প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এডভোকেট মাওলানা রশীদ আহমদ: রাজস্ব ও অর্থনীতি

এর বিপরীতে রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। এই রাজস্ব পূর্ববর্তী অর্থবছরের চেয়ে ২.৪৫ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হলো তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এতে এবারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৫১ শতাংশ বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে হবে। এর বিপরীতে প্রথম মাসে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে কম রাজস্ব আদায় হয়েছে ২২ শতাংশ। তাই চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগের বছরের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতির কারণে এবারের যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। এতে সরকারকে বাজেটের ব্যয় সঙ্কুলান করতে হিমশিম খেতে হবে। এরই মধ্যে মধ্যে জাতীয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমতে শুরু করেছে। ফলে সরকারের বাজেটের রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা সামাল দিতে হলে ব্যাংক খাত থেকে আরো বেশি হারে ঋণ নিতে হবে। এবার ব্যাংক খাত থেকে ৮৫ হাজার কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। তবে গতবার ৪৭ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এবার এই অঙ্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে প্রথম মাসেই ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে বলে ব্যবসায়ী নেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অর্জন করা করোনাকালীন এ সময়ে মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। এর আগে শুধু একবার রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ। এবার খুব বেশি হলে এই প্রবৃদ্ধি সাড়ে ১২ শতাংশ হতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখবর নয়। আমাদের অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন যে সম্ভব নয়, বিদায়ী অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের দিক তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৯-২০ অর্থবছরে এনবিআরকে তিন লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আদায় ব্যর্থতার কারণে এই লক্ষ্যমাত্রা থেকে ২৫ হাজার কমিয়ে সংশোধিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তিন লাখ ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে তাও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এই সময় রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮২ হাজার কোটি টাকা; যা সত্যিই উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে উচ্চ জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয়ে সরকারের উচ্চাভিলাষী আকাক্সক্ষা সময়োপযোগী নয় বলে মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) পক্ষে। এতে বলা হয়, নতুন অর্থবছরের বাজেটে কিছু কিছু জায়গায় অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে; যা বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রাগুলো হলো জিডিপির প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। আর তা সামাল দেয়া মোটেই সহজসাধ্য হবে না।
বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে কেউই বাস্তবসম্মত মনে করছেন না। কারণ শুধু বাংলাদেশ নয় বরং সারা বিশ্বেই এখন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তাই অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতাবিবর্জিত ও অযৌক্তিক। ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা বাজেট জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছে। গৃহীত বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য ব্যয়বাবদ খরচ ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত কর থেকে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কর ছাড়া রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা; যা জিডিপির ৬ শতাংশ। এ হার গত বাজেটে ছিল ৫ শতাংশ। যে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থা যত গতিশীল সে দেশের অর্থনীতিও ততই মজবুত। কিন্তু আমাদের দেশের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। এ জন্য সরকারকে ধারদেনা করে রাষ্ট্রীয় খরচ বহন করতে হয়ে। তাই দেশের রাজস্বব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করে ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। কারণ রাজস্বই হচ্ছে জাতীয় অর্থনীতির প্রাণশক্তি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, গবেষক, লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত