প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংশোধিত ড্যাপ চূড়ান্ত হবে ডিসেম্বরে

ডেস্ক রিপোর্ট : ঢাকা বদলে দেয়ার নতুন চমক থাকছে সংশোধিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ)। তবে এর বাস্তবায়ন নিয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। এখন সংশোধিত ড্যাপ চূড়ান্তকরণের গণশুনানি চলছে। ঢাকাবাসী এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মহলের আপত্তি শুনানির পর চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার কথা রয়েছে।

অবশিষ্ট কাজ চলছে সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে। তবে প্রথম গেজেটভুক্ত ড্যাপ নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সংশোধিত নতুন ড্যাপ নিয়ে জনমনে আগ্রহ ও প্রত্যাশা দুটোই বেশি। বিশেষ করে ড্যাপ সংশ্লিষ্ট নাগরিকরা মনে করেন, কোনো কল্পনার ফানুস না উড়িয়ে নতুন ড্যাপ যেন বাস্তবসম্মত ও হয়রানিমুক্ত হয়।

প্রসঙ্গত, ড্যাপ প্রণয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সম্প্রতি সংশোধিত ড্যাপের খসড়া প্রকাশ করেছে। ২ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় নতুন ড্যাপ প্রণয়নের লক্ষ্যে ৬০ দিনের গণশুনানির সময় বেঁধে দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে। ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই গণশুনানি চলবে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত। ৬০ দিনের মধ্যে গণশুনানি শেষ করতে পারলে চলতি বছরের মধ্যে ড্যাপের মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত অনুমোদন বা গেজেট আকারে প্রকাশ করতে পারবে সরকার।

সূত্র জানায়, সংশোধিত ড্যাপে বিদ্যামান প্রশ্নবিদ্ধ ড্যাপের ত্রুটিগুলো সংশোধন করে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান ড্যাপে অনেক জায়গায় বিভিন্ন উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছিল; কিন্তু বাস্তবায়নের কৌশল বলা ছিল না। সংশোধিত ড্যাপে বাস্তবায়নের কৌশল দেয়া হয়েছে। এছাড়া এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যার ঘনত্ব বের করে এর আলোকে এলাকাভিত্তিক সমস্যা সমাধানের সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্যাপের পরিকল্পনা যাতে মানুষ সহজে বুঝতে পারে, সেজন্য জিআইএস ইনস্ট্রাকটিভ ম্যাপ সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ম্যাপ অনুসরণ করে যে কোনো নগরবাসী নিজ জায়গা বা প্লটের অবস্থান, আশপাশের ভূমি উন্নয়ন দিকনির্দেশনা সহজেই বুঝতে পারবে।

বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) সভাপতি স্থপতি জালাল আহমেদ বলেন, ‘সংশোধিত ড্যাপের সুপারিশগুলো জনবান্ধব করা হয়েছে। বিদ্যমান ড্যাপে সমাজের একশ্রেণির মানুষের জন্য সুযোগ-সুবিধা বেশি। তবে এবারের ড্যাপ সর্বজনীন। এর খসড়া পড়ে আমার কাছে মনে হয়েছে, বিদ্যমান ড্যাপের চেয়ে সংশোধিত ড্যাপ অনেক বেশি জনবান্ধব।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে সুন্দর মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। বিধিমালা করা হয়; কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন হয় না। এজন্যই আমাদের শহরের এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা। এখান থেকে উত্তোরণ ঘটাতে হলে মাস্টারপ্ল্যান, পরিকল্পনা বা বিধিমালার সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে।’

ড্যাপ প্রণয়ন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রস্তাবিত সংশোধিত ড্যাপে ঢাকাসহ আশপাশের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার ২ হাজার ১৯৮ কিলোমিটার জলাধার সিএস রেকর্ড অনুযায়ী উদ্ধার করে সচল করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব এলাকাকে বিনোদন স্পটে পরিণত করারও সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, এটি করা গেলে একদিকে জলাধারগুলো যেমন রক্ষা পাবে, তেমনি ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকার মানুষের বিনোদনেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এছাড়া গণমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ঢাকার চারপাশের ৫৬৬ কিলোমিটার নদীপথ সচল করা এবং ১ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার সড়ককে হাঁটার উপযোগী করার কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া শহরের বিদ্যমান কাঠামো ভেঙে স্কুলভিত্তিক উন্নয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠসহ বিদ্যালয় এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটা করা হলে হাঁটার দূরত্বে স্কুল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান মিলবে। এতে শহরে যানজট ও জনদুর্ভোগ কমবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২৭ হাজার কোটি টাকায় ৬২৭টি প্রস্তাবিত বিদ্যালয় এবং ১১২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে।

এদিকে আইএবি সভাপতি স্থপতি জালাল আহমেদ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘সংশোধিত ড্যাপে সিএস রেকর্ড ধরে জলাধার চিহ্নিত করে ব্যবহার উপযোগী করা হবে। এক্ষেত্রে যেসব জলাধার বেদখল হয়েছে, সেগুলোও উদ্ধারের সুপারিশ করা হয়েছে। এটা ড্যাপের ইতিবাচক দিক এবং রাজউক বা সরকার চাইলে সব দখলদার হটিয়ে জলাধারগুলো ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হবে।’

তবে বেসরকারি আবাসন প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কয়েকজন বলেন, যত সমালোচনা করা হোক না কেন, আজকের ঢাকা যতটুকু দৃষ্টিনন্দন হয়েছে এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব প্রকৃত আবাসন ব্যবসায়ীদের। তারা মনে করেন, ড্যাপে যততত্র জলাধার রেখে বাহবা নেয়ার কিছু নেই। এক্ষেত্রে পৃথিবীর আধুনিক শহরগুলোর উদাহরণকে সামনে রেখে ড্যাপ প্রণয়ন করা দরকার।

দেখা যাবে, উন্নত দেশগুলো যততত্র জমি জলাধার হিসেবে ফেলে রাখেনি। শহর-নগরের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ওপর তারা বেশি জোর দিয়েছে। এজন্য শহরের পাশে বিস্তীর্ণ কোনো জলাধার না রেখে গভীর খাল খননের মাধ্যমে পানিকে নদীতে নেয়ার জন্য পানির প্রবাহ সৃষ্টি করেছে। ফলে জমির উত্তম ব্যবহার তারা করতে পেরেছে। আমাদের এখানেও সেটি করতে না পারলে সংশোধিত ড্যাপ ওই অর্থে কাজে আসবে না।

কমপক্ষে আগামী ৫০ বছর পর রাজধানী ঢাকার সার্বিক চাহিদা কী হবে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে ড্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ড্যাপের সংশোধন চলমান প্রক্রিয়া। নির্দিষ্ট সময় পর পর এ মাস্টারপ্ল্যান হালনাগাদ করা হবে, এ কার্যক্রম চলছে। এ শহরের বিশৃঙ্খল উন্নয়ন ড্যাপ না মেনেই করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ড্যাপ এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়নের সুপারিশ করছে। কিন্তু সেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কোথায় হবে, সেটা সুনির্দিষ্ট করছে না। অবশ্য এক্ষেত্রে রাজউকের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে শুনেছি। তবে রাজউকের ড্যাপের মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ করে সিটি কর্পোরেশন যদি ওয়ার্ডভিত্তিক মাস্টারপ্ল্যান করে তাহলে সত্যিকারের সুফল মিলবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সংশোধিত ড্যাপে রি-ডেভেলপমেন্টসহ বেশকিছু কৌশল বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, ইউরোপ এবং আমেরিকার কোনো বাস্তবায়ন কৌশল ঢাকায় প্রয়োগের চেষ্টা করলে সেটা ঠিক হবে না। ঢাকায় কোনো কৌশল প্রয়োগ করতে হলে, সেটিকে ঢাকার আদলে করতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘সংশোধিত ড্যাপ সরকারি অন্যান্য সংস্থার পরিকল্পনা এবং মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এটির সঙ্গে সরকারি কোনো সংস্থার মাস্টারপ্ল্যান বা উন্নয়ন পরিকল্পনা সাংঘর্ষিক হবে না।’ তিনি বলেন, ‘সংশোধিত ড্যাপে বিদ্যমান ড্যাপের ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো সংশোধন করে জনবান্ধব করা হয়েছে। এলাকাভিত্তিক জনঘনত্ব, স্কুলভিত্তিক উন্নয়ন ও জিআইএস ইনস্ট্রাকটিভ ম্যাপ সংযুক্ত করা হয়েছে। এ উদ্যোগগুলো বিদ্যমান ড্যাপের বড় ইতিবাচক দিক। এসবের বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।’

সংশোধিত ড্যাপের খসড়ায় বলা হয়েছে, ঢাকার সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ লাইনগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলোকে ভূগর্ভস্থে নিয়ে যেতে সমন্বিত ভূগর্ভস্থ ইউটিলিটি ডাক্ট তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। ফুটপাত বা সড়কের একাংশ দিয়ে এই ডাক্ট নির্মাণ করে বৈদ্যুতিক লাইন, পানি সরবরাহ লাইন, গ্যাস সরবরাহ লাইন, বৃষ্টির পানি ও পয়ঃবর্জ্য সরবরাহ লাইন নিয়ে যেতে হবে।

সেটা করা গেলে শহরের খোঁড়াখুঁড়ি যেমন কমবে, তেমনি এর ফলে শহরের যানজট ও জনদুর্ভোগ অনেকটা কমে আসবে। এছাড়া ঢাকায় সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সড়ক, জল ও রেলপথকে গুরুত্ব দিয়ে একটি সমন্বিত যোগাযোগ মাধ্যমে হিসেবে গড়ে তুলতে সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকার জলধারগুলো দখলমুক্ত করে সড়কপথের নতুন ধারার আওতায় যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটানোর পাশাপাশি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে শহরের একঘেয়েমি জীবনকে প্রাণবন্ত করতে সহায়তা করবে।

খসড়া ড্যাপের মাস্টারপ্ল্যানে আরও বলা হয়েছে, নগরায়ণ ও নগর সম্প্রসারণ, আবাসন, পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো, পরিবেশ সংক্রান্ত নির্দেশনা, বর্জ্যব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশনা, এলাকাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা, জলপথ উন্নয়ন পরিকল্পনাসহ বাসযোগ্য ঢাকা উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট ১৯৫৩ এর ৭৩ এর ২ উপধারায় শর্তপূরণ করে রাজউক থেকে ড্যাপের খসড়া মাস্টারপ্ল্যান ১৫ জুলাই ২০২০ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়। এরপর গণশুনানির গেজেট প্রকাশ করে মন্ত্রণালয়। ঢাকা এবং আশপাশের এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে ১৯৯৫-২০১৫ সালের জন্য স্ট্রাকচার প্ল্যান প্রণয়ন করে রাজউক।

এরপর ১৯৯৫-২০০৯ সালের জন্য আরবান এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন করে। এ দুই পলিসির আলোকে ২০০৪ সালে ড্যাপ প্রণয়ন কাজ শুরু করে রাজউক। এটা ২০০৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয় ২০০৭ সালে। গেজেট হওয়ার আগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় এ মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা করা হয়। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১০ সালের ২২ জুন ড্যাপের চূড়ান্ত গেজেট অনুমোদন পায়। ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার জন্য প্রণীত এ মাস্টারপ্ল্যানের সময়কাল ছিল ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এছাড়া বিদ্যমান ড্যাপের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার আগে রাজউক ২০১৬-২০৩৫ সাল পর্যন্ত বা ২০ বছরের জন্য নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়নের আগে নতুন করে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ২০১৬-২০৩৫ প্রণয়ন করা হয়। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া সংশোধিত ড্যাপ প্রণয়নের কাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে এটা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত