প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন পরিপালনে ব্যর্থ বাংলাদেশ

ডেস্ক রিপোর্ট : আয়নাল হোসেন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স ও পাঁচজন সহযোগী জনবল থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালে তা নেই। পাশাপাশি যে জনবল কাঠামো রয়েছে, তার অধিকাংশ পদই শূন্য। ফলে এতে স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। আগামী ২০ বা ৫০ বছরে স্বাস্থ্য বিভাগে কোন ক্যাটেগরিতে কত জনবল প্রয়োজন হবে, এখনই তা নির্ধারণ করতে হবে। যাতে জরুরি প্রয়োজনে তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়।

দেশে করোনাভাইরাসের সময় চিকিৎসক, নার্স ও প্যারামেডিকস নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে রেজিস্টার্ড চিকিৎসক রয়েছেন এক লাখ দুই হাজার ৯২৭ জন। অথচ সহযোগী জনবল বা প্যারামেডিকসের পদ আছে মাত্র ৩৩ হাজার ৯৬৫। অথচ চিকিৎসকের পাঁচগুণ জনবল থাকার কথা ছিল প্যারামেডিকস ও সহযোগী জনবল বা নন-মেডিকেল সাপোর্টিং স্টাফ হিসেবে। দেশে এক হাজার ৫৮১ জনসংখ্যার বিপরীতে একজন চিকিৎসক, দুই হাজার ৮৬৮ জনের বিপরীতে একজন নার্স ও চার হাজার ৭৯০ জনসংখ্যার বিপরীতে একজন প্যারামেডিকস রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগে প্যারামেডিকস বা সহযোগী জনবলের যত পদ রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই বর্তমানে শূন্য।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকাল হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য বিভাগের বিদ্যমান কাঠামোতে চিকিৎসক ও নার্সসহ সর্বমোট জনবলের পদ রয়েছে এক লাখ ৬২ হাজার ৪৫০টি। এদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৪৯ হাজার ৪৫১টি বা ৩৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমএলএসএস পদ রয়েছে ৯ হাজার ৭৭০টি। এর মধ্যে বর্তমানে শূন্য রয়েছে তিন হাজার ৪০৪টি বা ৪৪ শতাংশ পদ। ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টের পদ আছে দুই হাজার ৮৯০টি। এর মধ্যে শূন্য এক হাজার ৩৯৭টি পদ। সুইপারের পদ আছে পাঁচ হাজার ৮৮৫টি, শূন্য দুই হাজার ৩০১টি বা ৪০ শতাংশ। আয়ার পদ আছে এক হাজার ৭৬৬টি, বর্তমানে শূন্যপদ ৮৮৫টি বা ৪৭ শতাংশ। মেডিকেল টেকনোলজিস্টের পদ রয়েছে এক হাজার ৯৬২টি। এর বিপরীতে শূন্য ৭৬১টি বা ৩৮ শতাংশ। কুক-মচালশির পদ রয়েছে এক হাজার ৮১৬টি। এর বিপরীতে শূন্য পদের সংখ্যা ৭৬১টি বা ৪৭ শতাংশ। স্বাস্থ্য সহকারীর পদ রয়েছে ২০ হাজার ৯০৮টি। এর বিপরীতে শূন্য পদ পাঁচ হাজার ৭৫৮টি বা ২৭ শতাংশ। ডোমের পদ আছে ১৪৯টি। এর বিপরীতে শূন্য ৭০টি বা ৪৫ শতাংশ পদ। ওয়ার্ড বয়ের পদ আছে দুই হাজার ৪৭৪টি। এর বিপরীতে শূন্য পদ এক হাজার ১৩২টি বা ৪২ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতে জনবল নিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ জনশক্তির বিকল্প নেই। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। আর যে জনবল রয়েছে, তার অপব্যবহার হচ্ছে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়, বিএমডিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে যৌথভাবে পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

রাজধানীর তিনটি মেডিকেল করেজ হাসপাতালে তীব্র জনবল সংকট বিদ্যমান। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবলের পদ রয়েছে চার হাজার ৪১৫টি। এর মধ্যে বর্তমানে শূন্য রয়েছে ৯০৯টি। আর সাপোর্টিং স্টাফের পদ রয়েছে এক হাজার সাতটি। যার মধ্যে শূন্য রয়েছে ১৪৩টি পদ বা ২১ শতাংশ। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ বা মিটফোর্ড হাসপাতালে মোট পদ রয়েছে এক হাজার ৭৪৫টি। যার মধ্যে শূন্য রয়েছে ৫৭২টি বা ৩৩ শতাংশ পদ। আর সহযোগী জনবলের পদ রয়েছে ৫৪৫টি। এর মধ্যে শূন্য রয়েছে ২৫৩টি। আর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট এক হাজার ৫৬৫টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ৫২৩টি বা ৩৪ শতাংশ। আর সহযোগী জনবলের ৩১২টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ১৭৫টি।

শূন্যপদের বিষয়ে জানতে চাইলে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদ-উন-নবী বলেন, লোকবলের সংকটে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে চতুর্থ শ্রেণির যেসব পদ শূন্য হচ্ছে, সেখানে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। লোকবল সংকটের বিষয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক উত্তম বড়–য়া বলেন, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হকের আমলে সর্বশেষ কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর আইনগত জটিলতার কারণে ১৯৮৫ সালের নিয়োগবিধি বাতিল হওয়ায় নিয়োগ বন্ধ থাকে। বর্তমানে নতুন নিয়োগবিধি তৈরি হলেও লোকবল নেওয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। লোকবল সংকটে স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে না। এরপর তারা একজোট হয়ে নানা ধরনের আন্দোলন করে এবং হাসপাতালের পরিবেশ বিঘিœত করে। তাদের বিরুদ্ধে সামান্য ব্যবস্থা নেওয়া হলে নানা ধরনের আন্দোলন শুরু করে। মোট কথা, তারা হাসপাতালে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ফলে সরকার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রাজস্ব খাতের পরিবর্তে দৈনিকভিত্তিক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তৃতীয় শ্রেণির অসংখ্য পদ এখনও খালি রয়েছে। ফলে সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাউডলাইন মেনে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করার সামর্থ্য দেশের নেই। সীমিত সম্পদের মধ্যে সেবা কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। জনবল যাতে ঘাটতি না হয় সে জন্য আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে সমাধার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।শেয়ার বিজ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত