প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রাজিয়া সুলতানা জেনি: স্পুটনিক-৫ ভ্যাকসিন? না স্পুটনিক মোমেন্ট-২?

রাজিয়া সুলতানা জেনি: ভ্লাদিমির পুতিন মশাই বেশ ঘটা করে তার দেশের ভ্যাকসিন সম্পর্কে জানান দিলেন। বললেন, ফেজ ৩ শেষ না হওয়া সত্ত্বেও এই ভ্যাকসিনকে তিনি নিজ দেশে ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছেন। নাম রেখেছেন স্পুটনিক-৫। ভ্যাকসিন দৌড়ে তার দেশকে প্রথম করবার শখ। ভ্যাকসিন অনুমোদনের নিয়ম কানুন ভেঙে কাজটা করার অন্যতম কারণ, বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয়া। ব্যাপারটা সফলই বলতে হবে। আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। তবে এখানে বেশ কিছু ‘কিন্তু’ আছে। পশ্চিমা বিশ্ব এই ভ্যাকসিনকে এখনই ‘ব্যবহারযোগ্য ভ্যাকসিন’ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। অন্যদিকে রাশিয়া জানিয়েছে, তারা প্রডাকশনে চলে গেছে। সেপ্টেম্বর প্রথম ব্যাচ চলে আসবে। দুটো ডোজ দিতে হবে। যে পরীক্ষা নিরীক্ষা তারা করেছেন, তাতে দেখা যাচ্ছে, এই ভ্যাকসিনে অ্যান্টিবডি বেশ ভালোই তৈরি হচ্ছে শরীরে। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ^ একে মান্যতা দিচ্ছে না কেন? ব্যাপারটা কি শুধুই ইগো টাসল? স্পুটনিক মোমেন্ট পার্ট টু? স্পুটনিক মোমেন্ট মনে আছে? সেই ১৯৫৭ তে যখন প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠালো রাশিয়া। আমেরিকার অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে দিল? এর অনেস্ট উত্তর হচ্ছে, ‘জানি না’। যা করতে পারি, তা হচ্ছে ঘটনার পেছনের ঘটনা নিয়ে স্পেকুলেশান। ‘কেন করল কাজটা?’ কমবেশি সবাই এই কাজটাই করছে। আমেরিকা আর তার সঙ্গীরা রাশিয়ার বিপক্ষে আর আমেরিকার বিপক্ষের দেশগুলো? মজা এখানেই। এরা সরাসরি বলছে না ভ্যাকসিনটা কাজের না, বলছে, ‘এতো সন্দেহ করার কী আছে?’ মূলত এই হচ্ছে অবস্থা।

তো, ভ্যাকসিন কাজের না অকাজের সেটা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে ভ্যাকসিন কী? সোজা উত্তর হচ্ছে, ভ্যাকসিন হচ্ছে এমন এক জিনিস, যা দিয়ে শরীর ছোট খাট একটা ভাইরাস আক্রমণ ঘটানো যায়। উদ্দেশ্য? উদ্দেশ্য হচ্ছে শরীরকে চিনিয়ে রাখা, ‘মামা, এই হচ্ছে ভাইরাস। পরের বার যদি এমন কিছু দেখতে পাও, কোনো আলাপ হবে না, প্রথম ধাক্কায়ই শেষ করে দিবা।’ এখন কথা হচ্ছে এই চেনানোর কাজটা কীভাবে করা যায়। সোজা উপায় হচ্ছে ভাইরাসকে মেরে সেই ভাইরাস শরীরে ঢুকিয়ে দেয়া। এককালে এভাবেই চালানো হতো কাজটা। ধীরে ধীরে টেকনোলোজি উন্নত হলো। এদিকে দেখা গেলো, মৃত ভাইরাস ঢুকালে যে প্রটেকশান পাওয়া যায়, তার আয়ু বেশ কম, আর ক্ষমতাও কম। অনেক সময় বুস্টার ডোজ দেয়া লাগে। সো, নেক্সট চেষ্টা হিসেবে আসল ‘লাইভ অ্যাটেনিউয়েটেড ভ্যাক্সিন’ অর্থাৎ ভাইরাস মামাকে জিন্দা রাখা হবে, কিন্তু সেই বাপুরাম সাপুড়ের মতো, ‘দাঁত নাই, চোখ নাই’ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ এই ভাইরাস রোগ তৈরির ক্ষমতাবিহীন হবে। এতে উপকার হচ্ছে, প্রটেকশান একটু লম্বা সময়ের জন্য হয়, আর বুস্টার ডোজ অনেক ক্ষেত্রে লাগে না। সময় এগোল। আসল নতুন আর সেক্সি টেকনোলজি। বিজ্ঞানীরা দেখল, ভাইরাস চেনানোর জন্য মূল ভাইরাসকে শরীরে ঢোকানোর তো দরকারই নাই।

ভাইরাসের যে অংশ দেখে শরীর চিনে ফেলে, ‘মামা হাজির’ শুধু সেই অংশকে শরীর ঢোকালেই তো হয়। শুরু হল নতুন টেকনোলজি, ‘রিকমবিন্যান্ট টেকনোলোজি’। এক ফাঙ্গাসকে বলা হল, মামা, একটু ভাইরাস প্রোটিন বানায়ে দাও তো। ফাঙ্গাস বলল, নো প্রবলেম। জেনেটিক সিকোয়েন্স দাও। ব্যাস তৈরি হয়ে গেল হেপাটাইটিস ভ্যাক্সিন। এবার? ইয়েস। এবার এলো আরও সেক্সি টেকনিক। সেটা বুঝতে হলে বুঝতে হবে ভাইরাসে আসলে থাকি কি? অনেক কিছুই থাকে, তবে আলোচনার সুবিধার জন্য কেবল দুটো জিনিস নিয়েই বলবো। একটি হচ্ছে, খোলস বা এনভেলাপ। আর এর ভেতরে থাকে নিউক্লিয়িক এসিড। যা দুরকম হতে পারে, ডিএনএ আর আরএনএ। এবার আসি কোভিড ১৯ প্রসঙ্গে। এটি একটি আরএনএ ভাইরাস। অর্থাৎ এর খোলসের ভেতরে থাকা নিউক্লিয়িক এসিড হচ্ছে আরএনএ। বিজ্ঞানীরা এখন এই আরএনএ সিকোয়েন্সিং করে ফেলতে পারে মুহূর্তেই। আর খুঁজে বের করতে পারে, এই আরএনএ র কোথায় কোথায় জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল আছে।

জেনেটিক ম্যাটেরিয়াল মানে হচ্ছে পুরো আরএনএ র চেইনটার কিছু অংশের কাজ হচ্ছে প্রোটিন তৈরি করা, আর বাকী অংশের তেমন কাজ নেই। তো কোভিড১৯ এর আরএনএ র যে অংশ স্পাইক প্রোটিন তৈরি করে, সেই অংশকে আলাদা করে কেটে নেয়া বিজ্ঞানীদের জন্য এখন কোন ব্যাপারই না। সো কেটে ফেলল। এবার? এবার কাজ হচ্ছে কোনো এক ভাইরাসের খোলসের ভেতরে সেই ভাইরাসের জিনের সঙ্গে এই জিনকে স্ট্যাপ্লার দিয়ে কানেক্ট করে দেয়া। এটাও বেশ সোজা একটা কাজ। তৈরি হয়ে গেলো ভ্যাকসিনের জন্য ভাইরাস। এই ভাইরাসের রোগ তৈরির ক্ষমতাও নাই, আবার স্পাইক প্রোটিন তৈরির জিনও আছে, ফলে শরীর ঢুকে গাদা গাদা প্রোটিন তৈরি করবে, যা দেখে শরীর চিনে রাখবে, আর অ্যান্টিবডি তৈরি করে রাখবে। সঙ্গে তৈরি করবে মেমোরি টি-সেল। এদের কাজ হচ্ছে, পরে আবার এই ভাইরাসের দেখা মিললে, দ্রুত অ্যান্টিবডি তৈরি করা। এই মুহূর্তে বাজারে যেসব ভ্যাকসিন আছে, তা মূলত এই কয়টি গ্রুপের ভেতরেই পরে। ভারতের তৈরি ভ্যাকসিনটি হচ্ছে কিলড ভ্যাকসিন। ফলে সেফটি নিয়ে খুব একটা মাথা না ঘামালেও চলবে। মূল চিন্তা, কাজ করবে কিনা। অর্থাৎ পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি করবে কিনা, আর সেটা ভাইরাসকে মেরে ফেলতে পারবে কিনা। বাজারে বাকি যেগুলো আছে, সেসব নিয়ে আলাপ করতে গেলে লম্বা হয়ে যাবে লেখা, তাই চলে আসি রাশান ভ্যাকসিনে। স্পুটনিক ৫ এ। এটাও কিলড ভ্যাকসিন। সো সেফটি নিয়ে সমস্যা হওয়ার কথা না। তারপরও হতে পারে।

আর সেফটি ব্যাপারটা দেখা হয় সাধারণত : ফেজ ওয়ান ট্রায়ালে। সেখানে ৩০ থেকে ৮০ জন ভলান্টিয়ারের ভেতরে গবেষণা চালানো হয়। দেখা হয়, এই টিকা দেয়ার পরে এদের ভয়ানক কোন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না। হলে মিশন অ্যাবর্টেড। আর না হলে, গো অ্যাহেড। রাশিয়া বলছে, ফেজ ওয়ান তারা করেছে। সমান্য জ্বর ছাড়া আর কোনো সমস্যাই হয়নি। এর পরের ধাপ হচ্ছে ফেজ টু। এবার ভলান্টিয়ার হতে হবে ১শ’র উপরে হাজারের নিচে। এখানে মূলত দেখা হয়, এফিকেসি। অর্থাৎ, ভ্যাকসিন ঠিকঠাক মতো অ্যান্টিবডি তৈরি করছে কি না। ব্যাপারটা প্রথম ফেজেও দেখা হয়, তবে যেহেতু ভলান্টিয়ার কম থাকে, তাই এই ফেজে পাওয়া তথ্যকে গ্রহণযোগ্য ধরা হয় না। যাই হোক, দ্বিতীয় ফেজে যদি দেখা যায়, অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে, আর সেই অ্যান্টিবডি ল্যাবরেটরিতে সেল কালচারে ভাইরাসকে মেরেও ফেলছে, তাহলে, এগেইন, গুড গোয়িং। শুধু তা ই না, এখানে দেখা হবে বিভিন্ন বয়সের মানুষ কিভাবে রেসপন্ড করছে। বৃদ্ধরা কম কিনা, নারী পুরুষের ক্ষেত্রে আলাদা কিনা ইত্যাদি। দ্বিতীয় ফেজ পার করলে আসে তৃতীয় ফেজ। এখানে ভলান্টিয়ার হাজারের উপরে। পঞ্চাশ হাজারও হতে পারে। ভ্যাকসিন দৌড়ে এগিয়ে থাকবার জন্য অনেক দেশ যেটা করেছে, তা হচ্ছে ফেজ এক আর দুই কে একসঙ্গে করে দিয়েছে। কেউ ফেজ দুই আর তিনকে একসঙ্গে করে দিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে এই ফেজ তিন চালাতে হয় প্রায় মাস ছয়েক। শুধু তা ই না, অপেক্ষা করতে হয়, ভাইরাস আক্রমণের।

অর্থাৎ, শরীর অ্যান্টিবডি হয়তো তৈরি হয়েছে, কিন্তু মূল ভাইরাস আক্রমণ করলে, সত্যি সত্যিই কি ভাইরাসকে মারতে পারবে এই অ্যান্টিবডি? সে পরীক্ষা হাতেনাতে করতে তাই ফর্মুলা হচ্ছে, যেসব দেশে এই ভাইরাসে সংক্রমণ বেশি, সেসব দেশে ফেজ তিন এর পরীক্ষা চালানো। যে কারণে ব্রাজিল আর দক্ষিণ আফ্রিকায় শুরু হয়েছে অক্সফোর্ড ভ্যাকসিনের পরীক্ষা। এবার আসি রাশিয়ান ভ্যাকসিনের প্যাঁচে। পুতিন মামা প্রথম ফেজ তো নিয়ম মেনেই করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় আর তৃতীয় ফেজ করেননি। করবেন না, এমন বলেননি। যা করেছেন ,তা হচ্ছে, ফেজ তিন শেষ হওয়ার আগেই, ভ্যাকসিনকে ব্যাবহারের অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন। যুক্তি হচ্ছে, সেফটি তো দেখা হয়েছেই। প্রাথমিক পরীক্ষায় ইফেক্টিভ মনে হয়েছে। সেটা সত্যি কি না, তা হাতে নাতেই পরীক্ষা হোক। এই মুহূর্তে যেহেতু কোন ভ্যাক্সিন নাই, তাই ভ্যাক্সিন ছাড়া রোগের মোকাবেলা করার চেয়ে ভ্যাক্সিন নিয়ে তৈরি থাকি। কাজে দিল ভালো, আর না হলে, নতুন কোনো ক্ষতি তো আর হচ্ছে না। বরং কাল যদি নতুন কোন ভ্যাকসিন কার্যকরী প্রমাণ হয়, তখন সেটা নেবো। এই যুক্তি মানাও যায়, আবার না ও মানা যায়। গণতান্ত্রিক দেশ হলে হয়তো অনেকেই মানতো না। বলতো, আগে সব পরীক্ষা সারো, তারপরে তোমার ভ্যাকসিন নেবো।

কিন্তু পুতিনের দেশ তো পুতিনের দেশ। ফলে সরকারি আদেশ হলে হয়তো অনেকেই এই ভ্যাক্সিন নিতে বাধ্য হবে। এতে একটা কাজ অন্তত হবে, একটা ফেজ তিন ট্রায়াল হয়ে যাবে। আর অন্য দেশের ক্ষেত্রে? কেউ যদি রাশান টেকনোলজির উপর অগাধ আস্থা রেখে ভ্যাক্সিনটা নিতে চান, নেবেন। আর না নিতে চাইলে, কেউ জোর করছে না। তো শেষ কথা হচ্ছে, রাশিয়া ভ্যাকসিন তৈরির সব নিয়ম ফলো করেনি, এটাও যেমন সত্য, তেমনি, এ ভ্যাক্সিন কার্যকরী হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এটাও সত্য। অন্তুত এটা অকার্যকর, এমনটা বলা এই মুহূর্তে বোধহয় ঠিক হবে না। পুরো ব্যাপারটায় রাজনীতি আছে, সন্দেহ নেই। কোল্ড ওয়ারের ছায়াও অনেকে দেখছেন, বিশেষ করে এর নামকরণে যেভাবে স্পেস রেসের স্মৃতি টেনে নিয়ে আসবার চেষ্টা হয়েছে, তা দেখে অনেকেই এটাকে পলিটিক্যাল ভ্যাকসিন বলছেন। যাইহোক, ভ্যাকসিনটা সত্যিই কার্যকরী, না ভ্যাকসিন রেস জেতার জন্য পলিটিক্যাল স্ট্যান্ট, তা হয়তো আর কিছুদিনের ভেতরেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। ততোদিন হয়তো এই ভ্যাকসিন একটা বিতর্কের বস্তু হয়েই থাকবে।

সর্বাধিক পঠিত