প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

স্বপ্না রেজা: সেবার আড়ালে ব্যবসার ছোবল

স্বপ্না রেজা: সুখকর নয় এমন কিছু নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করে না। আর কত লেখা যায়। অপ্রিয় সত্য লেখার আবার বিড়ম্বনা আছে। হয়তো কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির এমন সব কার্যকলাপ নিয়ে লেখা হয়েছে যা সমাজের জন্য কাংখিত বা কল্যাণকর নয় মোটেও, দেখা গেলো সেই ধরনের প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি যে শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিত্ব করছে তারা মোটেও খুশি হন না এসব লেখায়। উপরন্তু মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখান সোশ্যাল মিডিয়ায়। কখনোবা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। কারোর অন্যায় ধরিয়ে দিলে তারা সেটা নিজেদের গায়ে মেখে বসেন। তারা মোটেও নিজেদের পেশাগত ভুল স্বীকার করেন না। বরং ভাব এমন দেখান যে, জীবনেও এমন পেশার মানুষ দুর্নীতি বা অপরাধ করতে পারেন না।নেহায়েত অপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন। অবস্থাদৃষ্টে এমন কথা বললে অযৌক্তিক হবে কিনা যে, পেশাগত সাম্প্রদায়িকতা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার চাইতে কোন অংশেই কম নয় এদেশে। বরং পেশাগত সাম্প্রদায়িকতা ধমীয় সাম্প্রদায়িকতার চাইতে কোন কোন ক্ষেত্রে ধাড়ালো এবং সীমা ছাড়ায়। সাধারণ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একটা বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেরিতে বুঝলেও সাধারন মানুষ, যারা ভুক্তভোগী তারা কিন্তু প্রতি পদে পদে টের পেয়েছেন, পাচ্ছেন যে, এদেশে ব্যবসায়ী চিকিৎসকের প্রার্দুভাব ও আবাদ বেশি মানবিক চিকিৎসকের চাইতে। আর ভারসাম্যহীন সমাজ ব্যবস্থায় একশ্রেণির চিকিৎসকের ভেতর প্রচন্ড অর্থলিপ্সা জাগাটাই এর মূল কারণ। সহায়, সম্বল সবকিছু বিক্রি করে, বন্ধক রেখে উন্নত চিকিৎসার জন্য যারা শহরে ছুটে এসেছেন তারাই জানেন এর ভয়াবহতা এবং তাদেরই রয়েছে সেই করুণ অভিজ্ঞতা। এও সত্য ব্যবসায়ী চিকিৎসকের বিপরীতে ভালো ও মানবিক চিকিৎসক আছেন বাংলাদেশে। দুর্নীতি বা অর্থ লিপ্সায় তাদেঁর সম্পৃক্ত হবার কোন প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, তাঁরা মানবসেবার ব্রত নিয়ে চিকিৎসক হয়েছেন এবং চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

নিজের জীবন থেকে নেয়া একটা ঘটনা আজ উল্লেখ করছি। চলতি বছরের জানুয়ারী মাসের ঘটনা। কিডনী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তিনি। একটি সরকারী হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত এবং চেম্বারে নিয়মিত রোগী দেখেন। একটা নয়, তিনটে হাসপাতালে তিনি রুগী দেখেন। অর্থাৎ তিন জায়গায় চিকিৎসক রোগী দেখেন বিকাল, সন্ধ্যা ও রাত করে। দেখতেই পারেন। কারণ বাংলাদেশে কিডনী রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কম নন। তীব্র ব্যাকপেইন, বমি ও  জ্বর উপসর্গ নিয়ে ছেলের বাবাকে নিয়ে তাঁর দ্বারস্থ হলাম। কিডনী সংক্রান্ত তার পূর্ব অসুস্থতার ধারাবাহিকতায় বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া।

টেবিলে বিছিয়ে দেয়া হলো সাম্প্রতিক সময়ের শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসাপত্র, মেডিক্যাল রিপোর্ট ও কিছুদিন আগে করা কার্ডিয়াক এনজিওগ্রাম রিপোর্ট। সমস্যা কী এবং কেনো তাঁর কাছে আসা জানতে চাইলে গড়গড় করে বলা হলো ইতিহাস। বলতে হলো দশ বছর আগের ইতিহাস। একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ তখন দেখা দেয়ায় রোগ শনাক্ত হয়েছিল কিডনীতে স্টোন এবং তার কারণে অবসটেকশন দেখা দিয়েছিল। বিশেষজ্ঞ জানতে চাইলেন, তখন কে চিকিৎসা করেছে ? উত্তরে বলতে হলে, কোলকাতার সিএমআরআই ও ওখার্ডে। পাল্টা প্রশ্ন, কে তাহলে বলেছেন অবসটাকশন ? উত্তর, ওখানকার চিকিৎসক। উত্তর পছন্দ হলোনা। গালমন্দের ভাষায় বললেন, বাংলাদেশের মানুষদের ইন্ডিয়ার চিকিৎসকরা সম্মাহন করেন। আদতে তাঁরা চিকিৎসার কিছুই জানেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। বাধ্য হলাম বলতে কেনো ইন্ডিয়ায় যেতে হলো। পাল্টা প্রশ্ন, এদেশে চিকিৎসক পাননি ? উত্তরে বলতে হলো পেয়েছি। তবে তারা কতটাকা লাগবে সার্জারী করতে সেটা বলেছিলেন। কিন্তু আমাদেরকে সঠিকভাবে বলতে পারেননি যে, রোগীর আদতে কী হয়েছে। অতপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মনোযোগ সহকারে সব কাগজপত্রে চোখ বুলিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার একটা তালিকা ধরিয়ে দিলেন। তখনই কিছু পরীক্ষা করতে পরামর্শ দিলেন। বাকীগুলো কাল। কোথায় পরীক্ষা করাতে হবে সেটাও বেশ স্পষ্ট করে বলে দিলেন, লিখে দিলেন। তিনি যুক্তি দেখালেন যে, এসব পরীক্ষার জন্য দক্ষ টেকনিশায়ন ও যন্ত্রপাতি সেখানেই রয়েছে। রোগী ও তাঁর লোকজন অসহায় প্রজাতির প্রাণী হয়ে বাঁচেন যতক্ষণ রোগ তাদের মাঝে বসত করে।

ব্লাড, ইউরিন পরীক্ষার জন্য লম্বা সিরিয়ালে দাঁড়াতে হলো। খরচ কম নয়। অপেক্ষার সাথে ঘেমে উঠছে উপস্থিত সবাই। গরম লাগার কারণ আবিস্কৃত হলো সেন্ট্রাল এসি বন্ধ। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সন্ধ্যা সাতটার পর বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ তখনও রুগী গিজগিজ করছে। সাতটার পর কেনো তাহলে টেস্টেও জন্য রোগীকে রাখায় হয় এমন তীব্র প্রশ্নের মুখে এসি চালু করা হয়। পরের দিন আইভিইউ টেস্ট। প্রিপারেশন লাগবে কিনা জানতে চাওয়া হলে একজন স্টাফ একটা নিদের্শনা স্লিপ হাতে ধরিয়ে দিলেন। ওতে যা লেখা তোতা পাখীর মতো সেসব পাঠ করলেন। স্লিপের কোথাও অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের জন্য বিশেষ কোন নিদের্শনা লেখা নেই। উপযাজক হয়ে জানতে চাইলাম ডায়াবেটিক রুগীর জন্য বিশেষ কোন নিদের্শনা আছে কিনা। ‘ না না, কিছু নেই। খালি পেটে চলে আসতে হবে পানিও খাওয়া যাবে না’ দ্রুত বললেন । সকালে কতক্ষণ লাগতে পারে সেই সম্পর্কেও সঠিক কোন তথ্য নেই। সময় সম্পর্কিত এমন অনির্ধারিত আভাস পেয়ে জানতে হলো, ‘তাহলে কী রাতে ইনসুলিন নিতে হবে না; ? মনে হলো স্টাফ ভরকে গেলেন। নিজেকে সামলে বললেন, ‘ইনসুলিন নেবেন’। তাকে আশংকার কথা শোনাতে হলো, ‘তাহলে সকালে যদি দেরি হয় টেস্ট করাতে, তাহলে তো সুগার ফল্ করতে পারে’। ‘তাহলে রাতে ইনসুলিন নেবেন না’ দায়সারা জবাব।

যথারীতি খালি পেটে রুগী উপস্থিত। নির্ধারিত সময়ের আড়াই ঘন্টা পর আইভিইউ টেস্ট শুরু। টেকনিশয়ান রুম থেকে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করলেন, আলট্রসনোগ্রাম রিপোর্টের ফটোকপি এনেছেন ?’ বিস্ময় প্রকাশ করলাম,‘গতকাল তো এমন কিছু বলা হয়নি !’ পুলিশী টোন, ‘যান ফটোকপি করে নিয়ে আসুন !’ বিরক্ত হলাম। কোথায় ফটোকপি করা যায় জানা নেই। টাকা দিয়ে বললাম, ‘কাউকে দিয়ে ফটোকপি করিয়ে নিন’। উপযুক্ত নির্দেশনা ছাড়া এভাবে টেস্ট করবার ভেতর অর্থ ব্যয় আছে কেবল। বিস্ময়ের লাগাম ছিড়ে গেলো যখন রুগীকে রুম থেকে বের করে বলা হলো, ইনসুলিন নিয়ে খেয়ে এবং ইউরিন পাস করে আবার টেস্টের রুমে ঢুকতে। ইনসুলিন তো সাথে নিয়ে আসা হয়নি, এমন কী খাবারও ! এমন কোন নির্দেশনা ছিলো না লিখিত কিংবা মৌখিকভাবে। মেজাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছালে ভুল স্বীকার করে বললেন, নাস্তা খেয়েই আসুন তবে।
পরের দিন সব রিপোর্ট নিয়ে বিশেষজ্ঞের নিকট যাওয়া হলো। রিপোর্ট দেখেই বললেন, সার্জারী লাগবে। তিনি যেই হাসপাতালে রুগী দেখছেন সেখানে করা যাবে। কত টাকা লাগবে তাও মুখস্ত বলে দিলেন। জানতে চাওয়া হলো, এখানে কার্ডিয়াক সাপোর্ট পাওয়া যাবে কিনা যদি প্রয়োজন পড়ে। কেনো কার্ডিয়াক সাপোর্টের কথা ভাবা হচ্ছে ভাব নিয়ে জানতে চাইলেন। আগের দিনের কথা রিপিট করতে হলো, রুগীর এনজিও গ্রামে ভেসেলে সমস্যা আছে ধরা পড়েছে। মেডিক্যাল ম্যানেজমেন্টে তাকে থাকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। মেডিসিন চলছে। ‘ওও তাই নাকি ! তার এনজিও গ্রাম করা হয়েছে ! কটা রিং পরানো হয়েছে ? কই দেখি তার রিপোর্ট। এনজিওগ্রাম করা মানেই রিং পরানো ভাবটা এমন। রিপোর্ট দেখলেন। বললাম, রিং পরানো হয়নি। হার্টে সমস্যা আছে। বেচারা বিশেষজ্ঞ অপ্রস্তুত হলেন। প্রথম দিন রোগী দেখে তিনি প্রেসক্রিপশনের কোথাও রোগীর শারীরিক সমস্যা ও ইতিহাস লিখে রাখেননি। আরো বলতে হলো রোগীর ডায়াবেটিক, ব্লাডপ্রেসারের কথা। ‘উনার ব্লাড প্রেসারও আছে নাকি ? বিশেষজ্ঞের বিস্ময় প্রকাশ। বুঝুন পাঠক চিকিৎসক রোগীর ব্লাডপ্রেসার, পালসও মেপে দেখেন না। যাইহোক অতপর তিনি কার্ডিয়াক সাপোর্ট আছে এমন এক হাসপাতালের কথা বললেন যেখানে তিনি সার্জারী করাতে পারবেন। তবে তিনি যেই হাসপাতালে রোগী দেখছেন সেখানে কার্ডিয়াক সাপোর্ট না থাকলেও কিছু কম টাকায় সার্জারী করিয়ে দিতে পারবেন। আমি বিশেষজ্ঞ এর চেহারায় টাকা খুঁজে পেলাম, আস্থা নয়।

আরও একটা গল্প বলছি। অভিজাত এক হাসপাতালের ওটিতে একজন বয়স্ক রোগীকে নেয়া হয়েছে। বাইরে অপেক্ষা করছে তাঁর তরুণী কন্যা। কিছুক্ষণ পর ওটি থেকে একজন বেরিয়ে এসে বললেন, রোগীর টিউমার ধরা পড়েছে। কেটে ফেলতে একটা বড় অংকের টাকা লাগবে। কন্যার কাছে জানতে চাইলেন, টিউমার কেটে ফেলা হবে কিনা, কেটে ফেলা হলে বিলিং সেশনে একটা পরিমাণ টাকা জমা দিতে হবে। কন্যা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বাবাকে ওটিতে রেখে কী সিদ্ধান্ত সে দিতে পারে তাঃক্ষনিকভাবে। বড্ড অসহায় লাগলো। আমার এক আত্মীয়ও তখন ওটিতে। আমি উঠে গিয়ে বলতে বাধ্য হলাম, কী জবাব দেবে এই টুকুন একটা মেয়ে এখন! আপনারা টাকা ছাড়া অপারেশন করবেন না কিংবা করতে চাইছেন না ? কোথায় আপনাদের এমন নিয়মের কথা লেখা আছে ?’ মনে হলো না এমন প্রশ্নের সম্মুখীন তিনি এর পূর্বে হয়েছেন। আমার পাশে আরও দুজন এসে দাঁড়ালেন। প্রশ্ন তাদেরও। বিব্রত হয়ে লোকটি ওটিতে ঢুকে গেলেন।

এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। হাসপাতালগুলো কতটা মানবতার সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করছে তার দেখভাল করবার কেউ ছিলো না আদতে। ফলে অনেক হাসপাতাল এক একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। এই ভঙ্গিমা কিন্ত আপনাআপনি হয়নি, এর পেছনে আছে অর্থলোভের ক্ষমতাধর লম্বা লম্বা হাত। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির যে ভয়াবহ চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে তা অতীতে উপযুক্ত দেখভালের ব্যর্থতা ও ব্যক্তি-গোষ্ঠী স্বার্থলাভের কারণেই। হাসপাতালে যখন আইন শৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যরা দুর্নীতি, অনিয়ম খুঁজে বের করে তখন মনে হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে কী লাভ ছিল। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এরা বেতনভুক্ত হয়ে সেই জনগণকেই এরা অবলীলায় মৃত্যু আর অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেয়।

সেবামূলক পেশা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক মনেবৃত্তি এবং এই সংবেদনশীল সেক্টরকে অবহেলায় ফেলে রাখা, দায়িত্বশীলদের সঠিকভাবে পরিচালনা না করার বিষয় ইত্যাদি এক একটি মস্তবড় অপরাধ। রোগীর বেঁচে থাকবার আকুতি, ইচ্ছে নিয়ে ব্যবসা করবার কারোর কোন ধরনের ধৃষ্টতা প্রশ্রয় না দেয়া হবেই চিকিৎসা খাতকে উন্নত অবস্থায় নিয়ে যাবার উত্তম উপায়। যখন এই লেখা লিখছি ৭৭% শয্যা খালি হাসপাতালে। অথচ করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছে না। ঘরে আক্রান্তদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এটা কোন শুভ লক্ষণ নয়। নয় আশ^স্ত হবার বিষয় যে, দেশে করোনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।

লেখক পরিচিতি: স্বপ্না রেজা, কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক

 

 

সর্বাধিক পঠিত