প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিল্ডিং দেখতে বিদেশ যাবেন ৩০ কর্মকর্তা, খরচ ২ কোটি টাকা!

ডেস্ক রিপোট:  এবার বিল্ডিং দেখতে বিদেশ যাবেন ৩০ কর্মকর্তা। এজন্য প্রত্যেক কর্মকর্তার পেছনে ব্যয় হবে ৬ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। বিল্ডিং নির্মাণ প্রকল্পে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ কোটি টাকা। যদিও প্রস্তাব ছিল আরও বেশি। পরিকল্পনা কমিশনের সম্মতিতেই এই বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেইসঙ্গে পরামর্শক খাতে বড় অংকের বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ৯৭৩ জন পরামর্শকের জন্য ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। ‘গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে এসব ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। সারা বাংলা

যদিও প্রকল্পটির মূল্যায়নে কোভিড-১৯-এর প্রভাব বিবেচিত হয়নি। কারণ, গত বছরের ২৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভায় দেওয়া সুপারিশগুলো প্রতিপালন করায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। যেকোনো বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য তোলা হবে বলে জানা গেছে। একনেকের জন্য তৈরি করা প্রকল্পের সার-সংক্ষেপ সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) আবুল কালাম আজাদ সারাাংলাকে বলেন, ‘বিদেশ ভ্রমণ অনেক সময় প্রয়োজন হয়। তবে কেন এত মানুষের বিদেশ যেতে হবে?- সে বিষয়টি আমরা দেখছি। তছাড়া পরামর্শক প্রয়োজন হলেও এতজন কেন? এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এজন্য আজ (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ডেকেছি। একটু পর তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসব।’

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, ‘গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের বহুতল ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় বহুবিধ সুবিধা সম্বলিত আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে অবকাঠামোগতভাবে গণগ্রস্থাগার অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে। এছাড়া অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সুবিধাদি বাড়ানোর মাধ্যমে পাঠক, গবেষক, তথ্য সংগ্রহকারী ব্যক্তিসহ সর্বসাধারণের কাছে গণগ্রন্থাগারের ভূমিকাকে আরও আকর্ষণীয় ও কার্যোপযোগী করে তোলা হবে। সেইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মতে জাতীয় গণগ্রন্থকেন্দ্রের সব জনবল ও কার্যক্রমকে এক ভবনে সংস্থাপনসহ দেশের সব সরকারি গণগ্রন্থাগারের যাবতীয় কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রক্রিয়াকরণ শেষে অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে গণগ্রন্থাগার অধিদফতর ও গণপূর্ত অধিদফতর।

বিদেশ ভ্রমণ
প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৩০ জন কর্মকর্তার বিদেশ ভ্রমণের জন্য ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে পিইসি সভায় পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বৈদেশিক ভ্রমণ ব্যয় ২ কোটি টাকার মধ্যে সংস্থান রাখতে হবে।

পরামর্শক ব্যয়
৯৭৩ জন পরামর্শকের জন্য চাওয়া হয়েছে ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ প্রসঙ্গে পিইসি সভায় পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, পরামর্শক খাতে ব্যয় যৌক্তিকভাবে হ্রাস করতে হবে। একান্ত প্রয়োজনে প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি পরামর্শক প্রয়োজন হলে তার জন্য জনমাস কমানোসহ ব্যয় হ্রাস করতে হবে। এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, পরামর্শক খাতে প্রাথমিকভাবে বিদেশি পরামর্শকের সম্মানী বাদ দিয়ে ব্যয় কমানো হয়েছে। তবে নির্মাণ কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনের জন্য স্থাপত্য ডিজাইন ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া নির্মাণ কাজ চলাকালে তা নিয়মিত পরিদর্শন, মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্লাম্বিং ও ল্যান্ড স্কেপিং ডিজাইনসহ পরামর্শকের কাজের পরিধি এবং গুরুত্ব বেশি থাকবে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে পিইসি সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এ খাতে ব্যয় যৌক্তিভাবে হ্রাস করা হয়েছে। অর্থাৎ ২৮ কোটি ২২ লাখ ২৪ হাজার টাকা স্থলে ১৯ কোটি ৮২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কমেছে অস্থায়ী স্টিল ভবন নির্মাণ ব্যয়
প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্পটির আওতায় প্রস্তাবিত বিভিন্ন ব্যয় বাতিল করে পরিকল্পনা কমিশন। পিইসি সভায় পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, গণগ্রন্থাগারের অস্থায়ী অফিস নির্মাণ কাজের প্রাক্কলনের ভিত্তি স্পষ্ট নয়। নির্মাণ কাজের স্টিল স্থাপনার ২২ কোটি টাকা ব্যয় যৌক্তিকভাবে হ্রাস করে ব্যয় বিভাজন পুনর্গঠিত ডিপিপিতে (সংশোাধিত প্রকল্প প্রস্তাব) উল্লেখ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রকল্প চলাকালীন পাঠকদের গ্রন্থাগার সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখার স্বার্থে গণপূর্ত অধিদফতরের সঙ্গে আলোচনা করে ৫৪ হাজার ৭০০ বর্গফুটের ৬ তলা স্টিল স্ট্রাকচারের ভবন নির্মাণে ব্যয় হ্রাস করে ২ কোটি টাকার স্থলে থোক হিসেবে ৫ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।

বই ক্রয়ে ৮০ কোটি টাকার প্রস্তাব থেকে সরেছে মন্ত্রণালয়
পিইসি সভায় বলা হয়েছিল, প্রকল্পের আওতায় বই ক্রয় বাবদ ৮০ কোটি টাকার প্রস্তাব বাদ দিতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, গ্রন্থাগারের প্রাণ কিংবা রক্তপ্রবাহ হচ্ছে বই। বর্তমান বিদ্যমান লাইব্রেরির আয়তন হচ্ছে ৬৪ হাজার বর্গফুট। বইয়ের সংখ্যা হচ্ছে দুইলাখ। আর নবনির্মিত অত্যাধুনিক নতুন ভবনের মোট আয়তন হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৫০ বর্গফুট। সুতরাং প্রায় ১০ গুণের বেশি আয়তনের লাইব্রেরির জন্য নতুন বই সংযোজন আবশ্যক। অন্যথায় এ বিষয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকবে। এক্ষেত্রে পিইসি সভার অন্যান্য সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রকল্পের আওতায় কেবলমাত্র প্রিন্ট ও ই-বই ক্রয় খাতে ৮০ কোটি টাকার স্থলে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

যেসব প্রস্তাব বাতিল করা হয়
পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তির মুখে প্রকল্পের আওতায় হায়ারিং চার্জ বাবদ ৬০ লাখ টাকা বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অপ্রত্যাশিত ব্যয় বাবদ ১১ কোটি ২ লাখ টাকা এবং এসটিপি বাবদ ৫ লাখ টাকার সংস্থান বাদ দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় প্রধান কার্যক্রম
প্রকল্পটির আওতায় রাজধানীতে ১০তলাবিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া দুটি বেজমেন্ট ও ৯তলা বিশিষ্ট অনাবাসিক ভবন নির্মাণ, দুটি জিপ, একটি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং একটি মিনিবাস কেনা করা হবে। পরামর্শক, বই ও সাময়িকী ক্রয়, অফিস ভাড়া, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং অফিস সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্টারা যা বলেন
প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, পাবলিক লইব্রেরি ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এই ভবন ভেঙে দৃষ্টিন্দন আধুনিক লাইব্রেরি ও অডিটোরিয়াম ভবন নির্মাণ করা জরুরি। তাই প্রকল্পটি অনুমোদনযোগ্য। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণগ্রন্থাগার অধিদফতর ও গণপূর্ত অধিদফতরের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটি সম্পূর্ন সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদের মন্তব্য
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এর আগে সারাবাংলাকে বলেছিলেন, ‘উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিদেশ সফর যেন একটি প্রথা হয়ে গেছে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা জরুরি। কেননা করোনার আগের পরিস্থিতি এবং এখনকার পরিস্থিতি এক নয়। পরিকল্পনা কমিশনের উচিত ছিল একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করার আগে আরেকবার ব্যয় প্রস্তাবগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা। সেটি না করে বিদেশ সফর এবং এত পরামর্শক ব্যয়ের প্রস্তাব প্রশ্নের সৃষ্টি করতে পারে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত