প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আবদুল মান্নান : শেখ হাসিনার ক্লান্তিহীন পথচলা

আবদুল মান্নান : ২৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন। ২০১৮ সালে এদিনে আমি বঙ্গবন্ধু কন্যার সঙ্গে তাঁর সফরসঙ্গী হয়ে জাতিসংঘের ৭৩তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে ছিলাম। সেখানে অত্যন্ত ঘরোয়া ও অনাড়ম্বর পরিবেশে দিনটি তিনি নিকটজনদের নিয়ে পালন করেছিলেন। ছোট বোন শেখ রেহানা আর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সঙ্গে ছিলেন। চেষ্টা করেছিলাম দিনটা একটু ঘটা করে পালন করা যায় কিনা তা জানতে। তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন জন্মদিনে তাঁর পরিবারের সঙ্গে কাটান, বাইরে কখনও অনুষ্ঠান করেন না। বঙ্গবন্ধু কখনও নিজের জন্মদিন পালন করেননি। তাঁর অনেক জন্মদিন কারাগারে কেটেছে। সাধারণত যে তারিখে শেখ হাসিনার জন্মদিন একই সময় জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বসে এবং নিয়মিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাতে উপস্থিত থাকেন এবং বাংলাদেশের তো বটেই; বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত জনগণের মানুষের কথা বলেন, ঠিক যেভাবে ১৯৭৪ সালে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে তাঁর পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন।
এই বছর তিনি করোনাজনিত কারণে ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত আটটায় ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছেন। সে সময় নিউ ইয়র্ক সময় রাত দশটা। এর আগে শেখ হাসিনা ১৬ বার সশরীরে বিশ্বসভায় উপস্থিত থেকে বক্তৃতা দিয়েছেন। এবার তার ব্যতিক্রম হলো।
এ বছর শেখ হাসিনা তাঁর বক্তৃতায় জোর দিয়েছেন কোভিড-১৯ মহামারিজনিত সমস্যাকে। মহামারির মহাসংকটে পৃথিবীর সব মানুষের ভাগ্য যে ‘একই সূত্রে গাঁথা’ সেই সত্যটি বিশ্বনেতাদের মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা তাদের বলেন, এই মহামারি দমনে টিকা উদ্ভাবন সম্ভব হলে তা যেন সব মানুষের হাতে পৌঁছে তার দায়িত্ব এই বিশ্বনেতাদের নিতে হবে। তিনি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে সে দেশের দশ লক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিকের বাংলাদেশে উদ্বাস্তু জীবনযাপন ও তাদের সমস্যা সমাধানে বিশ্বসম্প্রদায়ের ভূমিকার গুরুত্বের কথা মনে করিয়ে দেন। বলেছেন, এই সমস্যা মিয়ানমারকেই সমাধান করতে হবে। আজকের এই দিনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা, যিনি পিতার আদরের ‘হাচু’, তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও উষ্ণ অভিনন্দন।
বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আসার কথা ছিল না। আজকাল যেমন কথায় কথায় মানুষ রাজনীতিতে নেতা হয়ে চলে আসে, বঙ্গবন্ধুর সময় রাজনীতির সংস্কৃতিটা তেমন ছিল না। তিনি রাজপথের কর্মী থেকে নেতা হয়েছিলেন। বর্তমান সময়ে কর্মী হওয়ার প্রয়োজন নেই, অর্থ আর সঠিক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে রাতারাতি নেতা হওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর সময় যারা রাজনীতিতে আসতেন তাদের সুস্থ রাজনীতির প্রতি কমিটমেন্ট ছিল। টাকা থাকলেই রাজনীতিবিদ হওয়া যেত না। বঙ্গবন্ধু বা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যারা রাজনীতি করেছেন তাদের মধ্যে কেউ তেমন একটা অর্থবিত্তের মালিক ছিলেন না। বঙ্গবন্ধু তো ঢাকায় এসে ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী তাজউদ্দীন আহমদ ধানমন্ডিতে একটি প্লট কেনার জন্য বললে বঙ্গবন্ধু তেমন একটা আগ্রহ দেখাননি। তিনি বলেছিলেন, সেখানে তো সন্ধ্যা নামার আগেই বাঘ ডাকে। শেখ হাসিনা মায়ের সঙ্গে টুঙ্গিপাড়ায় থাকতেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি প্রথমবারের মতো পরিবারের সদস্যদের ঢাকায় আনেন। শেখ হাসিনা আজিমপুর গার্লস স্কুলে ভর্তি হন। শেখ হাসিনার জীবনটা অনেকটা ব্যতিক্রমধর্মী। জন্ম থেকেই বাবাকে দেখেছেন একজন রাজনৈতিক কর্মী। নিয়মিত জেলে যাচ্ছেন আর আসছেন। সংসার সামাল দিচ্ছেন একেবারেই আটপৌরে আবহমান একজন মা, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, যিনি কখনও সন্তানদের বুঝতে দেননি বাড়ির কর্তার অবর্তমানে সংসার চালানো কত কঠিন। পিতা হিসেবে একমাত্র শেখ হাসিনা ও কিছুটা শেখ রেহানার কাছে বঙ্গবন্ধু পরিচিত ছিলেন। শেখ কামাল একবার বড় বোনের কাছে আবদার করেছিলেন ‘তোমার বাবাকে আমি একটু বাবা ডাকি?’ ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ের অনুষ্ঠানটা অত্যন্ত অনাড়ম্বর ও সাদামাটা ছিল। কারণ, বঙ্গবন্ধু তখন কারাগারে। বেগম মুজিবকে এক নিকট আত্মীয়ের কাছে টাকা ধার করতে হয়েছিল এই বিয়ের জন্য। শেখ হাসিনার বৌ-ভাতের অনুষ্ঠান হয়েছিল চট্টগ্রামের রাইফেল ক্লাবে। আয়োজন করেছিলেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা।
বিয়ের পর শেখ হাসিনা ঘর-সংসার নিয়ে একজন বাঙালি বধূ আর বঙ্গবন্ধুর কন্যা ছাড়া তাঁর আর কোনও পরিচয় ছিল না। কলেজ জীবনে তিনি ইডেন গার্লস কলেজ ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে অন্য আর দশ জন শিক্ষার্থীর মতো অংশ নিয়েছেন কিন্তু ছাত্রলীগের কোনও পদ-পদবি পাওয়ার চেষ্টা করেননি। বর্তমান সময়ে তা অবিশ্বাস্য মনে হবে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট যখন ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে তাঁর নিজ বাসভবনে হত্যা করে শেখ হাসিনা তখন স্বামীর সঙ্গে বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাড়িতে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৫ দিন আগে শেখ হাসিনা ও ছোট বোন দেশ ছেড়েছিলেন স্বামীর সঙ্গে যোগ দিতে। সঙ্গে ছোট বোন শেখ রেহানা। খবর শুনে সানাউল হক তাদের সকলকে অনেকটা জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ১৯৮১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত তিনি দেশের বাইরে শরণার্থী জীবনযাপন করেছেন। মাতৃস্নেহ দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে আগলে রেখেছিলেন দিল্লিতে। তাঁর স্বামীকে একটি চাকরি জোগাড় করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তখন আওয়ামী লীগ অনেকটা ছত্রভঙ্গ। দলের ভেতর আন্তদলীয় কোন্দল তখন চরমে। অনেকে জিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। এই এক কঠিন সময়ে দলের হাল ধরেছিলেন শহীদ তাজউদ্দীনের স্ত্রী বেগম জোহরা তাজউদ্দীন। যারা আওয়ামী লীগ আর বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে তাদের শঙ্কা, যে দলটির নেতৃত্বে দেশটি স্বাধীন হলো সে দলটির পরিণতি কী মুসলিম লীগের মতো হবে? যারা তখনও মাটি কামড়ে পড়ে আছে আওয়ামী লীগ আবার সমহিমায় ফিরবে বলে তাদের বিশ্বাস। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকার শেখ হাসিনাই বাঁচাতে পারে তাঁর পিতার হাতে গড়া আওয়ামী লীগকে।
১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত দলের কাউন্সিলে শেখ হাসিনার অবর্তমানে তাঁকে সভাপতি করা হলো। তবে সকলে এই নিয়োগ যে খোলা মনে নিয়েছিলেন তা মনে করলে ভুল হবে। অনেকে ধারণা করেছিলেন, শেখ হাসিনা হবেন দলের সাক্ষীগোপাল সভাপতি আর দল চালাবেন তারা। তারা ভুলে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনার ধমনিতে শেখ মুজিবের রক্ত, যিনি পাকিস্তানের তেইশ বছর শাসনামলে প্রায় তের বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন অন্তত দু’বার। তাঁর কন্যা তো সাক্ষীগোপাল কলাগাছ হওয়ার জন্য জন্ম হয়নি। যিনি একরাতে সব হারানোর বেদনাকে জয় করতে পারেন তাঁর তো হারাবার আর কিছু থাকতে পারে না।
দেশে ফেরার পরের অভিজ্ঞতা তেমন সুখের ছিল না। একদিকে জিয়া তাঁর পথ বন্ধ করে রেখেছে। ধানমন্ডির যে বাড়িতে শেখ হাসিনার বাবা মাসহ পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, জিয়া তাঁকে সে বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না। রাস্তার ওপর বসেই শেখ হাসিনা দলের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে দোয়া পড়লেন। এরপর দল গোছানোর মতো কঠিন কাজ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর বদলে গেছে অনেক কিছু। জেনারেল জিয়ার বদান্যতায় দেশে চলছে স্বাধীনতাবিরোধীদের উল্লাস নৃত্য। চারদিকে রাজাকার আল-বদরদের রমরমা অবস্থা। দলের ভেতর কে যে শত্রু আর কে যে প্রকৃত মিত্র তা বোঝা সহজ নয়। একসময় বঙ্গবন্ধু যাদের নিজের মানুষ মনে করেছিলেন তারাই তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বুকে প্রথম গুলি চালিয়েছে। রাজনীতি থেকে অনেক দূরের একজন শেখ হাসিনা এসব বুঝতে বেশ সময় লেগেছে। পিতার মতো ধৈর্য আর প্রখর পর্যবেক্ষণ শক্তি তাঁর সহায়ক ছিল। সঙ্গে ছিল কিছু আস্থাভাজন কর্মী। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকেই তার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল তৃণমূলের বিশাল কর্মী বাহিনী, যার শত প্রতিকূল অবস্থাতেও দল ছেড়ে যাননি। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। এরশাদ পতনের পর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় অনেকটা অতিমাত্রায় আত্মসন্তুষ্টি আর ‘জিতেই তো যাচ্ছি’ চিন্তা নিয়ে গাছাড়া ভাব, সঙ্গে ছিল এক ভয়াবহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। এরপর ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে চার মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে, যা উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি রেকর্ড। যে শেখ হাসিনা একজন গৃহবধূ হিসেবে সংসার পেতেছিলেন, তিনি এখন বিশ্বদরবারে শুধু একজন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত নন, তিনি এখন একবিংশ শতকের একজন মডেল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে যেকোনও আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি যখন কথা বলেন বিশ্বের অন্য নেতারা তা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, সকলে স্বীকার করেন শেখ হাসিনা আর তাঁর নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ থেকে শেখার আছে অনেক কিছু।
শেখ হাসিনার সরকারের প্রথম মেয়াদ (১৯৯৬-২০০১) ছিল সবচেয়ে কঠিন। কারণ, বস্তুতপক্ষে পুরো আমলাতন্ত্রই ছিল পঁচাত্তর পরবর্তী সময়কালের রিক্রুট। এমনিতে একটি সরকার কার্যকরভাবে চালাতে হলে চাই একটি সরকার সহায়ক আমলাতন্ত্র। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পরিকল্পনা তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র। নাটের অন্যতম গুরু মাহবুব উল চাষি একজন বড় মাপের আমলা ছিলেন। ১৯৭৪ সালে যখন দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয় তখন খাদ্য সচিব ছিলেন আবদুল মোমেন খান (বিএনপি নেতা আবদুল মঈন খানের পিতা)। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর জিয়া এই মোমেন খানকে তাঁর একজন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন। ২০০৯-১৪ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে শেখ হাসিনার শাসন এই দেশটির জন্য শুধু একটি আশীর্বাদই নয়, একটি টার্নিং পয়েন্টও। এই তিন মেয়াদে তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার শেষ করেছিলেন, যা বন্ধ করার জন্য বেগম জিয়া ও তাঁর সভাপরিষদ অনেক চেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে দুরূহ কাজ মনে করা হতো একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা। তাও তিনি করে দেখিয়েছেন। একটি অর্থনৈতিকভাবে অনুন্নত ও ক্ষয়িষ্ণু বাংলাদেশকে উন্নয়নের সড়কে তুলে দিয়েছেন। রিলিফ শব্দটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে অপরিচিত করে দিয়েছেন। ঐতিহাসিকভাবে একটি খাদ্য ঘাটতির দেশকে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে রূপান্তর করে দিয়েছেন। একসময় বিদ্যুতের অভাবে লোডশেডিং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী ছিল তা এখন মানুষ ভুলতে বসেছে। যে দেশের মানুষ তিন দশক আগেও গরুর গাড়িতে বসতে অভ্যস্ত ছিল, সেই দেশ এখন মহাশূন্যে নিজস্ব উপগ্রহ পাঠায়, নিজের অর্থায়নে পদ্মা সেতু বানায়। একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দ্বারপ্রান্তে। এতসব অর্জনের কৃতিত্ব শেখ হাসিনাকে না দিলে তা হবে মহা অন্যায়। বঙ্গবন্ধুকন্যা আক্ষরিক অর্থেই এখন বাংলাদেশের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। তবে তাঁর আমলের সব অর্জন নস্যাৎ করার শপথ নিয়ে মাঠে নেমেছে একশ্রেণির হাইব্রিড দলীয় নেতাকর্মী, যাদের অর্থবিত্তের লোভ আর কালো টাকার প্রতি আত্মসমর্পণ লাগামহীন হয়ে পড়েছে। আর তাদের সর্বাত্মক সহায়তা করেছে বঙ্গবন্ধু কন্যার আস্থাভাজন কিছু আমলা আর কাছের মানুষ, যা আজ ওপেন সিক্রেট। জনমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধুকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল তাঁরই চারপাশে থাকা কিছু মানুষ আর চাটুকার। সার্বিক অবস্থা বিচার করলে মনে হবে, বর্তমানে শেখ হাসিনাও একই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। শেখ হাসিনা অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন এমন একজন শ্রদ্ধাভাজন মানুষ (বর্তমানে প্রয়াত) একদিন আমাকে বলছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, তিনি যাঁকে ফোন করে প্রধানমন্ত্রীর একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইবেন তিনি তাঁর ফোন রিসিভ করেন না। এমন অভিযোগ আরও কয়েকজনের কাছে শুনেছি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাওয়ার আগে এক অদৃশ্যশক্তির বলে পাল্টে যায়। ভুল উপস্থাপনার কারণে কখনও কখনও ভুল সিদ্ধান্তও হয়। এতে ক্ষতি হয় সরকারের।
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর দেশকে অনেক দিয়েছেন। তিনি যখন বলেন দিনে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পারেন, তখন বোঝা যায় একজন শেখ হাসিনার কাঁধের ওপর পুরো বাংলাদেশটাই যেন ভর করেছে। তাঁর সঙ্গে তিনবার বিদেশ যাওয়া সুবাদে বুঝতে পারি তাঁর সঙ্গে যারা কাজ করেন কেন তাঁরা বলেন শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করলে দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। মনে রাখেন তিনি সবকিছু। অবলীলাক্রমে বলতে পারেন, ক্ষমা করে দিয়েছি কিন্তু ভুলতে পারবো না।
শেখ হাসিনা আজ ৭৩ শেষ করে ৭৪ বছরে পা দিলেন। মাঝে মাঝে বলেন তিনি অবসরে যাবেন। আমি লিখেছিলাম বিকল্প তো তৈরি হয়নি কীভাবে অবসরে যাবেন? বন্ধু মুনতাসির মামুন লিখেছেন শেখ হাসিনার বিকল্প শেখ হাসিনা। এসব কথা আবেগের। শেখ হাসিনাকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন ও ভালোবাসি বলে। কিন্তু আবেগ দিয়ে তো বেশি দূর যাওয়া যাবে না। বিশ্বাস করতে চাই শেখ হাসিনা তাঁর পিতার পর বাঙালির উজ্জ্বলতম বাতিঘর। কিন্তু মানতে চাই না তিনি শেষ বাতিঘর। আবেগ বর্জিতভাবে চিন্তা করতে হবে পরবর্তী বাতিঘর কে হবেন। পিতার অসাধ্য কাজ কন্যার হাত ধরে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারপরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। কে হবেন সে পথের দিশারী? আবারও বলি শেখ হাসিনার বিকল্প তো এখনও দেখছি না। শেখ হাসিনা আপনি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাঙালিকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যেতে অনেকটা অলৌকিকভাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ঘাতকের বুলেটের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু শতায়ু হতে পারেননি। তাঁর কন্যা শতায়ু হোন আজকের দিনে এই প্রার্থনা করি। করোনাকালে ভাগ্য ভালো থাকলে শেখ হাসিনার সঙ্গে হয়তো কখনও আবার দেখা হবে অন্য কোনও প্রেক্ষাপটে। আলাপ হবে তাঁর সঙ্গে কোনও এক অর্জনের ইতিহাস নিয়ে। ততদিন তিনি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, এই কামনা করি।

লেখক: সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন

সর্বাধিক পঠিত