প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মহারাষ্ট্রনায়কের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ নিয়ে দার্শনিক ভাবনা

ওয়ালিউর রহমান : শতাব্দীর মহানায়ক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম পদার্পন জেনেভাতে ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে। তিনি লন্ডন থেকে অস্ত্রোপচারের পর ওখানে আসেন স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এর আগে অবশ্য অনেক দেশ থেকেই বঙ্গবন্ধুকে অস্ত্রোপচারের পর কনভেলেসেন্স এর জন্য দাওয়াত এসেছিলো। অনেক কারণে ওই সব দেশে না গিয়ে বঙ্গবন্ধু নিউট্রাল সুইজারল্যান্ডেই আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। অনেক চিন্তা করে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদি বলা হয় যে, আমরা শুধু আনন্দিত হয়েছিলাম তাহলে এটুকুু অল্প বলা হবে। আমরা সর্বশক্তিমানের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলাম আমরা সবাই একটু সুযোগ পাব এই বরেণ্যকে আমাদের মাঝে পাব অল্প কিছু সময়ের জন্য। বেগম সাহেব ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, শেখ কামাল ও শেখ জামাল। শেখ রাসেলও ছিল সঙ্গে। আজকের জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিল তার ছেলে ছোট্ট শিশু জয়। আরও ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ হানিফ, প্রফেসর নূরুল ইসলাম, প্রয়াত আবুল হাশেম, প্রয়াত জনাব বাদশাহ এবং আব্দুল গাফফার চৌধুরী । নূরুল ইসলাম অনু, প্রয়াত রফিকুল্লাহ চৌধুরী এবং রাফিয়া আখতার ডলী এম.পিও ছিলেন সঙ্গে।

১৯৭৩ এর সেপ্টেম্বর মাসে অটোওয়াতে কমনওয়েলথ প্রধানদের মিটিং এ যোগদানের পর বঙ্গবন্ধু আবার জেনেভায় আসলেন। মোট চারদিন ছিলেন। এবার তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে প্রথম মিটিং করলেন জেনেভাতে। যাক সে ব্যাপারে আরেকবার লেখা যাবে। এখন আমরা ফিরে যাই ‘৭২ এর আগস্ট মাসে। সুইস পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি আমাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় রাজনৈতিক এসাইলাম দিয়ে আমার কাজের অনেক সুবিধা করে দিয়েছিলেন। তার বিশেষ ব্যক্তি এবং পরবর্তীকালে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত ভিকটর উমব্রীয়ট আমাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অনেক সাহায্য করেছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন জনাব টিবর ভন সসান। বঙ্গবন্ধুর আসা ও থাকার ব্যাপারে জনাব গ্রাবার সাহেবের সঙ্গে এই দুজন আমাকে অনেক সাহায্য করলেন। স্বাধীনতার সময় বঙ্গবন্ধুর এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে সুইজারল্যান্ডের মিডিয়াগুলো খুব ভাল অবদান রেখেছিলো। কাজেই গ্রাবারের কাছে অনুরোধ করতেই তারা রাজি হলেন যে যতোদিন আমাদের মহান নেতার সুস্থ হতে সময় লাগবে ততোদিন আমরা তাদের আতিথেয়তা ভোগ করতে পারবো। এবং তাই হলো হোটেল লা রিজার্ভ লেক জেনেভা বা লেক লেমন এর পাশেই।
এই সুন্দর সুগঠিত হোটেলে বঙ্গবন্ধুর থাকার ব্যবস্থা হল। লেকের বরাবর যে সুইটটি ছিল সেখানেই বঙ্গবন্ধু থাকলেন। তিনি রুমে গিয়েই দরজার সামনে টেরাসে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং সামনে দেখতে পেলেন লেক লেমন। আরও দূরে উপরের দিকে চাওয়া পাহাড়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখ স্বচ্ছল হয়ে উঠল। তিনি আমার দিকে তাকালেন। বললেন, ‘আমাদের দেশেও কোনো বেশি সম্পদ নেই, এদের দেশেও নেই। কিন্তু এরা আজ পৃথিবীর মাঝে কতো ধনী দেশ। আমরাও তো এরকম হতে পারি। আচ্ছা এই দেশের সংবিধান আমাকে দিসতো। আচ্ছা আমাদের চট্টগ্রামকে আমারা জেনেভার মতো করতে পারি না। ওখানেও তো পাহাড় আছে, লেক আছে। সমুদ্রও তো আছে। উনি এর ভেতরেই তার সুইটে গিয়ে একটু ক্লান্তবোধ করলেন এবং বিশ্রাম করবেন বলে আমাদের জানালেন। আমি বেরিয়ে এসে আমার হোটেলের অফিস রুমে ঢুকলাম। ওখানে গিয়ে আমি আমার সেক্রেটারিকে বাইরে কোন কাজে পাঠালাম। আমি তখন চিন্তা করছি এক মহামানবের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হলো। দেখলাম তার চোখে কী মায়া, দেশের জন্য কী চিন্তা। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী দরদ। যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য তার ভাবনা। এই সময় থেকে বঙ্গবন্ধু আমাকে যে উদ্দীপনা দিলেন-দেশের জন্য এবং দেশবাসীর জন্য তা হয়ে রইল আমার সারা জীবনের পাথেয়, যা সঙ্গে করে সারা জীবন কাজ করেছি এবং করব।

বঙ্গবন্ধুর সৃশংস হত্যার পর আমি যখন ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক হিসাবে কাজ করি তখন স্বাধীনতা বিরোধীরা আমাকে ও.এস.ডি. বানিয়ে দিল। আমি কোর্টে গেলাম এবং আইনি সিধান্তের মাধ্যমে চাকরি ফিরে পেলাম। তবে জীবনের তিন বছর আট মাস হারালাম। জননেত্রী শেখ হাসিনা বললেন, আপনি এক্সটেনশন নিন। বললাম, না, আমি নেব না। তিনি জানতে চাইলেন আমি কেন এই সুযোগ নেব না। আমার সহজ উত্তর আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি স্বাধীনতা বিরোধীদের বৈষ্যমের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এটি থেকে যাক, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম এটি উপলদ্ধি করতে পারে। পরে আবার এই একই দল অন্য নামে ১৯৯৩ সালের ফেব্রæয়ারিতে আমাকে চাকরি থেকে অন্যায়ভাবে চক্রান্ত করে একটি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবসর দিয়েছিল। নিয়তির কি পরিহাস। থাক এসব কথা এখন।

বঙ্গবন্ধুকে রুমে রেখে আমার অফিস রুমে বসে ভাবছি জাতির পিতাকে কিভাবে একটু আয়েশ দেব, একটু আরাম দেব। কিন্তু সে সুযোগ বেশি হল না। এই মহামানবকে দেখার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষের ঢল পড়ে গেল। তারা দেখতে চায় মহান নেতাকে, চোখের এক ঝলক শুধু। শত শত সুইস আসতে থাকল। তারা দেখতে চাইল বাংলাদেশের নেতাকে – যিনি কিছুদিন আগেই পাকিস্তান জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। তিনি মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছেন – জেলের সামনে খোড়া হয়েছিল তার কবর। এর মধ্যে আসলেন প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান, ইউএনএইচসিআর এর তদানীন্তন প্রধান। তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী ও সদালাপী। তিনি বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গণ করার পর বললেন, আপনি শতাব্দীর মহামানব। আপনি আপনার চেষ্টা ও তিতীক্ষার মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশকেই সৃষ্টি করেননি আপনি পৃথিবীকে একটি মহৎ মানবতার নিদর্শন দিয়েছেন আপনার ত্যাগের মাধ্যমে।

এর আগেই সুইস রাষ্ট্রপ্রধান একটি ফুলের তোড়া পাঠালেন হোটেলে। তার পরপরই ফুল আসলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষ থেকে। তৎকালীন রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিনও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠালেন। এরপরে স্বয়ং জুলফিকার আলী ভুট্টোও ফুল পাঠালেন। এটাই শেষ নয়। হঠাৎ ভুট্টো সাহেবের ফোন এলো। ফোনে ছিলেন তদানীন্তন আইএসআই এর প্রধান গুল হাসান। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুই কথা বল, জিজ্ঞেস কর, এবং দেখ সে কি বলতে চায়। আমি গুল হাসানকে জানানোর পর তিনি বললেন ভুট্টো সাহেব শুধু আপনার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, তুই তাকে একটু ফোনে ধরে রাখ। আমি ভুট্টো সাহেবকে প্রায় পাঁচ মিনিট ফোনে দাঁড় করিয়ে রাখলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু ফোন ধরলেন এবং তাকে বললেন, তুমি রাজনীতি শেখনী। তোমাকে আমার কাছ থেকে রাজনীতি শিখতে হবে। আমি তোমাকে যা বলেছি সেটিই শেষ কথা। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং এটাই হবে আমাদের আগামী সম্পর্ক।

এদিকে সকাল সন্ধ্যা দুপুরেও চলছে মানুষের ভীড়। নিয়ন্ত্রন করতে স্বাগতিক দেশের সিকিউরিটি সার্ভিস এর সাহায্য নিতে হল। এর মধ্যে আসলেন জনাব আব্দুল মতিন। তিনি বঙ্গবন্ধুর উপর পরবর্তীকালে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। জনাব ইকবাল আতহারও আসলেন। একটি সুটকেসে কিছু আসবাবপত্র নিয়ে আসলেন, এটি তিনি বৈরুত থেকে এনেছেন। ডিসেম্বর ৫, ১৯৬৩ সালে মহান নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দ্দী সাহেবের আকস্মিক মৃত্যুর পর হোটেলে তার কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ছিল। এই স্বল্প সময়ে আমি অতি কাছ থেকে দেখলাম বঙ্গবন্ধু ও একান্ত আপনজনদের। আমি, আমার স্ত্রী শাহরুখ সবাই মুগ্ধ হয়ে গেলাম তাদের অমায়িকতা, ভদ্রতা ও শালীনতা দেখে। জননেত্রী শেখ হাসিনা সেই সময়েই তার বিশেষ ব্যক্তিত্বের নিদর্শন দেখিয়েছিলেন। তার উৎকর্ষ, মর্যাদাপূর্ণ চালচলন, সংবেদনশীলতা ও মানবতা সবাইকে মুগ্ধ করে। তার মনে কি কোনো আতঙ্ক ছিল? তিনি প্রায়ই বঙ্গবন্ধুর কামরায় গিয়ে তাকে একঝলক দেখে আসতেন। বলতেন আব্বাকে একবার দেখে আসি।’

লেখক : গবেষক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ হেরিটেজ ফাউন্ডেশন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত