প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অমি রহমান পিয়াল: ২১ আগস্টের যীশু কিংবা একজন রক্তাক্ত নীলা

অমি রহমান পিয়াল: নীলা চৌধুরীকে এখন দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই- সুইডিশ যাপনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন, পোশাক-আশাকেও প্রবাসী বাঙালির ছাপ স্পষ্ট। তার জিন্স পরা ছবি দেখলে কেউ সন্দেহ করবে না যে ওই ডেনিমে লেপ্টে থাকা চামড়াটা ঝাঝরা হয়ে আছে। দুপায়ের নার্ভগুলো এখনও ড্যামেজড। লেখাটা যখন লিখছি (২০১১ সালে), তখন সুইডেনে ভোর হচ্ছে। মাঝরাতে তাকে ফেসবুকে ধরলাম। ঠিক সাংবাদিকসুলভ ভঙ্গিতে নয়, প্রচলিত সাক্ষাৎকারও নয়। অনেকটা মনোবিদের মতো খুটিয়ে খুটিয়ে তার চোখেই দেখলাম সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর বিকেলটা। কথা শেষে নিজেই বললেন, অনেকটা নির্ভার লাগছে তার। পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করছি তার সেই দুঃস্মৃতি, যা যীশুর মতো তাকে পেরেকবিদ্ধ করে রেখেছে এই কালো তারিখটার রক্তাক্ত ক্রুশে।

আগের রাতটা একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরেছিলেন নীলা। পরদিন খুব ব্যস্ত সময় কাটবে, তাই গোছানোর আছে অনেক কিছু। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেত্রী তিনি। স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা। রাজনীতিটা রক্তেই। বাবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আলিম, ২৮ এপ্রিল পাইকপাড়ায় তাকে মেরে ফেলে পাকিস্তান আর্মি। মা আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেত্রী, সাজেদা চৌধুরী (সাংসদ নন)। পারিবারিকভাবেই বঙ্গবন্ধু-অন্তপ্রাণ। আওয়ামী লীগের তেড়িয়া সমর্থক। ২১ আগস্ট বিকেলে একটা র‌্যালি আছে দলের, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। সন্ধ্যায় আবার ভাইয়ের শালীর এনগেজমেন্ট। কর্মসূচীটা সেরেই ধানমন্ডি তিন নম্বরে সে অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্ল্যান। একাই যাবেন। পরদিন যথারীতি ভোরে শুরু হলো নীলার আরেকটি দিন। ছেলেদের স্কুলে পাঠালেন, স্বামীও চলে গেলেন ব্যবসার কাজে। ১১ টায় বাসা থেকে বের হলেন নীলা। তার আগে বুয়াকে কিছু নির্দেশ দিলেন। ফিরতে রাত হবে তার। তখনও নীলা জানেন না, এই বাড়িতে আগামী কয়েকমাসে আর ফেরা হবে না। এবং ফিরলেও, সেটা মাত্র কয়েকদিনের জন্য।

দিনটা এমনিতেও গনগনে। ভীষণ রোদ। সবুজ পাড়ের সুতি শাড়ি পরনে, ম্যাচিং অলিভ ব্লাউজ। গড়পড়তা বাঙালি মেয়ের চেয়ে লম্বা নীলা। পাঁচ ফিট সাড়ে ছয়, তারপরও একটা হিল পড়েছেন। ফ্লাট হিল, পেছনে আড়াই ইঞ্চি, সামনে দুই। এই সিদ্ধান্তটা যে ইতিবাচক ছিলো তার প্রমাণ মিলবে সামনে। অনুষ্ঠান বিকেলে হলেও ব্যক্তিগত কিছু কাজ সারতে একটু আগেই বের হয়েছেন। তারপরও পাছে দেরী হয়ে যায় এই তাগিদটা জুড়ে আছে সারাক্ষণ। একটু পরপর একে ওকে ফোন করছেন- অনুষ্ঠানে আসছেন তো! আমি কিন্তু বেরিয়ে পড়েছি। নীলা বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে পৌঁছলেন সাড়ে তিনটায়। ড্রাইভারকে ছেড়ে দিলেন। র‌্যালি শেষ হবে ৩২ নম্বরে। সেখান থেকেই বাগদানের অনুষ্ঠানে চলে যাবেন।

পার্টি অফিসে ঢোকার পর পরিচিতদের সঙ্গে কুশল বিনিময়। আওয়ামী লীগের জন্য এই শো-ডাউনটা যথেষ্টই গুরুত্বপূর্ণ। আর সে কারণেই গমগম করছে চারপাশ। চারটায় বের হয় গেলেন নীলা। যদিও বিরোধী দল নেত্রীর আসতে এখনো একটু দেরী আছে। অফিসের বাইরে খোলা ট্রাকে মঞ্চ। সেখানে ওঠার সিড়ির দুপাশে সারি বেধে দাঁড়ানোর একটা প্রতিযোগিতা চলছে। বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের বড় নেতারা সবাই আছেন। নেত্রীকে চেহারা দেখানোর একটা প্রচ্ছন্ন তাগিদ সবার মাঝেই। নীলার উল্টো দিকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি বাহাউদ্দিন নাসিম। একটু পর সেখানে এলেন মাহবুবা আখতার। সাভার থাকেন। নাসিম তাকে বললেন নীলার পাশে দাঁড়াতে।

গরমের তীব্রতা আরো বেড়েছে। হাতে একটু সময় আছে বলে নীলা মাহবুবাকে নিয়ে আবারও গেলেন পার্টি অফিসে। স্বেচ্ছাসেবক লীগের ব্যানারটার কী অবস্থা খোজ নিলেন। এমনিতে অন্যসব অঙ্গসংগঠনে মেয়েদের সংখ্যা প্রচুর হলেও স্বেচ্ছাসেবক লীগে মেয়ে মাত্র তারা ৪ জন। অ্যাডভোকেট কাজল, নাজনীন, মাহবুবা ও নীলা। র্যালিতে- মিছিলে মেয়েরা সামনের দিকে থাকে। ব্যানারটা উঁচিয়ে তোলা চাই। নেত্রীর চোখে পড়তে হবে। তখনও ভেতরে বসে থাকা পরিচিতদের তাড়া দিলেন নীলা। তার ডাকে যারা বের হলেন, তাদের একজন কুদ্দুস পাটওয়ারী। আর কিছুক্ষণ পর তিনি লাশ হয়ে যাবেন। এখনও নীলা আফসোস করেন যে অমন জোরাজুরি না করলে হয়তো কুদ্দুস এখনও জীবিত থাকতেন। ঘামজবজবে চেহারাটা দেখে তাকে একটু বসতে অনুরোধ করেছিলেন অনেকে। নীলার সময় নেই এসব ফালতু বিশ্রামের!

সাড়ে ৪টা বেজে গেছে, শেখ হাসিনা আসার সময় হয়ে গেছে। একটা হালকা ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়ে গেছে আশেপাশে। এই একটা জিনিসে বড্ড ভয় নীলার। ট্রাকের গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। নেত্রী এসে গেছেন। তার দিকে নজর দেওয়ার আগেই পেছন থেকে অনুরোধ, একটু জায়গা দিন না প্লিজ, আইভী আপা সামনে যাবেন। ডান হাতে ট্রাকের ডালা ধরে জায়গা করে দিলেন নীলা। একে একে তাকে পেরিয়ে গেলেন শাহীন আপা, শিরিন আপা, লাইলী আপা।

ট্রাকে উঠলেন শেখ হাসিনা। ছোট বক্তৃতার পরই শুরু হবে র‌্যালি। বাক্য বিরতিতে স্লোগান চলছে। বক্তৃতার শেষ লাইন। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু বলার সুযোগ আর পেলেন না তিনি। প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো ট্রাকের সামনে। এরপর স্লো মোশনে দৃশ্যগুলো আমরা কল্পনা করি। পায়ে একটা জ্বলুনি অনুভব করলেন নীলা, কিন্তু সেদিকে তাকাতে সাহস হলো না। আওয়াজে কানে তালা লেগে গেছে তার। ডালাটা ডান হাতে ধরা, তাকিয়ে দেখলেন দুহাতে কান ঢেকে বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা। নীলার মুখ থেকে একটা আর্তির মতো বের হলোÑ তোমরা নেত্রীকে বাঁচাও। ওই অবস্থাতেই দেখলেন একদল লোক শেখ হাসিনাকে ঘিরে ট্রাক থেকে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই নীলার ধারণা ছিলো, শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরপর কয়েকটা বিস্ফোরণ, লোকজন ছোটাছুটি করছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। সামনে ফাঁকা, আহত এবং নিহত হয়ে পড়ে আছে একটু আগেই তাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলো। একটু আগেই ইঞ্চির ফারাক ছিলো না যেসব শরীরে সেখানে এখন যোজন ব্যবধান। আস্তে আস্তে মাথাটা ঘোড়ালেন নীলা। চোখে পড়লো অফিসের সামনের ড্রেনটা রক্তে লাল হয়ে আছে। ট্রাকে ঢালা ধরে দাঁড়িয়ে নীলা। একা। গুলির শব্দ থামেনি। এবার তার বাঁচার আকুতি জাগলো। চোখে ভেসে উঠলো দুই ছেলের মুখ। মাকে ছাড়া ওরা কীভাবে থাকবে! ডান পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে দেখেন, শক্তি পাচ্ছেন না। এবার তাকিয়ে দেখলেন, হাঁটুর কাছ থেকে শাড়ি রক্তে ভেজা। পায়ে হিল নেই। স্ট্র্যাপ আঁটা সেই স্যান্ডেল স্রেফ উড়ে গেছে। এমনটিতে ফ্ল্যাট পরে অভ্যস্ত নীলা। আজ পড়লে গোড়ালিটাই উড়ে যেতো। হাঁটতে পারছেন না। মাত্র সাত কী আটফুট দূরে পার্টি দরজা। চেষ্টা করে দেখলেন, সম্ভব নয়। মাটিতে বসে পড়লেন। সম্মোহিতের মতো চেয়ে দেখলেন সামনেই পড়ে আছে তখনো না ফাটা একটি গ্রেনেড। এতোক্ষণ পর্যন্ত বোমা হামলা হয়েছে বলেই ভেবেছেন নীলা এবং সেই হামলার লক্ষ্য তিনি নন, বরং শেখ হাসিনা। কিন্তু নেত্রী তো আর জীবিত নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। জলপাই রাঙা মারণাস্ত্রটি দেখামাত্রই চিনে ফেললেন। যেকোনো মুহূর্তে ফাটবে এটি। চোখ বন্ধ করলেন। তারপর কনুইয়ে ভর দিয়ে ক্রল করে এগোতে লাগলেন, নির্ঘাত মৃত্যু থেকে যতো সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা প্রাণপণ। হামাগুড়ির পথে দেখছেন নিথর হয়ে ফেলফেলে চোখে তাকিয়ে মাহবুবা। কালো ব্যাগটা বুকের উপর। একটু দূরে আইভী রহমান। নিরবÑ নিস্তেজ। এগোতেই সামনে দেখলেন একটা সাইকেল পরে আছে। পাশে বসে আছেন সবার প্রিয় আদা চাচা। ওই অবস্থাতেই মৃত্যু হয়েছে তার। বাঁটা দোকানের সামনে পৌঁছে কলাপসিবল গেট ধরে দাঁড়ালেন নীলা। তাকিয়ে দেখেন পেট্টল পাম্পের সামনে সাদা পরা কেউ একজন এদিকে গুলি ছুঁড়ছে। পুলি আছে, নিরব দর্শকের ভূমিকায়। এতোক্ষণ বাঁচার তীব্র আকাক্সক্ষায় স্রেফ মনের জোরে এটুকু এসেছেন। কিন্তু যে পরিমাণ রক্ত হারিয়েছেন, তাতে দুর্বল হয়ে পড়েছিলো শরীর। জ্ঞান হারানোর আগে বাঁচাও বলে একটা চিৎকার দিতে পারলেন শুধু। পরদিন শমরিতা হাসপাতালের ৭ তলা ওয়ার্ডে জ্ঞান ফিরলো নীলার। টের পেলেন মাথার কাছে মা বসে আছেন। পলওয়েল সুপার মার্কেটে ছোট ভাই শাহীনের দোকান আছে। সে তার বন্ধুদের কাছে খবর পেয়ে বোনের খোঁজে ছুটে আসে। নীলাকে সেখান থেকে নেওয়া হয়েছিলো ঢাকা মেডিকেলে। বান্ধবী ও সাগুফতা ইয়াসমিনের চাপে তাকে শমরিতায় পাঠানো হয়। ৫ দিনের মাথায় অবশেষে জ্ঞান ফিরে তার। এর মধ্যেই নিশ্চিত হয়েছেন নেত্রী বেঁচে আছেন। এদিকে মা অস্থির। শোনা যাচ্ছে, ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নীলার পা দুটো ফেলার। এই সিদ্ধান্তটা রদ করার জন্য তিনি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবেন আবদুল জলিলের কাছে। আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক অনেক জোর করেই সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য করেন অধ্যাপক রুহল হককে। ভাগ্যদেবী সেবারই শুধু হাসেননি, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এরপর নীলাকে আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় ভারতে। সেখানে পিকে ব্যানার্জির তত্ত্বাবধানে ছিলেন কয়েক মাস। বাংলাদেশে ফিরে ট্রমা সেন্টারে কিছুদিন। দুইবছর কাটলো এভাবেই কিংবা নিউরোসার্জিরর সুলভ কিংবা উন্নত চিকিৎসা এই উপমহাদেশে নেই। এবার নীলাকে প্যারিস পাঠানো হলো। সঙ্গে তার ছোট ছেলে। শেখ হাসিনা মোট ৩৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন নীলার চিকিৎসায়। এতো সৌভাগ্য হয়নি আহত আর কারও। মাহবুবা বেঁচে আছে এখনো, কিন্তু সেটা বেঁচে না থাকার মতোই। নীলা এই মহত ও উদার্য্যরে কথা স্বীকার করেন। তিনি কৃতজ্ঞ।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

সর্বাধিক পঠিত