প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নুরুল আজিম রনি: পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে বিএনপি-জামায়াত

নুরুল আজিম রনি: একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে পাকিস্তান। কারণ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করা গেলে বাংলাদেশে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা করা হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামিদের জবানবন্দি, পাকিস্তান কেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠনের সম্পৃক্ততা এবং তৎকালীন পাকিস্তান হাইকমিশনারের আচরণ পর্যালোচনা করে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে হামলার বিষয়টি আজ স্পষ্ট। ওই হামলার আগে ঢাকায় কমপক্ষে ১০টি বৈঠক হয় এবং এসব বৈঠকে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, হারিছ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন৷ গ্রেনেড হামলা মামলার ২৫১ জন সাক্ষী, ২০ জন সাফাই সাক্ষী ও গ্রেফতার আসামিদের জবানবন্দিতে উঠে এসেছিল গ্রেনেড হামলায় জড়িত জঙ্গি সংগঠনগুলোর নাম। হিজবুল মুজাহিদিন, তেহরিক-ই জিহাদি ইসলামী, লস্কর-ই তৈয়বা, জইশ-ই মহম্মদ, হরকাতুল মুজাহিদিন, হরকাতুল জিহাদ ও রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এ হামলায় অংশ নিয়েছিল। এরা সবাই পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) নিয়ন্ত্রিত৷ এছাড়াও গ্রেপ্তার হওয়ারা তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পুরো পরিকল্পনা ও হামলার অপারেশনাল কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়েছে। পাকিস্তানের নাগরিক ও পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন-এর ইউসুফ বাট এই কাজে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল৷

পাকিস্তানের নাগরিক ও পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন-এর আব্দুল মাজেদ ভাট ওরফে আব্দুল মজিদ যার প্রকৃত নাম ছিল আবু ইউসুফ ভাট, বাংলাদেশে সুদূরপ্রসারী জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য পাকিস্তান থেকে ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। আটক হওয়ার পর ২০০৯ সালের ৬ ডিসেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ইউসুফ ভাট বলে, ‘পাকিস্তানের চিরশত্রু শেখ হাসিনা। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা, মূলধারার রাজনৈতিক দল ও ধর্মভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলো তাই শেখ হাসিনাকে পছন্দ করে না। পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথাও স্বীকার করে এই ইউসুফ ভাট। ভারতকে অস্থিতিশীল রাখতে হলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না এটা বিশ্বাস করে পাকিস্তান।’ বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতে জঙ্গি কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য এদেশে ধর্মভিত্তিক জঙ্গিদের পছন্দের সরকারকে ক্ষমতায় রাখার ইচ্ছার কথাও আদালতে জানায় ইউসুফ বাট। সেদিন ইউসুফ ভাট আদালতকে বলে, ‘হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো আসে পাকিস্তান থেকে। গ্রেনেডগুলো পাকিস্তান থেকে জাহাজে করে চট্টগ্রামে আসার পর ঢাকায় পাঠানো হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় যে গ্রেনেড হামলা হয়েছে, তা পাকিস্তান থেকে তাজউদ্দিনের কাছে আসে। তাজউদ্দিনকে গ্রেনেডগুলো পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-জিহাদি ইসলামী (টিজেআই) নেতা মুজাফফর শাহ তাকে দিয়েছিল। এসব গ্রেনেড পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ব্যবহার করে।’ সেদিন জবানবন্দিতে ইউসুফ ভাট আরও জানায়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে পাকিস্তানি জঙ্গিরা নির্বিঘ্নে বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করতো।

মামলার তদন্তে উঠে আসে- গ্রেনেড হামলা চালানোর জন্য সদস্য সংগ্রহের মূল সমন্বয়ের দায়িত্ব ছিল জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের। বাংলাদেশ থেকে যেসব ব্যক্তি তৎকালীন সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়েছিলেন, তাদের বেশির ভাগই এ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়। এ সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকে পাকিস্তানের বিভিন্ন মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছিল। গ্রেনেড হামলার অস্ত্রের চালানের বিষয়ে পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা থাকার বিষয়টি মামলার তদন্তে আরো স্পষ্ট হয়েছে। মুফতি হান্নান ও ইউসুফ ভাটসহ গ্রেপ্তার হওয়া অন্যান্য জঙ্গির জবানবন্দি থেকে জানা যায়, হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিদের ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অস্ত্র-গ্রেনেড পাঠানোর কাজেও যুক্ত করেছিল পাকিস্তান। আর এতে যুক্ত ছিল বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মুফতি হান্নান, কাশ্মীরের হিজবুল মুজাহিদীনের নেতা ইউসুফ ওরেফ মাজেদ বাটসহ অনেকে। সেরকম একটি চালানে পাকিস্তান থেকে আসা আর্জেস গ্রেনেডের একটা অংশ ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর হামলায় ব্যবহার হয়েছে। হিযবুল মুজাহিদীন নেতা আব্দুল মাজেদ ও তেহরিক-ই জিহাদী ইসলামী-টিজেআই এর নেতা মুজাফফর শাহের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আইএসের সহযোগিতায় বাংলাদেশে এইসব অস্ত্রশস্ত্র এসেছে এমন মন্তব্য করেছিলেন এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান।

ইতিহাসের বর্বরোচিত ওই গ্রেনেড হামলার বর্ণনা দিয়ে মামলার অন্যতম আসামি শেখ আব্দুস সালাম তার জবানবন্দীতে বলে, ‘পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন হিজবুল মুজাহিদিন-এর আব্দুল মজিদ বাটের দেওয়া গ্রেনেড ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলার সময় ব্যবহার হয়েছে। সে আরও জানায়, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে বসে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তার মুখ থেকে উঠে আসে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ও সহযোগিতায় হামলার পরবর্তী সময়ে মাওলানা তাজউদ্দিনকে পাকিস্তানে পাঠানোর কথা। ২১ আগস্ট গ্রেনেড মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রেও উল্লেখ আছে গ্রেনেড হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও গ্রেনেড সরবরাহকারী মাওলানা তাজউদ্দিন ছিলেন বিএনপির উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ছোট ভাই। ২০০৬ সালের ১০ অক্টোবর তারেক রহমানের নির্দেশে মাওলানা তাজউদ্দিন-সহ খালেদা জিয়ার ভাতিজা ও তার এপিএস-১ সাইফুল ইসলাম ডিউককে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে জানানো হয়েছিল পুরো বিষয়টি।

হামলার পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার মূল আসামিদের আড়াল করতে ‘জজ মিয়া নাটক’ সাজানোর চেষ্টা করলে তা গণমাধ্যমের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। প্রথম আলোর শিশির ভট্টাচার্য এই ‘জজ মিয়া নাটক’কে আষাড়ে গল্প বলে উল্লেখ করেছিলেন। আর এতে ক্ষেপে গিয়ে তৎকালীন স্বররাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর বলেছিলেন, ‘আষাড়ে গল্প বলেছেন আপনরা, আমরা সত্য প্রকাশ করে প্রমাণ করে দেবো, কীভাবে সীমান্তের উপার থেকে [ভারত] পরিকল্পনা হয়েছে, কীভাবে সন্ত্রাসী সুব্রত্র বাইন ও তার সঙ্গীরা এই গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে।’ বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট নিজেদের অপকর্ম বরাবরের মতো অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পাকিস্তানকে আড়াল করার জন্য ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনাকে মিথ্যাভাবে ভারতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিলো। হামলায় পাকিস্তানের ভূমিকার ইংগিত দিয়ে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান একটি লেখা লিখেছেন, ‘মনে পড়ে, একুশে আগস্টের ঘটনার পরপর তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত সেই সময় আমাকে বলেছিলেন, এটা আওয়ামী লীগেরই কাজ। এই ঘটনায় তারাই তো লাভবান হবে। তারা সহানুভূতি পাবে। এমনকি ঘটনার আগের মুহূর্তে শেখ হাসিনা, আইভী রহমানকে মঞ্চে ডেকে নিতে চেয়েছিলেনÑ সে কথাও তিনি বলেছিলেন। শেখ হাসিনার জ্ঞাতস্বরে এই ঘটনা ঘটেছে বলেও ওই পাকিস্তানি কূটনৈতিক বলেছিলেন। ’

ঠাণ্ডা মাথায় একটি জঘন্য হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা এবং দেশি-বিদেশি জঙ্গিদের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের নীলনকশা করে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করাই ছিলো ঘাতক বিএনপি-জামায়াত এবং তাদের গডফাদার পাকিস্তানের মূল লক্ষ্য। ওই বর্বরোচিত হামলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্মমভাবে নিহত হন। পরম করুণমায়ের ইচ্ছায়, বাংলাদেশের মানুষের অকৃত্রিম দোয়া এবং দলীয় নেতাকর্মীদের অপরিসীম ভালোবাসায় সেদিন জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রাণে রক্ষা পান। বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে রূপান্ত করা ও পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত করার দেশি-বিদেশি সেই চক্রান্ত সফল হয়নি। কিন্তু সেই ষড়ন্ত্র থেমে নেই। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ও জননেত্রী শেখ হাসিনাকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে শপথ নিতে হবে। শপথ নিতে হবে লক্ষ্য কোটি শহীদের রক্তের ঋণ রক্ষায়। শপথ নিতে হবে দলের হাজার হাজার শহীদ নেতাকর্মীর নামে। পাকিস্তানিদের এদেশীয় দোসর বিএনপি-জামায়াত ও ছদ্মবেশীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক এই লড়াইয়ে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া যাবে না।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলােদেশ ছাত্রলীগ, চট্টগ্রাম মহানগর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত