যে স্কুলে আমি পড়তাম, তার নাম হাম্মাদিয়া হাই স্কুল। সেখানে দুপুরে চতুর্থ পিরিয়ড পর জামাতে নামাজ পড়ার জন্য শিক্ষকরা আমাদেরকে লাইন করে নিয়ে যেতেন স্কুলের ভেতরেই তৈরি করা মসজিদে।
শুধু তাই নয়, স্কুলে টুপি পরে যাওয়ারও নিয়ম ছিলো! শুরুতে অবশ্য নিয়মটা ছিলো না! স্বাধীনতার পরই এ নিয়মটা জারি করা হয়।
আমার মনে আছে, স্কুলে হোমওয়ার্ক না করার কারণে আমার অনেক বন্ধুই শিক্ষকদের হাতে মার খেতেন! কোনো কোনো শিক্ষক ছিলেন বেশ নির্দয় প্রকৃতির। তাদের বেতগুলিও ছিলো স্পেশাল। কোনো কোনোটা বেশ মোটাসোটা, তেলমাখানো।

আমি নিজে পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী ছিলাম। কখনো প্রথম হতে না পারলেও সব সময় ২-৪-এর মধ্যে থাকতাম। পড়াশোনার জন্য কখনো মার খাইনি। কিন্তু আমার অনেক সহপাঠীকে হোমওয়ার্ক না করার জন্য, ক্লাসে পড়া না পারার জন্য বেদম মার খেতে দেখেছি!

তা পড়ার জন্যই হোক, স্কুলে দেরিতে আসার জন্যই হোক, কিংবা হোক মসজিদে নামাজে শামিল না হওয়ার জন্য- মার খাওয়ার ভয়ে অামার অনেক সহপাঠীকেই তখন নানা ধরনের মিথ্যে বলতে হতো। কোনো শিক্ষকই এমন অভয়বাণী দিতেন না, সত্য বললেই তাকে মাফ করে দেয়া হবে। বরং মিথ্যে বললেই শাস্তি এড়ানো যেতো।

এই যে স্কুলজীবনেই থেকে আমরা ভেজাল মেশানো আর মিথ্যেকথা বলা শিখে আসি, তা বহাল থাকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত। কারণ স্কুল থেকেই আমরা এই শিক্ষা পেয়ে যাই, খাবারে ভেজাল মেশানো অতো খারাপ কিছু না। মিথ্যে বলাও।

বলতে চাইছি, আমাদের এই মান্ধাতা আমলের শিক্ষাব্যবস্থা না পাল্টানো পর্যন্ত আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা একেবারেই অসম্ভব।

আমি মনে করি, স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ধরনের পড়ালেখা বা হোমওয়ার্ক থাকাই উচিত না। বাচ্চারা বাড়িতে যা করতে পারে না, স্কুলে গিয়ে তারা তার সব করতে পারবে। বাচ্চারা জানবে, বাড়িতে নানা বাধানিষেধ থাকলেও স্কুলে কোনো বাধানিষেধ নেই। সেখানে তারা স্বাধীন। তারা সেখানে পছন্দমতো নিজেদের সৃজনশীল কাজ করতে পারবে। কেউ ছবি আঁকবে, কেউ ছড়া লিখবে, কেউ খাতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে নৌকা বানাবে! স্কুলে একটা জিনিশই শেখানো হবে, সত্য বললে পুরস্কার, মিথ্যে বললে তিরস্কার! পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সততা, নৈতিকতা- এসবই শেখানো হবে। আর শেখানো হতে পারে ভালো স্পর্শ ও মন্দ স্পর্শের বিষয়টিও। এমন অবস্থায় পড়লে তারা যেন তা কোনো না কোনো শিক্ষককেই জানাতে পারে নির্দ্বিধায় সেটাও তাদেরকে শিখিয়ে দিতে পারে।

প্রাথমিক লেভেলে বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসের বাছাইকরা সহকারী সচিবদের প্রেষণে অন্তত তিন বছরের জন্য নিয়োগ করা যেতে পারে। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের প্রার্থীদেরও। জাতিগঠনে এটাই হতে পারে তাদের প্রাথমিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।

২.
ভেজাল শিখলেও একটা সময় মানুষ দুধে সামান্য পানিই মেশাতো! আর কিছু নয়। এর ফলে তা খাওয়ার উপযুক্ত থাকতো।
এখন মানুষ দুধে অখাদ্য-কুখাদ্য সবকিছুই মেশায়, তাতে আসল দুধ কতোটুকু থাকে সেটাই প্রশ্ন। এটা সত্যি, তারা মেশায় এমন কিছু, যা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। মানুষ এতোটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে যে মৃত মুরগী, গরুর বদলে মহিষ, খাসির বদলে আপনাকে কুকুরের মাংশও রান্না করে খাইয়ে দিতে পারে!

এক সময় সরকারি কর্মকর্তারা, রাজনীতিবিদরা ১০০ টাকা থেকে বড় জোর ২০ টাকা চুরি করতো! এখন ১০০ টাকার কাজে বরাদ্দ নেয় এক কোটি টাকা! মেরে দেয় নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয় শত টাকা! এতো টাকা মারতে গেলে একটা বালিশের দাম, ৬ হাজার টাকা, বালিশটি নিচতলা থেকে দোতলায় তুলতে ৯ হাজার টাকা খরচ না দেখালে চলবে কী করে?
দুর্নীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তাতে কোনো কোনো সচিবের সম্পদ হাজার কোটি টাকা আর তার ড্রাইভারের সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা হওয়া তো খুবই স্বাভাবিক।

আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে হাজার কোটি, শত কোটি সম্পদঅলা আমলা ও তাদের ড্রাইভারের গল্প অনেকটা রূপকথার মতোই।
এমন ঘটনা একটা দুটো যে কাগজে আসে, সেটাই ভাগ্য। কারণ এমন ঘটনা তো প্রতিনিয়তই ঘটছে। কাগজে কি তার সব পাওয়া যায়?
সরকারি আমলাদের ভয়েই হোক, কিংবা এই দুর্বৃত্তায়ন প্রক্রিয়ায় খোদ সাংবাদিকদের অনেকে জড়িত থাকার কারণেই হোক, কাগজে দুর্নীতি বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এখন দেখাই যায় না। আমাদের দৈনিকগুলো পড়লে মনে হয়, দেশের সব লোক সাফসুতরো। সচিবালয় টু সমুদ্রবন্দরে- সব জায়গায় ফেরেশতারা বসে আছে। কিন্তু অভিজ্ঞ সকলেই জানেন, এসব জায়গার ইটপাথরও ঘুষ খায়। এসব জায়গাতে সৎ লোক নেই তা নয়, তাদের সংখ্যা খুবই কম। একজন সৎ মানুষের আশেপাশে যদি দশটা অসৎ মানুষ থাকে তাহলে সৎ লোকটির কিছুই করার থাকে না। সংখ্যালঘুর শক্তি সব সময়েই কম।

আমাদের ধর্মীয় নেতারাও যতোটা নারীদেরকে ঘরে আটকে রাখার কথা বলেন, যতোটা তাদের পোশাক-আশাক নিয়ে সোচ্চার তার এক কণাও বলেন না, ঘুষ বা দুর্নীতি নিয়ে।

সম্ভবত সাধারণ মানুষরাও চান না, দেশটা ঠিকঠাক চলুক। ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠিত হোক। সবাই ওঁৎ পেতে আছে, সুযোগ বুঝে কে কখন কাকে কোপ মারবে?
নইলে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও এসব বিষয় কী করে অমীমাংসিত থাকে?
একটা দেশ তেমনভাবেই এগোয়, তার জনগণ যেমনটা চায়।
দুর্নীতিমুক্ত একটা দেশ আমরা আসলে গড়তে চেয়েছিলাম কিনা- এ প্রশ্ন কে কাকে করবে?

আমরা নষ্ট হয়ে গেছি, একটা নষ্ট দেশই হয়তো আমরা টিকিয়ে রাখতে চাই। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত