প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মিল্টন বিশ্বাস: স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ হাসিনা এবং রূপকল্প ২০৪১

ড. মিল্টন বিশ্বাস: বঙ্গবন্ধু জন্মশত বর্ষে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১’(মার্চ ২০২০) দেশবাসীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‘রূপকল্প ২০৪১’ কে নীতিমালা ও কর্মসূচিসহ একটি উন্নয়ন কৌশলে রূপান্তরের জন্য এ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ দলিল মূলত ২০৪১ সালের মধ্যে এক সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ অর্জনে সরকারের উন্নয়ন রূপকল্প, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহের একটি কৌশলগত বিবৃতি এবং তা বাস্তবায়নের পথ-নকশা। ৪টি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, যেমন : সুশাসন, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ পরিকল্পনার সুফলভোগী হবে জনগণ এবং এরাই হবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকাশক্তি।

[১] ২০০৯ সাল থেকে ১৩১টি প্রকাশনা নিয়ে এদেশের অগ্রগতির স্পষ্ট চিত্রটি মানুষের সামনে তুলে ধরার কৃতিত্ব সিনিয়র সচিব অধ্যাপক ড. শামসুল আলমের। যিনি এদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করে চলেছেন। কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা ও সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নে রাষ্ট্রনায়কের সময়োচিত নির্দেশনা, পদক্ষেপ ও অভিমত সমূহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বাইরে থেকে নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে শেখ হাসিনার নির্দেশনা বাস্তবে রূপ দেওয়ার সক্ষমতার দৃষ্টান্ত হলো, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের বিপুল সংখ্যক প্রকাশনা। এর মধ্যে ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ একুশ শতকের বাংলাদেশ’ এবং ‘টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট, বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০২০’ উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা। আওয়ামী লীগ সরকারের আগে অন্য কোনো সরকারকে এদেশের ভবিষ্যত রূপরেখা প্রণয়ন করতে দেখা যায়নি। আর রূপরেখা অনুসারে প্রতি অর্থবছরে বাজেট পেশ এবং টার্গেট পূরণের জন্য কাজ করায় এদেশকে এখন গতিশীল ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভীত তৈরি করে দিয়েছে।

[২] জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। বাংলাদেশ একদিন ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে ২০ বছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ড. শামসুল আলম শেখ হাসিনা সম্পর্কে লিখেছেন। তার সরাসরি নির্দেশনায় এই প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। গত অক্টোবর ২০১৫ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়নের কাজ শুরুর বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন। উক্ত পরিকল্পনা দলিলের জন্য দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠিত হয়। একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এই দলিলটি প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সাথে দলিলের উপর মতামত চাওয়া হয়। এ দূরদর্শী পরিকল্পনা দলিলটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের পূর্বে প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রীর সভাপতিত্বে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনার ওপর সকল মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রতিনিধিদের সাথে এনইসি সম্মেলন কক্ষে একটি বর্ধিত পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রণালয় বা বিভাগ হতে প্রাপ্ত মতামত সমূহ খসড়া পরিকল্পনা দলিলে যৌক্তিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

দলিলটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি একটি ভিশন দলিল, এটি একটি দিকনির্দেশনা মূলক দলিল এবং এর ওপর ভিত্তি করে ৪টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। সেখানে বিস্তারিতভাবে কৌশলসমূহের উল্লেখ থাকবে। দুটি কারণে দলিলটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। প্রথমত, যদি বাংলাদেশ ২০২১ সালে স্বল্পউন্নত দেশ হতে উত্তরণের শর্ত পূরণ করে, তবে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিক উত্তরণ সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত , ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট বাস্তবায়ন। এ প্রসঙ্গে আরও বলতে চাই যে, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২০-২০২৫) তৈরিতে সহায়তা করার জন্য আমাদের স্বপ্ন পূরণের এই দলিল (২০২১-২০৪১) নির্ধারিত সময়ের এক বছর পূর্বে প্রণয়ন করতে হয়েছে। কারণ প্রেক্ষিত পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়িতব্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মধ্যে এটাই হবে প্রথম।

দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা মেয়াদে অষ্টম, নবম, দশম ও একাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রেক্ষিত পরিকল্পনার উদ্দেশ্য অর্জনের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে। এই ভিশন দলিলটির ১২ টি অধ্যায় রয়েছে। যার মধ্য উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হলো : সুশাসন, মানব উন্নয়ন, শিল্প ও বাণিজ্য, কৃষি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানী, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ। এর মধ্যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো আছে। যাতে প্রতি অর্থবছরে অর্থনীতির সূচকগুলোর লক্ষ্যমাত্রা বিস্তারিতভাবে দেওয়া আছে। আমি আশা রাখবো এই দলিলের আলোকে মন্ত্রণালয় বা বিভাগগুলো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।

লেখাবাহুল্য বাংলাদেশে রূপরেখা অনুসারে স্বপ্ন বাস্তবায়নের এই প্রত্যাশার সূচনা হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। বিএনপি-জামায়াতের অপরাজনীতি থেকে দেশকে উদ্ধার করে ২০০৯ সালে। তিনি দিনবদলের সনদ গ্রহণ করেছিলেন। প্রতিশ্রুতি ছিলো ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনা, দারিদ্র্য মোকাবেলা, জনগণের জীবনমান উন্নয়নসহ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে আসীন করা। আওয়ামী লীগের ‘রূপকল্প ২০২১’ বাস্তবায়নের জন্য প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১’ প্রণয়ন করে দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা হয়।

ষষ্ঠ এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্পউন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনীয় সকল মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে। ২০১৫ সালের এমডিজি’র অধিকাংশ লক্ষ্য অর্জনসহ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশের শ্রেণিভুক্ত হয়েছে এবং দশকব্যাপী ৭ শতাংশ হারে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনও সম্ভব হয়েছে। ‘রূপকল্প ২০২১’ এর সাফল্যের ধারাবহিকতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্বপ্নের উন্নয়নের পথে জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই ‘রূপকল্প ২০৪১’ গ্রহণ করা হয়।

শেখ হাসিনা চেয়েছেন, ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান ও উচ্চ-মধ্য আয়ের সোপানে উত্তরণ, এদেশ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের অবলুপ্তিসহ উচ্চ-আয়ের উন্নত দেশের মর্যাদায় আসীন করতে। বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চ-মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে, গ্রাম প্রকৃতই হবে এদেশের শহর। উল্লেখ্য বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০১০-২০২১ প্রণয়নের ১০ বছর শেষ হবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নিত হওয়া এবং ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর রূপান্তর ঘটানোর যে প্রত্যয় ছিলো তা ২০২০ সালের করোনা মহামারির মধ্যেও টার্গেট পূরণে এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে এদেশ আজ তার সুরক্ষা ও সমৃদ্ধি অর্জনের পথের সন্ধান পেয়েছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিণত করতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষা ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি জ্ঞানের বিকল্প নেই। গত একদশকে শেখ হাসিনা সরকার সরকারি সেবা প্রদানের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রবর্তনের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি প্রভৃতি খাতে সেবা প্রদানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণের জীবনমানের ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে।

লেখক : কবি, কলামিস্ট, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম, নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত