প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এক ছাদের নিচে সব সেবা বহুদূর

ডেস্ক রিপোর্ট : ভারী যন্ত্রপাতি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মাজেদা গ্রুপের সহকারী ব্যবস্থাপক এইচ এম আরিফুল ইসলাম। গত রবিবার তাঁকে পাওয়া গেল রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ের নিচতলায় অভ্যর্থনাকক্ষে। বিডায় আসার কারণ জানতে চাইলে আরিফুল ইসলাম জানান, যেকোনো যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনার আগে আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে আমদানি নিবন্ধন সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

এই সনদ নেওয়ার আগে বিডার অনুমতিপত্রও নিতে হয়। এই অনুমতিপত্র নেওয়ার জন্য কারোনাকালে ঝুঁকি নিয়ে বিডা কার্যালয়ে সশরীরে আসা। এরই মধ্যে তাঁকে দুই দিন আসতে হয়েছে। এই সনদ পেতে আরো এক সপ্তাহ লেগে যাবে। অথচ আরিফুলসহ সব বিনিয়োগকারীকে অনলাইনে আমদানি নিবন্ধন সনদ দিতে গত ১৫ জানুয়ারি আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছিল বিডা কর্তৃপক্ষ। সাত মাস পেরিয়ে গেলেও সেবাটি অনলাইনে চালু করতে পারেনি আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। ফলে এক সপ্তাহ ধরে কাগজপত্র নিয়ে বাসা থেকে বিডা অফিস, সেখান থেকে গুলশানে নিজ অফিসে দৌড়ঝাঁপ করছেন আরিফুল ইসলাম।

একই দিন কথা হয় এনার্জেসিস পাওয়ার করপোরেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক আজিজ উল্লাহর সঙ্গে। বিডা অফিসে তিনি গেছেন নতুন একটি কম্পানির নিবন্ধন করাতে। অথচ এই সেবাটিও অনলাইনে দেওয়ার কথা বলছে বিডা। আরো কিছু কাগজপত্র জমা দেওয়ার কথা বলা হয় তাঁকে। একটি প্রিন্টিং প্রেসে কর্মরত সোহাগকে শুধু একটি কাগজ জমা দেওয়ার জন্য বিডার অভ্যর্থনাকক্ষে প্রায় তিন ঘণ্টা বসে থাকতে দেখা গেছে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ টানতে চার বছর আগে বেসরকারীকরণ কমিশন ও বিনিয়োগ বোর্ডকে একীভূত করে সৃষ্টি করা বিডা কার্যালয়ে সেবাগ্রহীতাদের মাত্র এক দিনের চিত্র এটি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, ওয়ানস্টপ সার্ভিস বা একই ছাদের নিচে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের সশরীরে বিডা অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না।

ব্যবসা শুরুর আগে একজন ব্যবসায়ীর জন্য ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া অত্যাবশ্যক। কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া একজন ব্যবসায়ী যাতে অনলাইনে ট্রেড লাইসেন্স পেতে পারেন, সে জন্য ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর বিডার সঙ্গে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটিও ট্রেড লাইসেন্স সেবা অনলাইনে দিতে পারছে না তিনটি সিটি করপোরেশন। দুই বছরেও অনলাইনে একটি ট্রেড লাইসেন্স সেবা দিতে না পারায় বিভিন্ন সভায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম।

বিডার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তিনটি সিটি করপোরেশন দুই বছর আগে যখন বিডার সঙ্গে সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল, তখন তাদের মধ্যে সেবা দেওয়ার বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে সেই আগ্রহে ভাটা পড়ে। এর কারণ হতে পারে, সিটি করপোরেশন মনে করছে—এই সেবা যদি অনলাইনে চলে যায়, তাহলে তাদের ক্ষমতা কমে যাবে। বছরের পর বছর ধরে যে সেবাটি তারা দিয়ে আসছে, অনলাইনে চলে

গেলে এই সেবা তারা আর দিতে পারবে না। এতে কেউ কেউ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব দিক বিবেচনা করে তিন সিটি করপোরেশনে ট্রেড লাইসেন্স অনলাইনে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিনিয়োগকারীদের একটি ট্রেড লাইসেন্সের জন্য পদে পদে হয়রানি হতে হয়।

এ ব্যাপারে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, অনলাইনে সেবা দিতে তিনটি সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পদ্ধতিতে সমস্যা হচ্ছে। ফলে তারা ট্রেড লাইসেন্স সেবা দিতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের সিস্টেম পুরোপুরি প্রস্তুত। কিন্তু সরকারি অন্য দপ্তরগুলো এখনো অনলাইন সেবা দেওয়ার মতো প্রস্তুত নয়।’

এক দশক ধরে দেশে গড়ে ৬ শতাংশের ওপরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও বিনিয়োগ বলতে গেলে স্থবির। ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া এমনকি মিয়ানমারেও যে হারে প্রতিবছর বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে, তার ধারাকাছেও যেতে পারছে না বাংলাদেশ। প্রতিবছর গড়ে ৩০০ কোটি ডলারের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে দেখা গেছে, ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। যেকোনো দেশে ব্যবসা শুরুর আগে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিশ্বব্যাংকের ব্যবসা সহজীকরণ সূচককে আমলে নিয়ে থাকে।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে জমির প্রাপ্যতা, সরকারি দপ্তরে পদে পদে হয়রানি এবং সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিকে দায়ী করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এসে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা তৈরিতে জমি পাওয়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়া, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা নিতে গিয়ে একজন বিনিয়োগকারীকে যেভাবে হয়রানি হতে হয়, তাতে অনেকে হতাশ হয়ে দেশ ছেড়ে অন্যত্র বিনিয়োগ করেন।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে মিয়ানমার, ফিলিপাইনের মতো বাংলাদেশেও একটি ওয়ানস্টপ সার্ভিস বা একই ছাদের নিচে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সরকার দুই বছর আগে ওয়ানস্টপ সার্ভিস আইন করে এবং সেই আইনের ওপর ভিত্তি করে এ বছর একটি বিধিমালাও চূড়ান্ত করেছে।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেবাকে কার্যকর করতে চাইলে অবশ্যই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নজরদারি করতে হবে। একই ছাদের নিচে একজন ব্যবসায়ী সব ধরনের সেবা পান কি না তা নিয়মিত দেখতে হবে।

বিডা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, একজন বিনিয়োগকারীর জন্য পরিবেশের অবস্থান ছাড়পত্র নেওয়া, পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া নবায়ন, ইআইএ অনুমোদন সেবা জরুরি। এসব জরুরি সেবা পাওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত বিডার সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের সমঝোতা হয়নি। কলকারখানা প্রতিষ্ঠান ও পরিদর্শন অধিদপ্তরের সব ধরনের সেবাও অনলাইনে দেওয়া ঝুলে আছে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের আওতায় অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স, লাইসেন্স নবায়ন, বহুতল ভবনের অনাপত্তি সনদও অনলাইনে দেওয়ার কথা। কিন্তু একজন ব্যবসায়ী এসব সেবা কবে নাগাদ পাবেন, তা নিশ্চিত নয়। যদিও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, আগামী বছরের মধ্যে সব ধরনের সেবা অনলাইনে নিয়ে আসতে পারবেন।কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত