প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রণোদনার অর্থ বড়রা পেলেও হতাশায় ছোটরা

ডেস্ক রিপোর্ট : কভিড-১৯ মহামারীর ধাক্কায় পুঁজি হারিয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন দেশের ছোট উদ্যোক্তারা। অস্তিত্ব রক্ষায় ঋণের চাহিদাও সবচেয়ে বেশি ছিল তাদের। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে অর্থ প্রাপ্তিতে ছোট উদ্যোক্তারাই সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছেন। এর বিপরীত চিত্র বড় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে।

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের সময়সীমা ধরা হয়েছিল ৩১ আগস্ট। এ সময়ের মধ্যেই প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ৭৬ শতাংশ অর্থ পেয়েছেন বড় উদ্যোক্তারা। যেখানে সিএসএমই খাতের উদ্যোক্তারা পেয়েছেন বরাদ্দকৃত প্যাকেজের মাত্র ১৭ শতাংশ অর্থ। আর কৃষক ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর প্যাকেজের ১০ শতাংশ অর্থও এখনো বিতরণ করা হয়নি। সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় প্রণোদনার সময়সীমা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ছোট ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের ঋণবঞ্চিত হওয়ার ঘটনায় ব্যাংকারদের সদিচ্ছার অভাবকেই বড় করে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রণোদনার অর্থ পেতে ব্যাংকারদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতেই সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ব্যাংকাররা বলছেন, কৃষিসহ ছোট ঋণ বিতরণের নীতিমালায় বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। করোনার মধ্যেই দেশে বন্যা নেমে এসেছে। এসব কারণে সিএসএমই, কৃষিসহ অন্য খাতের ছোট ঋণ বিতরণ সম্ভব হয়নি। এসব খাতে ঋণ বিতরণের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বড় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের বৈঠকে ডেকেছেন। আজ বেলা ৩টায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

করোনাভাইরাস সৃষ্ট অর্থনৈতিক দুর্যোগ থেকে উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা দিতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্যাকেজের সিংহভাগ অর্থ স্বল্প সুদে ঋণ হিসেবে উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণ করার কথা ব্যাংকগুলোর। মার্চ থেকে শুরু হওয়া এসব প্যাকেজ থেকে এরই মধ্যে ছোট-বড় প্রায় ১২ হাজার শিল্প উদ্যোক্তা ঋণ পেয়েছেন। শিল্প-কারখানার বেতন, নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে সুবিধা পেয়েছে আরো প্রায় ২৬ লাখ মানুষ। তবে ব্যাংকগুলো বড় ঋণ বিতরণে যতটা উদ্যোগী হয়েছে, ততটাই নিষ্ক্রিয় থেকেছে ছোটদের ঋণদানে। মূলত প্রভাবশালী উদ্যোক্তাদের চাপেই প্রণোদনা প্যাকেজের বেশির ভাগ অর্থ ছাড় দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ না পাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও। এজন্য দুই দফায় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে গভর্নর ফজলে কবির বৈঠকও করেছেন। আজ দেশের বড় ব্যাংকগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নিয়ে আবারো বৈঠক হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যথাসাধ্য তত্পরতা চালাচ্ছে। সিএসএমই ও কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়তে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দেয়া হচ্ছে। আশা করছি, দ্রুততম সময়েই সব ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তার হাতে প্রণোদনার অর্থ পৌঁছানো সম্ভব হবে।

দেশের বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতকে সুরক্ষা দিতে প্রথমে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ প্যাকেজের সঙ্গে যুক্ত করা হয় আরো ৩ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৩৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সে হিসেবে এ প্যাকেজের ৭০ দশমিক ৯০ শতাংশ অর্থ এরই মধ্যে ছাড় দেয়া হয়েছে গ্রাহকদের অনুকূলে।

রফতানিমুখী শিল্প শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। এ টাকায় তিন মাসের বেতন না হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক আরো ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার জোগান দেয়। পরবর্তী সময়ে গার্মেন্টস মালিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আরো এক মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয় সরকার। এ খাতে নতুন করে দেয়া হয় ৩ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে রফতানিমুখী শিল্প শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২ শতাংশ সুদে ঋণ হিসেবে এ অর্থ ছাড় দিয়েছে ব্যাংকগুলো। রফতানিমুখী শিল্পের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানই বৃহৎ শিল্প হিসেবে গণ্য করা হয়। সে হিসেবে দেশের বৃহৎ শিল্পের প্রণোদনা প্যাকেজের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আগস্ট পর্যন্ত এ প্যাকেজ থেকে ৩০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। সে হিসেবে বৃহৎ শিল্পের জন্য বরাদ্দকৃত প্যাকেজের বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

ঠিক বিপরীত চিত্র কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য ঘোষিত প্যাকেজের। সিএসএমই খাতকে সুরক্ষা দিতে ঘোষণা করা হয়েছিল ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ। আগস্টের মধ্যেই এ প্যাকেজের বাস্তবায়ন হওয়ার কথা। যদিও আগস্ট শেষে এ প্যাকেজের মধ্যে ১৭ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। ৪ শতাংশ সুদে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রায় ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এ অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে।

সিএসএমই খাতে ঋণ দিতে শুরু থেকেই অনীহা দেখাচ্ছিল ব্যাংকগুলো। ফলে জুন পর্যন্ত এ খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ ছিল মাত্র ২০৬ কোটি টাকা। ব্যাংকারদের এ খাতে ঋণ দেয়ায় উৎসাহিত করতে খেলাপি করার সময় বাড়ানো, প্রভিশন কমানোসহ নানা ছাড় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে গঠন করা হয় ২ হাজার কোটি টাকার ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম। সিএমএসএমই খাতের প্রণোদনার ঋণ খেলাপি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ স্কিম থেকে পরিশোধ করার কথা জানায়। এরপর এ খাতে ঋণ বিতরণ কিছুটা বাড়লেও এখনো গতি ফেরেনি।

বাস্তবতার কারণেই সিএসএমই ও কৃষি খাতের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, কিছু কঠিন শর্তের কারণে সিএসএমই খাতের প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে ধীরগতি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি শর্তগুলোতে কিছুটা ছাড় দিয়েছে। করোনার মধ্যেই দেশের বড় অংশ জুড়ে বন্যা নেমে এসেছে। পরিস্থিতির কারণেই গ্রাহকদের প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকগুলো সবক’টি প্যাকেজ বাস্তবায়নে তত্পরতা বাড়িয়েছে।

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক প্রণোদনা প্যাকেজ বাবদ এক হাজার কোটি টাকা বিতরণ করতে পারবে। এর মধ্যে ৭০০ কোটি টাকা বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের। এরই মধ্যে আমরা এ প্যাকেজের ৩৫০ কোটি টাকা বিতরণ করেছি। সিএসএমই খাতেও ৫০ কোটি টাকার বেশি বিতরণ করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই এ খাতে ১৫০ কোটি টাকা বিতরণ করা সম্ভব হবে।

পোলট্রি, মত্স্য, ডেইরি, প্রাণিসম্পদ, মৌসুমভিত্তিক ফুল ও ফল চাষের জন্য গঠন করা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম। জুলাই পর্যন্ত এ তহবিল থেকে বিতরণ করা হয় মাত্র ৪৯৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে এ প্যাকেজের বাস্তবায়নের হার মাত্র ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। মোট ১৭ হাজার ৯৮০ কৃষক এ প্যাকেজ থেকে ঋণ পেয়েছেন।

নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এনজিওর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে গ্রাহক পর্যায়ে এ ঋণ বিতরণ করার কথা। যদিও এ প্যাকেজ থেকে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ২৭৬ কোটি টাকা। সে হিসেবে এ প্যাকেজের মাত্র ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ অর্থ বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক এখন পর্যন্ত এ দুটি প্যাকেজ থেকে ঋণ বিতরণ শুরুই করতে পারেনি।

রফতানিকারকদের প্রাক-জাহাজীকরণের জন্য গঠন করা হয় ৫ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। এখান থেকে ব্যাংকগুলো মাত্র ৩ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন নিয়ে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করার কথা। আবার রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার ৩৫০ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ডলার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সুদহার কমিয়ে লাইবর যোগ দেড় শতাংশের পরিবর্তে বার্ষিক ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এ দুটি তহবিল থেকেও বড় অংকের অর্থ ছাড় পেয়েছেন উদ্যোক্তারা।

প্রণোদনা প্যাকেজের প্রায় ৮০ শতাংশ এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে বলে জানান দ্য সিটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে প্রণোদনা প্যাকেজ বাবদ আমরা ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করার কথা। এরই মধ্যে আমরা ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছি। দ্রুততম সময়ে ঋণের বাকি অর্থও বিতরণ করা সম্ভব হবে। সঠিক ব্যক্তির হাতে প্রণোদনার অর্থ পৌঁছে দিতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি।

সূত্র : বণিক বার্তা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত