প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বুকে পানি জমার কারণ ও করণীয়

ডা. রফিক আহমেদ : আমরা প্রতিদিন ১০-১২ হাজার লিটার বাতাস শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে নিচ্ছি এবং বের করে দিচ্ছি- মনের অজান্তেই এ ঘটনাটি ঘটছে। প্রতি ৩ সেকেন্ড শ্বাস নিচ্ছি আর ২ সেকেন্ডে বের করে দিচ্ছি প্রতিবার ৫শ’ সি.সি। প্রতি মিনিটে ১২-১৮ বার শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া হয়। এ বাতাস ফুসফুসে যাচ্ছে বায়ুনালির মাধ্যমে। বায়ুনালিগুলো ৮৩-৮৫টি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাগে ভাগ হয়ে বায়ু প্রকোষ্ঠে গিয়ে বাতাস থেকে অক্সিজেন নিচ্ছে যা জীবন রক্ষার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড বর্জ্য হিসেবে বের করে দিচ্ছে।

ফুসফুসের গায়ে একটি আবরণ থাকে তাকে বলে ভিসারাল প্লুরা আর বাইরে যেটি থাকে তাকে বলে প্যারাইটাল প্লুরা। ফুসফুসের সংকোচন এবং প্রসারণের জন্য স্বাভাবিকভাবে ৫-১৫ সি.সি. সেরাস ফ্লুইড থাকে।

বেশ কিছু কারণের জন্য ফুসফুসে পানি জমা হতে পারে। যখন বেশি পানি জমে তখন তাকে বলা হয় প্লুরাল ইফিউশন।

ফুসফুসে সাধারণত বেশ কিছু জটিল এবং কঠিন রোগের জন্য পানি জমে- তার কিছু কারণ তুলে ধরছি।

বুকের পানি জমার কারণ দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে।

একজুডেটিভ : ফুসফুসের যক্ষ্মা, ফুসফুসের ক্যান্সার, নিউমোনিয়া পালমোনারি ইনফ্রাকশন ইত্যাদি। এ পানির মধ্যে প্রোটিন বেশি থাকে।

ট্রানজুডেটিভ : প্রধান কারণ কিডনি রোগ যেমন নেফ্রটিক সিন্ড্রোম, লিভার রোগ সিরোসিস অব লিভার, হার্টের রোগ ক্রনিক কনাজেসটিভ কার্ডিয়াক ফেইলর।

মিগ সিন্ড্রোম, সিউডোমিগ সিন্ডোম, হাইপো থাইরয়ডিজম। আরও আছে যেমন- বাতজ্বর, ডেঙ্গু, করোনা, টাইফয়েড জ্বরের কারণেও ফুসফুসে পানি জমতে পারে। এভাবে আরও ৫০টি কারণ বলা যেতেই পারে।

উপসর্গ : যে রোগের কারণে পানি জমবে সেই রোগের উপসর্গ তেমন হবে। তারপরও এখানে ৩টি রোগের কারণের উপসর্গ তুলে ধরছি।

ফুসফুস ক্যান্সার এবং ফুসফুসের যক্ষ্মার কারণে যদি বুকে পানি জমে, রোগের ইতিহাসের পরিবর্তন পাওয়া যাবে না। শুধু বুকের পানি পরীক্ষা করে তবেই রোগ নির্ণয় করা যাবে।

সাধারণ উপসর্গ : আহারে অরুচি, শরীর দুর্বল, শরীরের ওজন কমে যাবে, বিকালের দিকে জ্বর বা সারাদিনই জ্বর দুই ক্ষেত্রেই অল্প অল্প জ্বর জ্বর ভাব থাকবে।

ফুসফুসজনিত উপসর্গ : কফ, কাশি, উভয় ক্ষেত্রে কফের সঙ্গে রক্ত যেতে পারে, বুকের ব্যথা বা ভার লাগবে, শ্বাসকষ্ট হবে।

নিউমোনিয়ার লক্ষণ : জ্বর খুব বেশি থাকবে। ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট হবে। জ্বরের তীব্রতার কারণে শরীরে কাঁপুনি হবে, শিশুদের ক্ষেত্রে খিঁচুনি হতে পারে, রোগী প্রলাপ বকতে পারে, জ্বরের কারণে অনেকের বমি পর্যন্ত হতে পারে।

আহারে অরুচি, মাথা ভার, মাথাব্যথা, সমস্ত শরীর ব্যথা করতে পারে। নিউমোনিয়া রোগীদের কেসসিস্ট্রি সংক্ষিপ্ত হয় অর্থাৎ ৫/৭/১০ দিন।

ফুসফুসজনিত : কাশি, কফ, কফ গাঢ় লালচে বা হলুদ হতে পারে, বুকের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট হতে পারে। ফিজিক্যাল এক্সামিনেশন করে বুকে পানি জমা রোগীদের সবার ক্ষেত্রে একই পাওয়া যাবে। কাজেই রোগ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। রোগ নির্ণয়পূর্বক চিকিৎসা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

রক্তের রুটিন, ইউরিন RME, বুকের এক্স-রে করে যদি ধরা পড়ে বুকে পানি আছে, তখন রোগীকে একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেবেন।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা : চিকিৎসার পূর্বশর্ত রোগ নির্ণয় করা, রোগ নির্ণয়ের পূর্বশর্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা।

চিকিৎসা : চিকিৎসাশাস্ত্র চিকিৎসার জন্য যত না আগ্রহী তার চেয়ে বেশি আগ্রহী রোগ নির্ণয় করার জন্য। রোগ নির্ণয়ের পরে সঠিক চিকিৎসার জন্য ১/২ পদের ওষুধ লাগে। রোগ নির্ণয় ছাড়া ১০ পদের ওষুধ দিলেও কাজ হবে না।

আমরা তখন ওই ফ্লুইড (বুকের পানি) বের করে তার রং দেখেই ধারণা করতে পারি, সম্ভাব্য রোগ কি হতে পারে।

রোগীর ওই ফ্লুইড ল্যাবে পাঠিয়ে দেই। সেখানে সেল কাউন্ট অর্থাৎ সাইটোলজি, বায়োকেমেস্ট্রি অর্থাৎ প্রোটিন, সুগার, AFB, ADA, PH, LDH এবং C/Sসহ আরও অন্যান্য পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে। রোগ নির্ণয়পূর্বক তবেই সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এ রিপোর্টের মাধ্যমে ক্যান্সার, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়াসহ আরও অনেক রোগ নির্ণয় করা যায়।

যদি ক্যান্সার রোগ নির্ণয় হয় রোগীকে দ্রুত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। যক্ষ্মা হলে রোগীকে ৬ মাস যক্ষ্মার ওষুধ সেবন করতে দেয়া হয়। নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে পানি জমলে সেটিকে প্যারানিউমোনিক ইফিউশন বলা হয়। তখন তাকে ৭-১০ দিন অনেক সময় তারও বেশি দিন সি/এস রিপোর্ট অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক সেবন করতে দেই। এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার ৫-৭ দিন। ক্ষেত্র বিশেষে ১০ দিন তবে কোনো অবস্থায়ই ৩ দিনের কম নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন এন্টিবায়োটিকের ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।

অনেকেই সঠিক নিয়মে নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত এন্টিবায়োটিক সেবন করেন না। আমাদের দেশের অধিকাংশ লোকই গরিব। তারা ওষুধের দোকানদারের দেয়া এন্টিবায়োটিক মোয়া মুড়কির মতো খাচ্ছেন। যা দারিদ্র্যতা, অজ্ঞতা এবং অশিক্ষার জন্য ঘটছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই দোকান থেকে কেউ এন্টিবায়োটিক কিনতে পারবে না, রেজিস্ট্রার চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া।

এন্টিবায়োটিকের গায়ে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপনা ছাড়া বিক্রয় করা নিষিদ্ধ। প্রতিটি ওষুধই প্রয়োজনীয় বিষ মাত্রা এককভাবে নির্ভর করে ওষুধ বিষ কিনা।

ওষুধ আর দশটি সাধারণ ভোগ্য পণ্য নয় এর সঙ্গে জীবন মরণ প্রশ্ন জড়িত। স্মরণ রাখতে হবে এমন কোনো প্রেসক্রিপশন ড্রাগ নেই যা শত ভাগ নিরাপদ।

যার অর্থ যদি কেউ ভুলক্রমেও এন্টিবায়োটিক একবার শুরু করেন সেটি ৩ দিন অবশ্যই সেবন করতে হবে। অন্যথায় ড্রাগ রেসিসটেন্ট হবে যা নিজের, পরিবারের, দেশের, এমনকি সারাবিশ্বের জন্য নীরবে-সরবে মারাত্মক ক্ষতিকর।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে কাউকে এন্টিবায়োটিক দেয়া হলে তাকে পর্যাপ্ত কাউন্সিলিং করে তারপরই দেয়া হয়। তিনি যেন অবশ্যই এন্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পন্ন করেন।

এন্টিবায়োটিকের ডোজ কতবার, কতদিন, কি মাত্রায় খেতে হবে সেটি চিকিৎসকই নির্ধারণ করে দেবেন।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে কাউকে এন্টিবায়োটিক দেয়া হলে তাকে পর্যাপ্ত কাউন্সিলিং করে তারপরই দেয়া হয় তিনি যেন অবশ্যই এন্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পন্ন করেন।

এন্টিবায়োটিকের ডোজ কতবার, কতদিন, কি মাত্রায় খেতে হবে সেটি চিকিৎসকই নির্ধারণ করে দেবেন।

আমরা চিকিৎসক যারা ওষুধের ব্যবহার, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ডোজ এবং কত দিন খেতে হবে, কি কারণে এ ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে সেটির সমাধান কী? দুগ্ধপোষ্য শিশুর মা এবং গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে ওই ওষুধ নিরাপদ কিনা এসব কিছু বিবেচনা করে তারপরই ওষুধ লেখা হয়। একজন ভালো চিকিৎসক তিনিই যিনি যত বেশি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বেশি অবগত।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

সূত্র : যুগান্তর

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত