প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফরিদ কবির: সাহিত্যে আসলে কে কার প্রতিদ্বন্দ্বী?

ফরিদ কবির:  আরো নির্দিষ্ট করে বললে একজন কবি কি আরেকজন কবির প্রতিদ্বন্দ্বী? না। কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ কবি ধরেই নেন, অন্য কবিরা তার প্রতিদ্বন্দ্বীই। ফলে, কেউ ভালো লিখলে অন্য কবিরা তাকে সহজে গ্রহণ করতে পারেন না। গ্রহণ করা তো দূরের কথা, তাকে সহ্যও করতে পারেন না। শুরু হয়, তার বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্র। একজন ভালো কবির বিরুদ্ধে দাঁড়ান অন্য ভালো কবিরা। একজন ভালো কবির বিরুদ্ধে দাঁড়ান অন্য গৌণ কবিরাও।

তারা হয় তাকে এড়িয়ে চলেন, নয় তাকে খারিজ করার চেষ্টা করেন। ফলে প্রতিভাবান কবিরাই এদেশে বেশি বিপদগ্রস্ত। তারাই বেশি নিঃসঙ্গ!

আমার মতে, কোনো কবিই অন্য আরেকজন কবির প্রতিদ্বন্দ্বী নন। তিনি কেবল নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। নিজেকেই তার ক্রমাগত ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হয়। তৈরি করতে হয় নিজের রাস্তা, নিজের ডিকশন, নিজস্ব ভাষা।

কিন্তু আমাদের কবিদের যখন নিজের দিকে তাকানোর সময়, তখন তারা কেবল চারপাশে তাকান, দেখতে চান, কে তাকে ছাড়িয়ে গেলো! অর্থাৎ কেউ একটু ভালো লিখলেই তখন অন্যরা বলতে শুরু করে দেন, নাহ, যতো ভালো বলছো, ততো ভালো সে নয়। তার কবিতায় তো অমুক বা তমুকের প্রভাব আছে! কিংবা, উনি তো ছন্দে লেখেন। ছন্দ কি কবিতা?
কিংবা বলেন উল্টোটা। সে তো ছন্দই জানে না! ভাষাটাও।

কবিতা তো ফুটবল বা ক্রিকেট না। সেখানে পরিসংখ্যান আছে। যিনি বেশি গোল বা রান করবেন, তিনিই সেরা। ফলে, একজনের সঙ্গে আরেকজনের আছে গোপন প্রতিযোগিতা। কবিতা কিংবা কবিতার বই বেশি হলেই যেমন আপনি বড় কবি নন, কবিতা বা কবিতার বই কম হলেও আপনি ছোট কবি নন। কবিতার ক্ষেত্রে কোনো পরিসংখ্যান চলে না। জীবনানন্দ দাশ তার পাঁচটি কবিতার বই দিয়েই জীবনানন্দ দাশ। বাকি রচনা ট্রাংকের ভেতরে থাকলেও।

কবির কাজ একদমই আলাদা। তিনি নতুন কিছু যোগ করতে পারছেন কি না, ভাষা কিংবা প্রকরণের ক্ষেত্রে তার নিজস্বতা কিছু আছে কি না, তিনি তার পাঠকের হৃদয়ে কোনো রকমের আলোড়ন জাগাতে পারছেন কি না- কবিকে এসব বিষয়ে কিছুটা সচেতন থাকতেই হয়। তাকে এগিয়ে থাকতে হয় নিজের সময় থেকেও।

কিন্তু আমাদের দেশে কবিদের অধিকাংশই মনের দিক থেকে সংকীর্ণ। তাদের কলিজা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। ঈর্ষাপরায়ণ। জ্ঞান অর্জনে অনাগ্রহী। অনেকেই আছেন খতিয়ে দেখতে চান না তার শক্তির জায়গাটা কোথায়! তার সীমাবদ্ধতা কোথায়!

সামান্য একটা উদাহরণ দিই। অনেক কবি অনেক শব্দের বানান পর্যন্ত জানেন না! শব্দ নিয়ে যার কারবার, তাকে শব্দের বানান তো বানান, তার সঠিক অর্থ ও ব্যবহার জানা না থাকলে কীভাবে চলবে?

সামগ্রিক সাহিত্যের ইতিহাসটাও তার জানা থাকা দরকার। পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার গুরুত্বপূর্ণ কবি-লেখকদের রচনাগুলি সম্পর্কেও।
কিন্তু আমরা কজন তেমনভাবে পড়ি? তেমনটা জানি? একজন কবিকে ভালোভাবে জানতে গেলে তার বইগুলো ধারাবাহিকভাবেই পড়া দরকার। আপনি খাবলা-খাবলা করে এখান থেকে দুটো, সেখান থেকে চারটা রচনা পড়ে একজন কবি বা লেখকের প্রবণতা বুঝে ফেলেছেন মনে করলে আমি বলবো, আপনি বোকার স্বর্গে আছেন।

আমাদের দেশে অধিকাংশ কবিরই এমন দশা। সবচাইতে বিস্ময়ের, তারাই বেশি ফতোয়া দেন। এক ধরনের ফতোয়ায় থাকে কবিতার জন্য এটা দরকার, ওটা দরকার।

আরেক ধরনের ফতোয়ায় থাকে কবিতায় এটা থাকার দরকার নেই, ওটার কোনো দরকার নেই।

যারা এটা বা ওটা দরকার বলেন, তাদের কথায় তবু কিছু যুক্তি থাকে। কিন্তু যারা বলেন, কবিতায় এটার দরকার নেই, ওটার প্রয়োজন নেই, তাদেরকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলুন। আরেকবার বলি, তাদেরকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলুন।

কারণ, কবিতার জন্য, কবিতা লেখার জন্য সবই দরকার। ভাষা-বানান-ছন্দ-ব্যাকরণ তো বটেই, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, দর্শন, এমনকি গণিতও জানা থাকা ভালো। সঙ্গীত ও চিত্রকলাও।

কবির প্রতিভা ও সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে প্রজ্ঞার মেলবন্ধন ঠিকঠাক হলে শেষতক কবিরই লাভ। প্রতিভা কম থাকলে যেমন চলবে না। প্রজ্ঞা কম থাকলেও চলবে না। অনেকে আছেন, খুব কম পড়াশোনা করেও প্রজ্ঞাবান হয়ে উঠতে পারেন। তারা শেখেন জীবন থেকে। জীবন দিয়ে। তারা বিশেষ ধরনের। দে আর স্পেশাল। দে আর গিফটেড।

শেষ পর্যন্ত সব কবির রাস্তাই নিজের নিজের, আলাদা আলাদা। রবীন্দ্রনাথ যেমন জীবনানন্দ হতে পারবেন না, তেমনি জীবনানন্দও রবীন্দ্রনাথ হতে পারবেন না।

একইভাবে আমি চাইলেই সিদ্ধার্থ হক, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, সাখাওয়াত টিপু, কিংবা ইমতিয়াজ মাহমুদ হতে পারবো না। তারাও কখনো ফরিদ কবির হতে পারবেন না। প্রত্যেকের পথ আলাদা, অর্জন আলাদা। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, আমি তাদের প্রতি এক ধরনের নৈকট্য অনুভব করি। এক ধরনের আত্মীয়তাই অনুভব করি।

অন্তত আমি কখনোই নিজেকে কারোর প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি না। কারোর কোনো কবিতা ভালো লাগলে আমার মনে হয়, সেই কবিতাটি আসলে আমিই লিখেছি! আমার আনন্দ হয়। পৃথিবীর সকল কবি, সব বয়সের কবির উত্তম কবিতাটিকে আমার নিজের রচনা বলেই মনে হয়। সেসব পাঠ করলে আমার মন আনন্দে ভরে ওঠে। যদিও কখনো কখনো এ আফসোস জাগে, আহা, এ কবিতাটি যদি সত্যিই আমার হতো! এটুকুই। এ আফসোসটুকুও শেষ অব্দি মনে প্রণোদনাই জাগায়। আরো ভালো লেখার, নতুন কিছু লেখার। আর, এও তো সত্যি, তাদের কবিতা কেন আমার হতে যাবে? তাদের মতো তো আমি লিখতে চাইও না। আমি তো লিখতে চাই আমার মতো। আমার নিজের কবিতা। নিজের ভাষায়।

এ এক অনিঃশেষ অনুভব। এটাই আমার মধ্যে জারি থাকে। সব সময়। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত