প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রফেসর ড. এম.শাহ্ নওয়াজ আলি: বহুমুখী যুদ্ধে জয়ী শেখ হাসিনা

প্রফেসর ড. এম.শাহ্ নওয়াজ আলি: পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি এবং দেশীয় ঘাতকচক্রের রক্ত পিপাসার শিকার হয়ে পঁচাত্তরের পনেরো আগস্ট সপরিবারে শহীদ হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে (বোন রেহানাসহ) দেশের বাইরে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তারপর গত ৩৫ বছরে তার জীবনের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য বাধা-বিপত্তি আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুমের। আবার কখনোবা সফল রাষ্ট্র নায়কের। ১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮১ সাল কেটেছে স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে দেশের বাইরে। এই ক’টি বছর দেশে ছিলো হত্যা, ক্যু, পাল্টা ক্যু কিংবা সামরিক শাসনের নামে গণতন্ত্র হত্যা, বিচারের নামে প্রহসন চালিয়ে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যাসহ এক নৈরাজ্যকর বাংলাদেশ।

১৯৮১ সালে দেশের টানে, দেশেপ্রেমের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে রচিত হতে থাকে নতুন ইতিহাস। শেখ হাসিনার জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। স্বৈরাচার এরশাদ কিংবা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব তথা গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে নিরন্তর চেষ্টা চালাতে গিয়ে তিনি বহুবার হামলার শিকার হয়েছেন, ঘাতকদের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের মানসকন্যা হয়ে সৃষ্টিকর্তার অলৌকিক নিয়মে তিনি আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন। ৮১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অসংখ্যবার ঘাতকদের হত্যা চেষ্টাকে পরাজিত করে কখনো রাষ্ট্রনায়ক, কখনোবা বিরোধীদলীয় নেত্রী, আবার কখনো রাজপথের প্রতিবাদী কাণ্ডারি হয়ে দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এ কথা স্বীকার করতেই হবে ঘাতকদের হিংস্র থাবা থেকে, স্বাধীনতাবিরোধীদের হামলা থেকে, মৌলবাদী ও জঙ্গিদের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা থেকে একাধিকবার বেঁচে গিয়ে শেখ হাসিনা আজ ইতিহাসের জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। সন্ত্রাসমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত, অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করে ছুটে চলেছেন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাটুরিয়া। কারণ তার শরীরে বইছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের সৎ, সংগ্রামী, প্রতিবাদী এবং দেশপ্রেমের রক্তের ধারা।

১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনার জীবনে একটি রক্তাক্ত দিন। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের সমাবেশে যাওয়ার প্রাক্কালে এরশাদের মদদপুষ্ট তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে গুলিতে প্রাণ হারায় ৪০ জন নেতাকর্মী। শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি করলেও ৪০ নেতাকর্মীর রক্তের বিনিময়ে ঘাতকদের টার্গেট ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনা বেঁচে যান। এরপরও থেমে থাকেনি ষড়যন্ত্রকারীরা। একই বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসের কর্মসূচি চলাকালে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে ঘাতক চক্র। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে পতন হয় স্বৈরশাসক এরশাদের। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে শুরু হয় আরেক অধ্যায়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই বছর ১৫ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচনের দিন ধানমন্ডির গ্রিন রোডে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে ঘাতকেরা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সেবারও ঘাতকদের টার্গেট ব্যর্থতায় পরিণত হয়। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে সারাদেশ যখন আন্দোলন-সংগ্রাম উত্তাল সেই মুহূর্তে দেশব্যাপী লং মার্চের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ট্রেনে যাওয়ার পথে পাবনার ঈশ্বরদীতে শেখ হাসিনার কামরাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি করে ঘাতকেরা। কিন্তু শেখ হাসিনা অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান। ১৯৯৫ সালের মার্চে পান্থপথে আওয়ামী লীগের দলীয় সভায় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করা হয়।

১৯৯৬ সালে কার্জন হলের একটি অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে। কিন্তু প্রতিবারই ঘাতকেরা ব্যর্থ হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গিয়েছেন। ১২ জুন ১৯৯৬ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ’৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ঘাতক চক্র এবং তাদের দোসররা, স্বাধীনতাবিরোধীরা তাকে হত্যার নতুন পন্থা খুঁজতে থাকে। ৯৬ সালের ১৫ আগস্ট টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর মাজারে বোমা হামলার পূর্ব পরিকল্পনা গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে আগেই ফাঁস হওয়ায় চক্রান্তকারীরা ব্যর্থ হয়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের শক্তিশালী বোমা পুঁতে রাখে ঘাতকরা। জঙ্গি তথা মৌলবাদী নেতা মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে ওই হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতায় ঘাতকদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে যান। ২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর উদ্বোধনের দিন শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। ২০০১ সালের ১৪ জুলাই মেয়াদপূর্তি শেষে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন। ১ অক্টোবর ২০০১ সালের নীল নকশার নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা দখল করে। শুরু হয় হত্যা, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, কালো টাকার জোয়ার এবং সংখ্যালঘু নির্যাতন, তথা মানবতাবিরোধী সব অপরাধ কর্মকাণ্ডে জর্জরিত হয়ে সৃষ্টি হয় বিবর্ণ এক বাংলাদেশ।

কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে সে আইন বাতিল করে শেখ হাসিনাকে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় ফেলে ঘাতকদের উসকে দিয়ে হত্যার পথ প্রশস্ত করে দেয়। জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে সে ঘৃণিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। কিন্তু ঘাতকদের মূল টার্গেট ব্যর্থ হয়। গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে যান শেখ হাসিনা।

লেখক : শিক্ষাবিদ।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত