প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাদিয়া নাসরিন: আপনাদের এইসব জ্ঞান আমারে সত্যিই আশ্চর্য করে

সাদিয়া নাসরিন: যারা মনে করেন ধর্ষণ মানে বাংলা সিনেমার ভিলেনদের মত করে আইসা ফাট করে নায়িকার কাপড় টাইনা ছিঁড়ে ফেলতে হবে, নায়িকার দুই হাত দুই পা বাইন্ধা রাখতে হবে, রক্তাক্ত করতে হবে, ধর্ষণ শেষে নায়িকার গালে, বাহুতে কালশিটে দাগ পড়ে থাকতে হবে এবং এই সমস্ত প্রত্যক্ষ্য আলামত ছাড়া তারে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না, তাদের জন্য ধর্ষণ সংক্রান্ত আইনের ব্যখ্যায় “ইচ্ছার বিরূদ্ধে” এবং “সম্মতি ছাড়া” কথাটার ব্যখ্যাটা শোনাই আবার।

ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী “কোনো নারীর ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ বা ‘সম্মতি ছাড়া’ বা ‘ভীতি প্রদর্শন’ করে বা ‘প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়’ করে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করলে তাকে ধর্ষণ বলা হবে। এখানে, ‘ইচ্ছার বিরুদ্ধে’ বলতে বুঝানো হবে, সরাসরিভাবে অনিচ্ছুক বা আগ্রহী না হওয়া। আরো বোঝাবে, নিদ্রিত অবস্থায় বা কোনো প্রকারে নেশাগ্রস্ত করে বা জড়বুদ্ধিসম্পন্ন কোনো নারীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করা। আর ‘সম্মতি ছাড়া’ বলতে, স্বাধীন বা স্বেচ্ছাকৃতভাবে যৌনসম্পর্কে নারীর অনুমতি না দেয়া”।

এবার আসেন আপনাদের একটা কাহিনী শোনাই। ঘটনার পাত্র পাত্রীর নাম সংগত কারণেই বললাম না, তাঁরা দুইজনেই আমার ফেসবুকে আছেন, আপনাদের কারো কারো লিস্টেও আছেন। দয়া করে এরপরে “কে কে” বইলা তাঁদের পরিচয় জানার জন্য আমারে ইনবক্সে গুতাবেননা। এই গোপনীয়তা রক্ষার জন্য আমি তাঁদের কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

যাই হোক, তাঁরা দুইজনেই পরিণত মানুষ। দুইজনই শিক্ষিত এবং ওয়েল পজিশনড এবং দুইজনই তখন পর্যন্ত, আই রিপিট, ঘটনার দিন পর্যন্ত, একটা কমিটমেন্টের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন। তো, সম্পর্কের এক পর্যায়ে গিয়ে পুরুষ ভদ্রলোকটি নারীটিকে বিভিন্ন রকমের সাইলেন্ট ট্রিটমেন্ট দেওয়া শুরু করলেন, ইগ্নোর করতে শুরু করলেন, নারীটি বুঝতে পারতেসিলেন লোকটি অন্য নারীর সাথেও সময় কাটান..মিথ্যা বলেন এবং ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং ও ইত্যাদি রকমের ইতরামী করেন।

এই পর্যায়ে একদিন নারীটি তাদের দেখা করার নির্দিষ্ট যায়গায় ওই ভদ্রলোকের সাথে দেখা করলেন এবং পরিষ্কার ভাষায় বললেন যে, “আমার কাছে এই সম্পর্কটা হেলদি লাগতেসে না, ওয়ার্থলেস লাগতেসে এবং মনে হইতেসে তুমি এই সম্পর্কটার বিষয়ে অনেস্ট না। সুতরাং আমি এই সম্পর্কটা থেকে বের হয়ে যেতে চাই, তুমি দয়া কইরা আমারে ছাইড়া দাও”।

তখন ভদ্রলোক কি করলেন, প্রচুর কান্নাকাটি কইরা, মরা বাপের নামে, নিজের সন্তানের নামে কসম কিরা কাইটা, নিজের গালে নিজেই জুতাটুতা মাইরা, যত ধরনের ইমোশনাল টুল আছে তার সবটা এপ্লাই কইরা নারীটিরে পুরা পাজল্ড করে দিলেন এবং মানুষের স্বাভাবিক মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী নারীটি সম্পর্কটা থেকে সেই দফায় আর বের হয়ে আসতে পারলেন না। এবং সেইদিন তাঁরা দুইজনই যখন এইসব আলোচনা-কান্নাকাটি ইত্যাদি তেরোভং শেষ কইরা বের হয়ে আসবেন, তখন ভদ্রলোক নারীটিকে টেনে ধরে “কনভিন্স করার ফুল কোর্স” কমপ্লিট করতে চাইলেন।

নারীটি পরিষ্কার ভাষায় বললেন, “না আজকে আমি এটা চাই না”। এখন ভদ্রলোক ধরেই নিলেন এইটা অভিমানের কথা। তিনি জোর করতে থাকলেন। নারীটি আবারও পরিষ্কার ভাষায় বললেন, “আমি আজকে অন্তত এটা চাই না, আজকে আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত না, আমার মন চাইতেছে না।” এখন এই “চাইনা”র জায়গাতেই বিষয়টি শেষ হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু পুরুষের দল যেহেতু নারীর ‘না’ মানে ‘নয়বার হ্যাঁ’ বলে ধরে নিতে শিখসে, সেহেতু ভদ্রলোক লাইগা থাকলেন। অসম্ভব ইমোশনাল হইয়া বললেন, ঠিকাসে আমরা কিছুই করবোনা। শুধু তোমারে একটু জড়ায় ধরে বসে থাকতে দাও। এবং বলাই বহুল্য সেই বসে থাকা আর বসে থাকায় সীমাবদ্ধ থাকলোনা এবং নারীটির ক্রমাগত না এর মুখেই ঘটনা সমাপ্ত হয়ে গেলো।

তো, ঘটনার পরে এই নারীটি যখন ভদ্রলোকরে প্রশ্ন করলেন, এইটা তুমি ক্যান করলা? ক্যান আমার কথা শুনলানা? আমার তো এইটা ভালোলাগেনাই!!” ভদ্রলোক হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন, “এইটা হইল মেয়েদের রাগ ভাঙ্গানোর সবচাইতে ইফেক্টিভ এবং প্রাচীন কৌশল। আমার বাপে এইটা শিখাইসে আমাকে”!

…নারীটি সোজা বাংলায় বোকচোদ হয়ে গেলেন আর কি!! ঘটনা চলাকালীন যাও হোক ভদ্রলোক কোনভাবে নারীটিরে প্রভোক করতে পারসিলেন, বা নারীটির শরীর হয়তোবা শরীরের নিয়মেই রেসপন্স করসিলো, কিন্তু মন বলে যেই জিনিষটা আছে সেইটা তো এতোক্ষণ চোখ রাঙাইতে ছিলোই, তার উপর ভদ্রলোকের এই “বাপের শিখায়া দেওয়া প্রাচীন কৌশল” শুইনা নারীটির ভেতরে নিজের প্রতি যে তীব্র বিবমিষা তৈরি হইল, নিজেরে প্রতারিত মনে হইলো, এইটারে আপনারা কী বলবেন?

নারীটি ভদ্রলোকরে ঠেকাইতে পারেননাই, মানে তাঁর সম্মতি ছিলো? নারীটি রক্তাক্ত হননাই বলে, তাঁর জামা ছিঁড়েনাই বলে, তাঁর গালে, বাহুতে কোন দাগ হয়নাই বলে, তিনি বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করেননাই বলেই তিনি “এনজয়” করসিলেন?

যদি আপনাদের দেয়া ধর্ষণের সংজ্ঞা অনুযায়ী এইগুলাই ধর্ষণের একমাত্র প্রমাণ, তাহলে আপনারা কোন যুক্তিতে “বৈবাহিক ধর্ষণ” “নো মিনস নো” নামের এইসব টার্ম গলামোটা কইরা ব্যবহার করেন, সেই উত্তরটা আমারে দিয়েন দয়া করে।

যাই হোক, এর পরেও তাঁদের আলাদা হওয়ার আগ পর্যন্ত কম হইলেও তিশোবার স্বাভাবিক কথাবার্তা হইসে। কিন্তু যতোদিন কথা হইসে প্রায় প্রতিদিনই নারীটি সেই একদিনের স্পেসিফিক ঘটনাটার জবাব চাইসেন। প্রতিবারই বলসেন, “আমাদের আগের একশবার ডেট করা নিয়ে আমার কোন সমস্যা নাই, পরের পাঁচশোবার ডেট করা নিয়েও হয়তো থাকতোনা। কিন্তু স্পেসিফিক ওইদিনের ঘটনা নিয়ে আমার ইস্যু আছে এবং এইটার জবাবদিহী তোমারে করতেই হবে”।

এখন আপনারা তো এই নারীর বিরূদ্ধে “নিজের ইচ্ছায় সব কইরা এখন অনুতাপে ভুগতেসে” বা বা “কনসেন্ট ছাড়া ডেট করলে এরপরে আবার স্বাভাবিক কথাবার্তা হয় ক্যামনে”, এইসব বলে “ভিক্টিমহুড কার্ড” খেলার অভিযোগ আনবেন, তাইনা?

তারপর এই নারীটিরে বলবেন, তার সাথে ‘একলা দেখা করসো’ ক্যান? তোমার কনসেন্ট না থাকলে ‘পারসে’ ক্যামনে? একসপ্তাহ পরে কইতেসো ক্যান? তুমি চিল্লাওনাই’ ক্যান? তুমি পুলিশ ডাকোনাই ক্যান? মামলা করোনাই ক্যান?

উফ, কী জ্ঞান আপনাদের!! ভাভারে ভাভা!! আপনাদের এইসব জ্ঞান আমারে সত্যিই আশ্চর্য করে। হুবুহু ধর্ষকের পক্ষের উকিলের মতো । ভাবা যায় এগ্লা!!

শোনেন মহাজ্ঞানী মহাজনেরা, পৃথিবীর সমস্ত ঘটনারে হ্যাঁ এবং না দিয়া জাস্টিফাই করা যায় না। এই ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ এর মাঝখানে অনেকগুলো গ্রে এরিয়া থাকে, সার্কামস্টান্সেস থাকে, মোটিভস থাকে। সেইগুলারে অ্যানালিসিস করে সিদ্ধান্তে আসতে হয়। যে মানুষটা নিজেরে ভিক্টিম মনে করতেসে (নারী পুরুষ যেই হোননা কেন), তাঁর এই মনে করাটারে আমলে নিয়ে অন্য সারকমাস্টান্সেস গুলা অ্যানালিসিস কইরা গ্রে এরিয়াগুলো আইডেন্টিফাই করতে হয়।

এখন আপনি যদি এই অ্যানালিসিস করতে না পারেন, এ্যাকশন-রিফ্লেকশন-এ্যাকশন এর “প্র্যাকসিস” থিওরি যদি আপনার মাথার উপর দিয়ে যায়, তাহলে আল্লাহর ওয়াস্তে নিজেদের জ্ঞান-গরিমা, বই-পুস্তক যা যা পড়সেন সেইগুলা নিজের টয়লেটের মধ্যে টিস্যু হিসেবে রাইখা দেন।

অকারণে আপনার বইপড়া মুখস্থ জ্ঞান জাহির কইরা যে মানুষটা নিজেরে এক্সপ্লয়টেড মনে কইরা এমনিতেই ইনইডিকোয়েট হইয়া আছে, তারে আরো খাদের কিনারে দাঁড় করাই দিয়েন না।

ধর্ষণরে না বললে পুরাটাই বলেন। আপনারা কার কার কাছে কি কি বিষয়ে ‘ধরা খাইয়া’ আছেন, সেইসব মাথায় রাইখা সিলেক্টিভ প্রতিবাদ কইরেন না। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত