প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রশ্রয়দাতারা কি ধরা পড়বে ?

ডেস্ক রিপোর্ট: সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় এজাহারভুক্ত ৬ আসামি এবং সম্পৃক্ততার অভিযোগে আটক ২ জনের সবাইকে ৫ দিন করে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। গতকাল সকালে মাহফুজুর রহমান মাসুম এবং বিকালে তারেকুল ইসলাম তারেককে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম মো. আবুল কাশেম তাদের ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ নিয়ে এজাহারভুক্ত ৬ এবং সন্দেহভাজন ২ জন মিলে মোট ৮ জনকে রিমান্ডে নিল পুলিশ।

এদিকে গতকালও আদালতে আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত হননি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অতিরিক্ত পিপি মো. মাহফুজুর রহমান জানান, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে মাসুম আদালতকে বলেন, মোবাইলে খবর পেয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে এমসি ছাত্রাবাসে গিয়েছিলেন তিনি, তিনি ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত নয়।

নববধূকে ধর্ষণের ঘটনার শুরু থেকেই অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের প্রশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে সিলেটের সচেতন সমাজ থেকে। এ ব্যাপারে স্বপ্রণোদিত হয়ে একটি তদন্ত কমিটি করেছেন হাইকোর্ট। সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিকে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। বিচাপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি মহিউদ্দিন শামীমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে রুলসহ এ আদেশ দেন।

আদেশে কমিটি যাদের প্রয়োজন মনে করবে, তাদের জবানবন্দি নিয়ে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন আদালত। কোনো রকম ব্যর্থতা ছাড়া হাইকোর্টের এ আদেশের অনুলিপি বুধবারের মধ্যে তদন্ত কমিটির সদস্যদের কাছে পৌঁছাতে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সিলেটের পুলিশ কমিশনারকে এ অনুসন্ধান কমিটির যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। অনুসন্ধান কাজে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সরঞ্জাম সরবরাহ করতে সিলেটের জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রুলে গণধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাতে অবহেলা ও অছাত্রদের হলে থাকার দায়ে কলেজের অধ্যক্ষ ও হল সুপারের

বিরুদ্ধে কেন শান্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। কলেজের অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

তবে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ রকম কোনো নির্দেশনার কাগজ হাতে পাননি বলে জানান সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া।

প্রশ্রয়দাতা কারা?

গত শুক্রবার এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে তরুণী নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া সবাই ছাত্রলীগের কর্মী। তবে দীর্ঘদিন ধরে সিলেট জেলা, মহানগর বা এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় কাদের প্রশ্রয়ে তারা নিজেদের ছাত্রলীগ কর্মী বলে দাবি করে ক্যাম্পাসে ত্রাস সৃষ্টির পাশাপশি ছাত্রাবাসের কক্ষ দখল করে মাদক, জুয়া, অপহরণ ও লাঞ্ছিত করার মতো ঘৃণ্য কাজ করে আসছিল, আলোচনায় এসেছে সে বিষয়টি। একই সঙ্গে সময়ক্ষেপণ করে কারা ধর্ষকদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল তাদেরও শনাক্ত করার দাবি উঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টিলাগড়ভিত্তিক ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রিড়া সম্পাদক রণজিৎ সরকার ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আজাদুর রহমান আজাদের মাধ্যমে। তবে তারা দুজনই এ ঘটনায় তাদের কোনো হাত নেই বলে দৈনিক আমাদের সময়ের কাছে দাবি করেছে। তারা তাদের দীর্ঘদিনের রাজনীতির ইতিহাস টেনে দাবি করেন, সততার সঙ্গে ছাত্ররাজনীতি করে এখন তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

তবে পুলিশসহ একাধিক সূত্র দাবি করছে, আসামিরা সবাই রণজিত গ্রুপ নিয়ন্ত্রিত উপগ্রুপের কর্মী।

অন্যদিকে ধর্ষণকা-ের পর নির্যাতিতাকে সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া প্রথম ব্যক্তি জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বাবলা চৌধুরী নানা মাধ্যমে দাবি করেছেন, শাহপরান থানার সহকারী কমিশনার (এসি) মাইনুল আফসার, ওসি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গির আলম, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাংশু দাস মিঠু, ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সময়ক্ষেপণ করে আসামিদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। তবে ওই তরুণীর জবানবন্দি বা তার স্বামীর এজাহারে কোথাও তাদের নাম পাওয়া যায়নি।

তরুণীর স্বামীর ভাষ্য, এমসি কলেজ গেটে ছেলে বন্ধু আইনুলের সঙ্গে দেখা করতে যান তার স্ত্রী। পরে তাকে তুলে নিয়ে ধর্ষণে অংশ নেয় আইনুল। আইনুলকেও রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগের কমিটি না থাকার সুবাদে যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গির আলম, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক দেবাংশু দাস মিঠু, ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল ইসলাম টিলাগড়ের পাশর্^বর্তী মেজরটিলা এলাকা ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সাইফুরের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতেন, এমসি কলেজ ছাত্রাবাসেও ছিল তার অপতৎপরতা।

তবে যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গির আলম দাবি করেন, ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে অভিযুক্তদের চিনলেও ঘটনার রাতে তাদের সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। ঘটনার রাত সোয়া নয়টায় শাহপরান থানার সহকারী কমিশনার (এসি) মাইনুল আফসারের ফোন পেয়ে তিনি ছাত্রাবাসের গেটে যান। তার সঙ্গে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা দেবাংশ দাস মিঠু। গিয়ে দেখেন পুলিশ ভেতরে প্রবেশের অনুমতির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে সময় তরুণীকে নিয়ে বাবলা চৌধুরী ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে এসে ধর্ষক সাইফুরকে শনাক্ত করেন বলে জানান। পুলিশ বাইরে অপেক্ষা করলেও কারা এ কা- ঘটিয়েছে, তা জানতে ভিকটিমকে নিয়ে ছাত্রাবাসে প্রবেশ করেছিলেন বাবলা চৌধুরী। জাহাঙ্গির দাবি করেন, পুলিশ ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার পর ধর্ষকদের শনাক্ত করতে সব রকম সহযোগিতা করেন তিনি।

একই দাবি করে দেবাংশু দাস মিঠু বলেন, ধর্ষকদের শনাক্তে পুলিশ যাকে বলেছে, আমরা তাকেই কল দিয়েছি। আমাদের কল রেকর্ড চেক করলেই এর সত্যতা মিলবে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বাবলা চৌধুরী ধর্ষক সাইফুরের মোটরসাইকেল নিয়ে চলে গেলে সেটি উদ্ধারেও আমি পুলিশকে সহযোগিতা করি। এ ব্যাপারেও কল রেকর্ডে সত্যতা মিলবে।

ছাত্রলীগ নেতা নাজমুল দাবি করেন, পুলিশ ও জাহাঙ্গিরের কল পেয়ে তিনি ছাত্রাবাসে যান এবং ধর্ষকদের শনাক্ত করতে সহযোগিতা করেন। কোনো সমঝোতার চেষ্টা বা আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রশ্নই ওঠে না।

জাহাঙ্গির দাবি করেন, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে চান। এজন্য একটি গ্রুপ তাকে নানাভাবে হেয় করতে ধর্ষকদের সঙ্গে তার নাম জুড়ে দিচ্ছে। তিনি ধর্ষকদের কঠোর শাস্তি চান।

নাজমুল দাবি করেন, আসন্ন ছাত্রলীগের কমিটিতে তিনি শীর্ষ পদের দাবিদার। তার জনপ্রিয়তা নষ্ট করতে একটি গ্রুপ তাকে ধর্ষকদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণ করতে চায়।

তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির একটি সূত্র দাবি করেছে, প্রায় ১৪৪ একরের এমসি কলেজে আয়তন অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা যথেষ্ট নেই। এ ছাড়া অপ্রতুল সীমানা প্রাচীর, আলোর স্বল্পতার বিষয়টিও নিরাপত্তার ব্যাঘাত ঘটেছে। কমিটির প্রধান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শহিদুল কবির চৌধুরী বলেন, করোনাকালে ছাত্রাবাস খোলা রাখার সুযোগ নেই। হোস্টেলের কক্ষে অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টিও তারা অবগত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। আজ (বৃহস্পতিবার) এ বিষয়ে কমিটি প্রাথমিক প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে। সূত্র: আমাদের সময়

সর্বাধিক পঠিত