প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বপ্না রেজা: কত টাকা লাগে এক জীবনে !

স্বপ্না রেজা: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন গাড়ী চালক শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার রয়েছে বাড়ি, গাড়ি আরও কত কী। বাংলাদেশ বেশ কিছুদিন আগেই আলট্রা ওয়েলদির দেশ হিসেবে একটা গবেষণায় স্থান পেয়েছে। এমন কী আলট্রা ওয়েলদির তালিকায় বাংলাদেশ অনেক উন্নত দেশকে পেছন ফেলে এগিয়ে আছে। তেমন একটা দেশে একজন সরকারি অফিসের গাড়ী চালক অতি ধনবান বা বিত্তবান হবার ঘটনা তো ডালভাত। গণিতের সূত্র কিন্তু তাই বলে। যাইহোক। গাড়ী চালক আব্দুল মালেক এখন টক অব দ্য টাউন। হোটেল, রেস্তরা, অফিস আদালত, পাড়ায়-মহল্লায়, অলিতেগলিতে তাকে নিয়ে আলোচনা আর বিস্ময়। সৎভাবে খেঁটে খাওয়া মানুষেরা হতবাক হয়ে পড়ে কী করে সম্ভব এসব ভেবে। সমাজে বসবাসকারী সব মানুষ তো আর সৎ কিংবা অসৎ নন। কেউ সৎ, কেউবা অসৎ। অসৎরা দাবী করেন তিনি সৎ। আর সৎরা দাবী করতে ভীত থাকেন এই ভেবে যে, সততার কোন মূল্য নেই। এমন ঘটনা সম্ভবত অনেকেরই জানা যে, সরকারি কিংবা বেসরকারি অফিসের কিছু অসৎ গাড়ি চালক আছেন যারা সিএনজি গ্যাস, অকটেন পরিমাণে কম সংগ্রহ করে সিএনজি পাম্প বা অকটেন স্টেশনে কতর্বরতদের সাথে আঁতাত করে স্লিপে বেশি পরিমাণ দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আত্মসাৎ করে থাকেন। এমন অনেক নজির আছে চারপাশ। যাইহোক, বিশ^স্ত গাড়ির চালক পাওয়া সৌভাগ্যের বিষয়। এমন সৌভাগ্যবান গাড়ি মালিক ও প্রতিষ্ঠানও কিন্ত রয়েছে সমাজে বিস্তর এবং তা সৎ চালকের কারণেই।

প্রতিদিন তেল কিংবা গ্যাস চুরি করে কতটা সম্পদ আর কত টাকার মালিক হওয়া যায়। নিশ্চয়ই চালক মালেক যা করেছে বা পেরে উঠেছে তা এই চুরি দ্বারা আদেও সম্ভব নয়। এর পেছনে অজগর টাইপের কিছু কিংবা কেউ আছেন। যা হয়ত এখনো দৃশ্যমান হয়ে উঠেনি। তবে জনগন ভাবছেন অন্য কথা। তাঁরা অপেক্ষায় আছেন সত্য উদঘাটনের। কোন পাপ কোনদিনও চাপা থাকে না, থাকেনি। এখানেও থাকবে না নিশ্চিত। কোন প্রভাবশালী হাত কিংবা কাউকে রক্ষা করবার অপচেষ্টা না থাকলে নিশ্চয়ই সত্য উদঘাটিত হবে একদিন বিলম্বিত হলেও। আর প্রকৃতির নিয়ম বদলায় না। প্রকৃতি সত্য বুঝিয়ে দেয় তার আপন নিয়মে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্পর্কে দেশজুড়ে যে নেতিবাচক বাতাস বইছে তাতে অনাস্থা, অবিশ^াস আর দুর্নীতির প্রলয়ংকারী ছোবলে তছনছ করেছে সাধারন মানুষের নির্ভরতা। অসুস্থ বোধ করলেও হাসপাতালে যেয়ে চিকিৎসা সেবা নেবার প্রবণতা কমেছে। রিপোর্ট জালিয়াতির ঘটনায় কোভিড ১৯ টেস্ট করা থেকে মানুষের বিরত থাকবার কারণের মতোই হাসপাতালে যেয়ে কোভিড ১৯ চিকিৎসা নেবার অনাগ্রতা তাদের। কী সাংঘাতিক ক্ষয়, মরণব্যাধি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শরীরে। এটা যে জনগণের স্বাস্থ্যকে অরক্ষিত করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে দিন দিন সেই সত্যটুকু কেউ বুঝতে চেষ্টা করলো না ! কেউ তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন করে দেখালেন না! ভেবে অবাক হই, কেউ কী ছিলো না এসব অনিয়ম, অনৈতিক, দুর্নীতি দেখার ! কেউ কী নেই এসব অনিয়মের, দুর্নীতির দায় নেবার ! বড়সড় বেতনভাতা, পদ নিয়ে এত্তোগুলো মানুষ কী করেছে তাহলে দীর্ঘদিন। একজন গাড়ির চালক কীভাবে শত কোটির টাকা মালিক হতে পারেন তার জবাব খুঁজতে সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় না আনা হলে কখনোই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন সম্ভব হবে না বা তথ্য পাওয়া যাবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যারা এখনো সততার দাবী তোলেন তারা এখন কী বলবেন খুব জানতে ইচ্ছে করছে। সৎ লোক যে নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তাও কিন্ত নয়। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের তালিকা যেভাবে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে তাতে সৎ আর ভালো মানুষের চেহারা দেখবার সুযোগ কোথায়। একটা বাগানে দশটা আমগাছ আর একটা লিচু গাছ থাকলে তো সেই বাগানকে কেউ লিচু বাগান বলবে না, কিংবা বলে না। সবাই তো আম বাগানই বলবে। তাহলে একটা প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরাট একটা অংশ দুনীতিবাজ হলে সেই প্রতিষ্ঠানকে লোকে কী বলে সম্বোধন করবে, মূল্যায়ণ করবে সেই প্রশ্ন কিন্ত এসেই যায় । আজ সাধারণ মানুষ সেইভাবে একটা সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্বোধন করলে, সাধারণ মানুষের দোষ কোথায় থাকে ? থাকে না।

বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে একজন গ্রাহককে সেবা নিতে অনেক তথ্য দিতে হয়। যার মধ্যে আয়ের উৎস একটা অন্যতম বিষয়। নিয়মিত কর প্রদান করছে কিনা তাও। যতটুকু জেনেছি বাংলাদেশ ব্যাংক সব কিছু অবগত থাকেন। তথ্য রাখেন। তাহলে একজন গ্রাহকের ৫০ বা ৫২ টি ব্যাংক একাউন্ট থাকে কী করে ! কীভাবে অর্থ পাচার হয়, কী করে ঋণখেলাপী হয়ে পুনরায় ঋণ সুবিধা পায়, এমন হাজারো প্রশ্ন এখন দেশময়। এসব প্রশ্নের উত্তর ন্যায়সঙ্গতভাবে এবং সততার সাথে লিপিবদ্ধ করা না গেলে অসৎ চক্রকে নির্মূল করা যাবে না। সম্ভব নয়। খুব স্পষ্ঠ যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অসৎ লোকজন রয়েছে এবং তারা এক হয়ে গোটা দেশে কামড় বসিয়ে আসছে।

প্রতিটি সরকারি বিভাগের মাথার উপর মস্ত এক একটা মন্ত্রণালয় থাকে। বড়, মাঝারী, নিম্ন বিভিন্ন ধরনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী থাকেন। নিশ্চয়ই তাঁদেরও জবাবদিহিতা আছে। আছে দায়বদ্ধতা। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি সরকারের ভেতর যদি এই জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা সর্বাগ্রে শতভাগ নিশ্চিত করা যায় এবং জনগণের আদালতে তা দৃশ্যমান করার ব্যবস্থা থাকে তাহলে সেইসব মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে সব বিভাগ জনকল্যাণে দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকবে তারা অন্যায়, অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকবার চেষ্টা করবে। সরকার প্রধান ঘর পরিস্কার করবার কথা বলেছেন। আমি মনে করি প্রতিটি মন্ত্রণালয় আগে পরিস্কার করা যায়। এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান হতে পারে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত করার মধ্য দিয়েই।
পরিশেষে বলি, চালক মালেক কোন বিরাট অপরাধচক্রের প্রাথমিক নমুনা কীনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। যদি এতে বড়সড় অপ্রত্যাশিত, বিস্ময়কর কোন তথ্য বেরিয়ে আসে তা প্রকাশিত হওয়া যেমন দরকার, তেমন দরকার তার উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা। কারণ, এরা বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর নয়, বরং সর্বগ্রাসী শ্রেণি। এদের নির্মূল করা দরকার। যেমন আমরা স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার করবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি।

স্বপ্না রেজা: কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত