প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান : আমার দেখা একজন প্রধানমন্ত্রী

ড. মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান : জাপানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সিনজ আবে। তিনি জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আছেন। সিনজ আবে প্রথমে ২০০৬ সালে ১বছর ১দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর ২০১২ সাল থেকে টানা তিন বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা আছেন এবং এই বার তাঁর নভেম্বর ২০২১সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার কথা। প্রধানমন্ত্রী সিনজ আবে মোট চার বারে ৩১৭৮ দিন ক্ষমতায় আছেন এবং এপর্যন্ত জাপানের ইতিহাসে সিনজ আবে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আছেন। গত ২৮শে আগস্ট ২০২০ সিনজ আবে ঘোষণা করেন তার শারীরিক অসুস্থতার জন্য তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিনজ আবে ক্ষমতায় আছেন। পরবর্তীতে সিনজ আবের দল লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকেই আবার নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হবে। এখানে উল্লেখ্য জাপানের ইতিহাসে দ্বিতীয় দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন কাছুরা তারো। কাছুরা তারো ১৯০১ সালের ২রা জুন প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন এবং তিন বারে মোট ২৮৮৬দিন ক্ষমতায় ছিলেন।

কর্মের খাতিরে আমি জাপানের এই প্রধানমন্ত্রী সিনজ আবের সাথে দেখা এবং হ্যান্ডসেক করার সুযোগ পেয়েছিলাম। ৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সিনজ আবে দুই দিনের সরকারি সফরে বাংলাদেশে যান। ঐ সময়ে জাপানিজ একটি কোম্পানির বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সিনজ আবের দুটি বিশেষ প্রোগ্রামেই আমি উপস্থিত ছিলাম। প্রথম দিনের প্রোগ্রামটি ছিল বাংলাদেশ এবং জাপানের মধ্যকার বাণিজ্যিক বিষয়ে। সেখানে কথা বলেন দেশের সে সময়ের ব্যাংকের বড়কর্তা, বাণিজ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রি, এরা সবাই অনেক জ্ঞানী এবং অনেক ভোকাল। এরপর আশে ঐ দিনের প্রধান আকর্ষণ জাপানের প্রধানমন্ত্রী পালা। সত্যি বলতে ঐ দিন আমি প্রথম জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কথা সরাসরি শুনী এবং আমি ওনার কথা শুনার ভক্ত হয়ে যাই।

রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতাদের প্রতিভার মধ্যে সুন্দর করে এবং সময় উপযুগি কথা বলা একটা বিশেষ গুন। আর এই গুন যাদের আছে তারাই বিশেষ ভাবে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সাফল্য অর্জন করে। নেতাদের কথায়ই দেশের মানুষ নির্দ্বিধায় জীবন বিলিয়ে দেয়। যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবর রহমানের এক ডাকে ১৯৭১ সালে জীবন দিয়েছিল দেশের ৩০ লক্ষ মানুষ। আর সেই ডাক হচ্ছে এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এগুলোই হচ্ছে নেতাদের কথা।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সিনজ আবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও অনেক কথা, অনেক আদর্শ মানুষদের দিয়ে গেলেন। তাঁর কথার মধ্যে একটা আলাদা মাধুর্য আছে যা দেখে আমি মুগ্ধ। ২০২০ সালে করোনার কারণে প্রায় প্রতিদিনই তাকে সংসদে, মিডিয়াতে, ব্যবসায়িক মহলে, পাবলিকের কাছে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে হয়েছে। কখনো তিনি নিজের মনের মত করে কোন উত্তর দেন নাই। যখন তিনি জাপানে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করলেন তখন তাঁর ভাষণ আমি শুনেছি। কত সুন্দর করে দেশের মানুষকে তাঁর মনের কথা গুলো উপস্থাপন করলেন। যদি কোন জাপানী তাঁর কথা পুরোটা শুনে তাহলে সে অবশ্যই নেতার কথার বাইরে কিছু করবে না। জাপানিজরা ঠিক তাই করেছে।

আবেনমিক্স হচ্ছে তাঁর একটা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যা জাপানের ইতিহাসে অনেক বড় একটা অধ্যায়। ২০১১ সালের ১১ই মার্চ সুনামিতে জাপানের প্রায় ২০ হাজার বেশি লোক মারা যায় এবং অনেক বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় যার মাধ্যমে ২০১২ সালের রিমানসক তৈরি হয়। এই রিমানসক থেকে জাপানের অর্থনীতিকে আবার আগের স্থানে ফিরিয়ে এনেছে আবেনমিক্স।

আবার ২০২০ সালের করোনা ভাইরাস এসে সাড়া পৃথিবী যখন দিশেহারা। তখন জাপানের আবে সরকার দেশের জনগনের জীবন জিবিকার পাশে দাড়াতে প্রতিটি পরিবারকে তিন লক্ষ জাপানিজ ইয়েন প্রণোদনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু জাপান সকারের প্রতিপক্ষ দল এতে জোর প্রতিবাদ করার কারণে অবশেষে জাপানে বসবসারত প্রতিটি নাগরিককে এক লক্ষ জাপানিজ ইয়েন এবং প্রতিজন বাচ্চার জন্য এক লক্ষ জাপানিজ ইয়েনের পরে আরও দশ হাজার ইয়েন করে প্রণোদনা প্রদান করে।এছাড়াও দেশের অর্থনৈতিককে ঠিক রাখার জন্য ছোট ছোট কোম্পানিকে এক থেকে দুই মিলিয়ন জাপানিজ ইয়েন প্রণোদনা প্রদান করে। শুধু তাই না করোনার শুরুতে মানুষের হাহাকারে জাপানের কোথায়ও মাস্ক সেনিটাইজার পাওয়া যাচ্ছিলনা তখন প্রধানমন্ত্রী সিনজ আবে প্রথমেই প্রতি পরিবারের জন্য দুইটি করে কাপড়ের মাস্ক দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও এই মাস্ক বিতরণ নিয়ে অনেক বেশি বিতর্কের তৈরি হয় জাপানের সাধারণ মানুষের মাঝে। আমি নিজেও এই মাস্ক বিতরনের বিপক্ষে ছিলাম। কারণ এতে করে দেশের মানুষের যতটুকু উপকার হবে তাঁর চেয়ে বেশি দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে এবং হয়েছেও বটে।

জাপান পৃথিবীর মধ্যে একটি উন্নত দেশ। এদেশের মানুষের মাঝে অনেক বেশি দায়িত্ববোধ আছে। যে যেখানে আছে সেখান থেকে তার নিজের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করে যাচ্ছে। এই দায়িত্ব পালনের অন্যতম কারণ হচ্ছে জবাবদিহিতা। প্রতিটা মানুষেরই যদি তার নিজ নিজ কাজের জন্য সঠিক জবাবদিহিতায় থাকে তাহলে ঐ লোকের জন্য দায়িত্বের অবহেলা করা কঠিন। তাই জাপানের প্রধানমন্ত্রী সিনজ আবে আরও একবছর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ থাকার পরও নিজের দায়িত্ববোধকে বিবেচনা করে পদত্যাগ করে দিলেন। দেশ ও জাতীর উদ্দেশ্য ভাষণে বলে দিলেন আমার স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে দেশ এবং দেশের মানুষের দায়িত্বের অবহেলা হোক সেটা কোন ভাবেই কাম্য নয়। তাই আমি আমার শারীরিক দিক বিবেচনা করে ক্ষমতা থেকে অব্যাহতি চাই।

আমরাও যে দিন আমাদের নিজের অক্ষমতা জনগনের সামনে তুলে ধরে উপযুক্ত লোকের কাছে নিজের ক্ষমতা তুলে দিতে পারব সেই দিন আমরা বলতে পারব আমরা সভ্য হয়েছি। এই ধরণের নেতা, সরকারী অফিসার, কোম্পানির মালিক না তৈরি হওয়া পর্যন্ত আমাদের উন্নয়ন সম্ভব না। দেশ এবং জাতীর উন্নয়নের জন্য লাইফ টাইম ক্ষমতার প্রয়োগ এবং পরিবারকেন্দ্রিক ক্ষমতার অবসান না হওয়া পর্যন্ত কোন দেশই উনয়নশীল থেকে উন্নত দেশে পরিনত হতে পারেনি।

ডঃ মোহাম্মদ আখেরুজ্জামান, টোকিও, জাপান।

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত