প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে চাঁদাবাজি

ডেস্ক রিপোর্ট : টিকাটুলির রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে ফের দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। এ নিয়ে তিনটি গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। এসব গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আজমল হোসেন বাবুল ওরফে রাজাকার বাবুল, আবুল বাসার ও ময়নুল হক মনজু। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের পক্ষ থেকে যে কোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

মার্কেটে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগে গত বছরের অক্টোবরে স্থানীয় কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজু গ্রেফতার হন। তার গ্রেফতারের পরপরই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বাবুলের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের হাতে। বাবুলের পক্ষে মার্কেট নিয়ন্ত্রণ করছেন তার ছেলে ফজলুল হক বিপ্লব, ভাগ্নে আশ্রাফ উদ্দিন টিটু, ঘনিষ্ঠ সহযোগী কাজী রনি, রুহুল, শওকত দেলোয়ার, আবু নাসের সেন্টু (বাবুলের ছোটভাই), মো. সেন্টু চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম (বাবছি রফিক), সাখাওয়াত হোসেন (বাবুলের বেয়াই), সাইদ মোল্লা, আবদুল্লা আল মামুন ও ফারুক খান।

বাসার গ্রুপের অভিযোগ, বাবুলের লোকজন শুধু মার্কেটটি নিয়ন্ত্রণই করছেন না, নতুন কৌশলে চাঁদা আদায়ও করছেন। এদিকে জামিন পাওয়ার পর আবারও মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া মনজু। মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দিতে এরইমধ্যে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এবং ওয়ারী থানার ওসিকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে আবুল বাসারের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি সাধারণ দোকান মালিকদের প্রতিনিধি উল্লেখ করে মার্কেট পরিচালনার দায়িত্ব চাচ্ছেন। এ বিষয়ে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন, মনজু একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন মার্কেটটি নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ ছিল। একপর্যায়ে তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর সাধারণ দোকান মালিকরা মনে করেছিল মার্কেটের কর্তৃত্ব তাদের হাতে চলে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের হাতে না গিয়ে বাবুলের লোকদের হাতে গেছে। এদিকে এরই মধ্যে মনজু জামিন পেয়ে গেছেন। এ কারণে ত্রিমুখী উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। আমাদের কাছে সকালে এক গ্রুপ আসছে, বিকালে আরেক গ্রুপ, আবার সন্ধ্যায় আসছে অন্য গ্রুপ। এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই মার্কেটে পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সেখানে যেন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেজন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হবে।

বাসার ও মনজু গ্রুপের পৃথক অভিযোগ- রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে ১৭৮৮টি দোকানের মধ্যে মসজিদের নামে ৩৩টি এবং মন্দিরের নামে ৮টি দোকান আছে। এসব দোকান দখল করে নিয়েছে বাবুলের লোকজন। দোকানগুলো থেকে প্রতি মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে ভাড়া ওঠানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ বিল না বাড়লেও সাব-মিটার থেকে ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৯০ পয়সা হারে বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো হয়েছে। দোকান মালিকদের কাছ থেকে এ বাড়তি বিল আদায় করছে দখলদাররা। দখলদারদের আইনের আওতায় আনতে সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র‌্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সব ইউনিটেও অভিযোগ দেয়া হয়েছে।

মার্কেটে নতুন কৌশলে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে দোকান মালিক মো. আলম বলেন, করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে সাধারণ ছুটি ও লকডাউনের কারণে ২৬ মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ২ মাসের বেশি সময় ধরে মার্কেট বন্ধ ছিল। কিন্তু চাঁদাবাজ চক্র বন্ধ মাসগুলোতে জেনারেটর চার্জের আড়ালে চাঁদাবাজি শুরু করে। অথচ ওই দুই মাসে একদিনও জেনারেটর চলেনি। কিন্তু হোল্ডিংপ্রতি ১৫০ টাকা করে ১৭৮৮ হোল্ডিং থেকে ২ মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। মার্কেট বন্ধের মধ্যে বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে মিটার চার্জের নামে ১২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি মিটার থেকে ৪০৫ টাকা হারে নেয়া হয়। সার্ভিস চার্জ আগের চেয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। মনজু গ্রেফতারের পর বাবুল গায়ের জোরে তার ভাই আবু নাসের সেন্টুকে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি, ছেলে ফজলুল হক বিপ্লবকে সাধারণ সম্পাদক এবং ভাগ্নে আশরাফ উদ্দিন টিটুকে ক্যাশিয়ার ঘোষণা করে। এরপর থেকে তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে পুরো মার্কেট। তিনি বলেন, মার্কেটে আমার একটি খাবার দোকান আছে। সেটিকে কাপড়ের দোকানে রূপান্তর করতে চাইলে বাবুল সিন্ডিকেটের সদস্যরা আমার কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে।

শাড়ির দোকানের মালিক বকুল খান বলেন, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং স্থানীয় কতিপয় আওয়ামী লীগ নেতার প্রচ্ছন্ন সহায়তায় বাবুল ও তার বাহিনীর সদস্যরা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়। তিনি বলেন, মনজু গ্রেফতার হওয়ার পর আমরা সাধারণ দোকানদাররাই এর কর্তৃত্ব চেয়েছিলাম। একটি নির্বাচনের মাধ্যমে দোকান মালিক সমিতির কমিটি করতে চেয়েছিলাম। এজন্য একটি মহলের পক্ষ থেকে ৩০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। বাধ্য হয়ে আমরা সাধারণ দোকানদাররা চাঁদা তুলে ১০ লাখ টাকার বেশি ওই মহলকে দিই। কিন্তু ওই মহল বাবুল সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা পেয়ে তাদের হাতে মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়। কিন্তু আমাদের কাছ থেকে নেয়া টাকা ফেরত দেয়নি।

রাজধানী সুপার মার্কেট এবং নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটে ৭০টির বেশি দোকান আছে আবুল বাসারের। তিনি বলেন, এ মার্কেট দুটি চাঁদাবাজদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একসময় মনজু-বাবুল একসঙ্গেই চাঁদাবাজি করতেন। তিনি বলেন, বাবুল কমলাপুরে একটি বহুতল মার্কেট নির্মাণের জন্য রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেটের দোকান মালিকদের কাছ থেকে ২০০৮ সালে মোটা অঙ্কের টাকা নেন। কিন্তু এখনও মার্কেটের জন্য কোনো জমিও কেনা হয়নি। কিন্তু সেই টাকা ফেরত দিচ্ছেন না তিনি। যারা ওই টাকা ফেরত চান তাদের নানাভাবে ভয়-ভীতি ও হত্যার হুমকি দেয়া হয়।

দোকান মালিক এনায়েত হোসেন বাবু বলেন, ১২ বছর আগে আমার কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা চাঁদা নিয়েছেন বাবুল। এর মধ্যে রাজধানী মার্কেট উন্নয়নের জন্য ৯ লাখ এবং পোস্তগোলায় মার্কেট নির্মাণ করে দোকান বরাদ্দ দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পাঁচ লাখ টাকা নেয়া হয়। এ টাকার মধ্যে মার্কেট উন্নয়নের জন্য মাত্র দুই লাখ টাকা খরচ করা হয়। বাকি টাকা বাবুল সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যায়। তিনি আরও বলেন, কমলাপুরে মার্কেট করে সেখানে দোকান বরাদ্দ দেয়ার জন্য আমার মধ্যস্থতায় ২০০৮ সালে ২০ জনের কাছ থেকে ৯৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেয় বাবুল চক্র। অথচ এখনও জমিই কেনা হয়নি। একবার টাকা ফেরত দিতে চাইলেও পরে আর তা দেয়নি। টাকা চাইতে গেলে বাবুল ও তার সহযোগীরা নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে রাজধানী ও নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট দোকান মালিক সমিতির অফিসে গেলে আজমল হোসেন বাবুলকে পাওয়া যায়নি। তবে তার ভাই আবু নাসের সেন্টু, ছেলে ফজলুল হক বিপ্লব এবং ভাগ্নে আশরাফ উদ্দিন টিটুসহ অন্যদের পাওয়া যায়। সেন্টু বলেন, নিয়ম অনুযায়ী ৩ বছর পরপর মার্কেটে নির্বাচন হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে কখনও কোনো নির্বাচন হয়নি। ভবিষ্যতে নির্বাচন হলে যারা নির্বাচিত হবেন তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। বিপ্লব জানান, তার বাবা আজমল হোসেন খুবই অসুস্থ, তাই তিনি অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে পারবেন না। বাবুলের মোবাইল ফোন নম্বর চাইলে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যা বলার আমাকেই বলুন।’ বিপ্লব বলেন, আমরা মার্কেট পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার পর কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। বিদ্যুৎ বিল যা এসেছে তা সবার মধ্যে ভাগ করে আদায় করেছি। একাধিক চক্র ফের মার্কেটটি দখল করতে চায়। তারাই আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।যুগান্তর

সর্বাধিক পঠিত