প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শেখ মিরাজুল ইসলাম: স্মৃতিতে মুর্তজা, প্রীতিতে মুর্তজা

শেখ মিরাজুল ইসলাম: Imagination is more important than knowledge, because imagination is infinite. – Albert Einstein. মনে আছে জুন মাসের সেই সন্ধ্যা ৬ টা ১৯ মিনিটের কথা। মুর্তজা বশীর ফোন করে জানালেন, আমার গোঁফটা মোটেও মানাচ্ছে না। ফেসবুকে তিনি সেটা দেখেছেন। তার ঠিক দশ মিনিট আগে আমি তা বিসর্জন দিয়েছি। তাঁকে জানালাম। তিনি আশ^স্ত হয়ে লাইন কেটে দেওয়ার আগে মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তাহলে ওই কাল সকাল ১১ টায় আসবে, তাই না?’ প্রায় তিন মাস আগে কথা প্রসঙ্গে আমার পোর্ট্রেট ড্রয়িং করে দেবেন বলেছিলেন। কথাটি আমি বিশ্বাস করলেও তা আদৌ সম্ভব কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। এর কারণও আছে। আমি জানি মুর্তজা কথা দিলে কথা রাখেন। কিন্তু এই সময়ে তাঁর পরিস্থিতি ভিন্ন।

প্রথমত, এখন শিল্পীর বয়স তখন ৮৪’র কোঠায়। কাউকে বসিয়ে পোর্ট্রেট আঁকার মতো মানসিকতা এখন তাঁর নেই বললেই চলে। এর উপর শরীর এখন পুরোই বিশ্রামনির্ভর। সবসময় অক্সিজেন সিলিন্ডার সাথে রাখতে হয়। হার্টের অবস্থা নমনীয়। আরও কিছু বয়সজনিত সমস্যা তাঁকে চিন্তিত রাখে। বড় ক্যানভাস নিয়ে বসার সময় নেই তাঁর। ড্রয়িং আর প্যাস্টেল ছাড়া এই বয়সে বেশি ধকল সহ্য হয় না। চোখেও খানিকটা সমস্যা হয়। রেঁনোয়া তাঁর শেষ বয়সে একই দশা পার করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ। এটাই তাঁকে ইদানীং বেশি কাবু করে রাখে। তাঁর বড় কন্যা যথাসাধ্য তাঁকে আগলে রাখেন … তারপরও মুর্তজার টেনশন কমে না।

তৃতীয়ত এবং অন্যতম আরেকটা কারণ হলো, আঁকাআঁকির ক্ষেত্রে শিল্পীর ‘নিজস্ব মুড’। প্রথম দুটি কারণ অনুকূলে থাকলেও এই শেষ ব্যাপারটি মনের সাথে না মিললে কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাই মুর্তজা বশীর স্যার যেদিন সময় দিয়ে আমাকে আসতে বললেন, স্বাভাবিকভাবেই খুশির বদলে টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম। গত শতকে পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট – কিউবিস্টÑ বিমূর্ত ঘরাণার শিল্পীদের কাজের সাথে পরিচিতি থাকলে মুর্তজা বশীরের কাজ সম্পর্কে ধারণা করা যাবে। বিশেষ করে পোর্ট্রেট স্টাডিতে তাদের মুন্সিয়ানার ক্ষেত্র ভিন্ন।

হুবহু অনুকরণ বা ফটোগ্রাফিক ইমেজ তুলে ধরার রীতি সেই পিকাসোর আমল হতে শিল্পীরা বর্জন করে আসছেন। হুয়ান গ্রিস, মার্ক শাগাল, মাতিস, কান্দিনাস্কি, ফিলিপ গাস্টন, জেমস এনসর, ম্যাক্স ওয়াবার, ম্যাক্স বেকম্যান, ফ্রান্সিস বেকন এঁরা মূর্ত হতে বিমূর্ত ধারাতেই বেশি এঁকে খ্যাতি পেয়েছেন। তাঁদের আঁকা পোর্ট্রেটগুলোও তাই। আমাদের দেশের বিমূর্ত ঘরাণার প্রধানতম শিল্পী মুর্তজা বশীরের পোর্ট্রেট স্টাডি একান্ত তার নিজস্বতায় একক। শিল্প রসিকদের কাছে তাঁর ড্রয়িং-এর মহিমা ভিন্নতর। তিনি স্কেচে তাঁর মডেলকে অনুকরণ করেন না, তাকে ‘প্রকাশ’ করেন। রক্ত-মাংসের চেহারার বাইরে ভিন্ন কিছু ভঙ্গির ক্ষেত্র তুলে ধরেন বাকি দর্শকদের সামনে। কমার্শিয়াল বা বাজারি পোর্ট্রেট-চিত্রী যে তিনি নন, তা বলাই বাহুল্য।

প্রায় এক ঘণ্টা সিটিংয়ে ‘এ-ফোর’ সাইজের কাগজে আমার মোট তিনটি পোর্ট্রেট করলেন মুর্তজা। প্রথম দুটো তাঁর পছন্দ হলো না। সাইন করলেন না। একটা নিজের কাছে রেখে দিলেন। বাকি স্বাক্ষর বিহীন ‘বাতিল’টা সাথে করে নিয়ে এলাম এই শর্তে- সেটা ফেসবুকে দেওয়া যাবে না। শেষেরটা আঁকার পর হাল্কা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন, এটা আমার মনের মতো হয়েছে। এটা যে আমার কাজ তা স্বাক্ষর না দিলেও বোঝা যেতো ..।’ ড্রয়িংটা স্বাক্ষর দিয়ে হাতে তুলে দিলেন। পোর্ট্রেট আঁকলে কিছু দক্ষিণা দিতে হয়Ñ এটাই নিয়ম। আমি তাঁকে কদমবুচি করলাম। আমাদের শিল্প-জগতের এই কিংবদিন্তকে এর চেয়ে বেশি দেবার ক্ষমতা আমার আপাতত নেই।

পরিচিতি : চিকিৎসক ও লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত