প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এমপি পরিচয়ে ব্রুনাইয়ে মানবপাচার: ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হিমু গ্রেপ্তার (ভিডিও)

সুজন কৈরী : ব্রুনাইয়ে মানবপাচারের মূলহোতা মেহেদী হাসান বিজনের অন্যতম সহযোগী শেখ আমিনুর রহমান হিমুসহ মানবপাচার চক্রের ৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৩। গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন- মো. নুর আলম (৩৬) ও বাবলুর রহমান (৩০)।

র‌্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার শেখ আমিনুর রহমান হিমু ব্রুনাইয়ে চাকরি দেয়ার নাম করে ৪০০ জন ব্যক্তির কাছ থেকে থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার নিজের কোনো রিক্রুটিং লাইসেন্স নাই। তিনি নজরুল ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস ও হাইওয়ে ইন্টারন্যাশনাল আরএল ব্যবহার করে ব্রুনাইয়ে মানব পাচার করেন।

বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাফরুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে হিমুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেহ তল্লাশী করে একটি লাইসেন্সকৃত বিদেশি পিস্তল এবং ২টি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়েছে। হিমর সহযোগী নুর আলমকে বনশ্রী ও বাবলুরকে মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকায় তার অফিস থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৩।

বিকেলে রাজধানীর টিকাটুলীতে র‌্যাব-৩ এর কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান এসব তথ্য জানান। এ সময় র‌্যাব-৩ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু উপস্থিত ছিলেন।

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, ব্রুনাইয়ে মানবপাচারের ঘটনায় অসংখ্য ভুক্তভোগী ব্যাটালিয়নের কার্যালয়ে অভিযোগ করেছেন। এরই প্রেক্ষিতে হিমু ও তার দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্রুনাইয়ে মানবপাচারের মূলহোতা মেহেদী হাসান বিজন ও আব্দুল্লাহ আল মামুন অপুর অন্যতম সহযোগী হচ্ছেন শেখ আমিনুর রহমান হিমু। তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন এবং মেহেদী হাসান বিজনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীক সম্পর্ক রয়েছে। মেহেদী হাসানের চাহিদা অনুযায়ী হিমু বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ব্রুনাইয়ে মানবপাচার করতেন। তার কথায় বিশ^াস করে ঋণ ও জমিজমা বিক্রি করে ভাগ্য ফেরানোর আশায় কব্রুনাইয়ে যাওয়ার টাকা দিয়েছিলেন ৬০ জন। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো কাজ না পেয়ে উল্টো মানবেতর জীবন-যাপন শুরু হয়। বাধ্য হয়ে নিজ খরচে দেশে ফিরতে হয় তাদের। জানা যায় গত বছর ব্রুনাইয়ে মানবপাচারের মূলহোতা মেহেদী হাসান বিজনের কোম্পানির নামে ভুয়া ডিমান্ড লেটার সংগ্রহ করে ৬০ জনকে ব্রুনাইয়ে পাঠান হিমু।

লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান বলেন, হিমু নিজেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য পরিচয় দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেকার যুবকদের টার্গেট করে ব্রুনাইয়ে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখাতেন। সেখানে চাকরির কথা বলে প্রতিজনের কাছ থেকে তিন থেকে চার লাখ টাকা করে নিতেন। কিন্তু ব্রুনাইয়ে কোনো চাকরি না পেয়ে উল্টো জেল খেটে দেশে ফিরতেন প্রবাসীরা।

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশি দালাল হিমু ব্রুনাইয়ে ভালো ভালো কোম্পানির কথা বলে মানবপাচার করতেন। কিন্তু ব্রুনাইতে সেসব কোম্পানির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। ব্রুনাইতে প্রায় ২৫ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক অবস্থান করছেন। তাদের একটি বড় অংশ মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ব্রুনাই গিয়ে বর্তমানে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। সেখানে বাংলাদেশি মালিকানায় প্রায় তিন হাজার কোম্পানি নিবন্ধিত আছে। যার অধিকাংশই নামসর্বস্ব। এসব কোম্পানি ভুয়া ও বানোয়াট প্রকল্প দেখিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে ব্রুনাই থেকে কর্মসংস্থান ভিসা লাভ করে তা দালালদের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিক্রি করে। ব্রুনাইয়ে যেতে এক লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও প্রায় ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ করে একজন কর্মীকে ওই দেশটিতে যেতে হয়।

লে. কর্নেল রাকিবুল হাসান বলেন, আইন অনুযায়ী ব্রুনাইতে একজন কর্মী সর্বোচ্চ দুই বছর অবস্থান করতে পারেন। এই সময়ে অভিবাসন ব্যয়ের টাকা তুলতে না পেরে ভিসার মেয়াদ অতিক্রান্ত করে বাংলাদেশে ফিরে না গিয়ে মানবপাচার চক্রের মাধ্যমে দুই হাজার দিয়ে পাশের সারওয়াক প্রদেশ হয়ে মালেশিয়ায় পাচার হয়ে যাচ্ছে। মালেশিয়য় বাংলাদেশী শ্রমিকদের নামে বর্তমানে কোনো ভিসা দেয়া হয় না। মূলত ব্রুনাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানবপাচার কার্যক্রমের রুট এবং গন্তব্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। রিক্রুটিং এজেন্ট ও বাংলাদেশী দালাল মিলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হয়ে কাজ করছে। এদের উদ্দেশ্য হলো শ্রমিকদের কাছ থেকে মাসিক সুবিধা আদায় করা, শারীরিক নির্যাতন করা এবং তাদের বেকার রেখে দেশে ফেরত যেতে বাধ্য করা। যাতে তাদের ওয়ার্ক ভিসার বিপরীতে এভাবে আরও কর্মী আনতে পারে।

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা ও নির্যাতনসহ বহুমুখী অপরাধ প্রবণতার কারণে ব্রুনাইয়ে সক্রিয় ভিসা দালাল চক্রের মূলহোতা মেহেদী হাসান বিজনসহ সাতজনের পাসপোর্ট বাতিলের বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে পাসপোর্ট অধিদপ্তর মেহেদী হাসান বিজনসহ সাতজনের পাসপোর্ট বাতিল করে।

তিনি বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর ব্রুনাইয়ে মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ব্রুনাইয়ে অবস্থানকারী বাংলাদেশি দালাল মেহেদী হাসান বিজনকে গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেহেদী হাসান বিজনের নামে দেশে ২০টি মামলা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে আত্মগোপনে আছেন।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত