প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব: বঙ্গমাতার জন্মদিনে অতল শ্রদ্ধা

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব: স্বাস্থ্যমন্ত্রী তখন সদ্যপ্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম। হঠাৎ একদিন ডাক পড়লো মন্ত্রণালয়ে। ডাকটা পড়েছিলো একেবারেই অপ্রত্যাশিত একটা কারণে। গাজীপুরে বিকেএসপির পাশে তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি আধুনিক হাসপাতাল। মালিকানা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের আর ম্যানেজমেন্টে মালয়েশিয়ার বিখ্যাত কেপিজে গ্রুপ। হাসপাতালটি বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে। ওখানে সপ্তাহে এক-দুইদিন ওপিডি-তে রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য দেশের কিছু বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। বিশিষ্টদের মাঝে নিজেকে দেখে গর্বিত যে হইনি তা নয়, তবে বেগম মুজিবের নামে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার গর্বটি ছিলো অনেক গুণ বেশি। বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত দেশে প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি আর সঙ্গে বঙ্গমাতার নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী দেখার বিরল সুযোগÑ এদেশে হাতে গোনা দুই-একজনেরই কপালে জুটেছে। সেই থেকে শুরু। মাঝে-সাঝে দু’একটা ব্যতিক্রম ছাড়া শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে রোগী দেখার কাজটা অব্যাহত রেখেছিলাম কোভিড বাগড়া দেওয়ার আগ পর্যন্ত। যেদিন-ই গিয়েছি, পরম প্রশান্তি বোধ করেছি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে কম উচ্চারিত এবং সম্ভবত সবচাইতে কম মূল্যায়িত এই মহীয়সী নারীর প্রতি ঋণের খানিটা শোধ করতে পেরে।

বাংলাদেশের ঋণ যদি কোনো পরিবারের প্রতি থেকে থাকে, তবে তা বেগম মুজিবের পরিবারের প্রতি। এই পরিবারের কর্তা ব্যক্তিটি বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, বিন্দু থেকে বাঙালির স্বাধিকারের স্বপ্নকে সিন্ধুসম করার মহানায়ক তিনি। জীবনের এক পঞ্চমাংশ সময় জেলখানায় কাটিয়েছেন বাঙালিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি স্বাধীন পতাকা আর মানচিত্র এনে দেওয়ার তাগিদ থেকে। এই পরিবারের সদস্যদের পবিত্র রক্তে স্নাত বাংলাদেশের ধুলোবালি। বেগম মুজিবের পরিবারের জ্যেষ্ঠকন্যা বড় আপার নেতৃত্বে বাঙালির জয়রথ এখন ঊর্ধ্বশ্বাসে ধাবমান। কোভিডে যখন বিচলিত বিশ্ব, বড় আপায় প্রচণ্ড আস্থায় অবিচল বাংলাদেশ। পাশে আছেন পরিবারের কনিষ্ঠা কন্যা, ছোট আপা। দূরে থেকে কাছে আছেন তিনি বাঙালি আর বাংলাদেশের। যোগ্যতম পরিবারটির অন্যতম উত্তরসূরি হিসেবে বড় আপাকে সঙ্গ দিচ্ছেন সব সময়, তা সেই বিডিআর. বিদ্রোহের সময়-ই হোক, অথবা বিশ্বনাথের অসহায় শিশুদের ঈদ উপহারেই হোক। এই পরিবারের অকাল প্রয়াত শেখ কামাল আর শেখ জামাল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পিছপা হননি। পৃথিবীতে তাদের স্বল্পস্থায়ী বিচরণকালটা তারা আলোকিত করে রেখেছেন স্ব-স্ব জায়গা থেকে, নিজ-নিজ মহিমায়। বেঁচে থাকলে দ্যুতি ছড়াতেন আরও। ছড়াতেন নিশ্চিত শেখ রাসেলও। অমন একটি পরিবারের যিনি কান্ডারি, সেই বেগম মুজিব শুধু তার পরিবারটিকেই সামাল দেননি, সামাল দিয়েছেন গোটা বাংলাদেশকেই। কারণ এই পরিবারের কর্তার জ্বরের কারণেই হয়তো বদলে যেতে পারতো বাংলাদেশের ইতিহাস আর বাঙালির ভবিষ্যৎ।

ইতিহাসে এমন-ই গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবারটি। এমনটা বলার প্রেরণা ৭ মার্চের প্রেক্ষাপটটা। ১৯৭১ এর ৭ মার্চ জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিলো বঙ্গবন্ধুর শরীর। প্রচণ্ড চাপও ছিলো তার উপর চারপাশ থেকে নানামুখী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর সিদ্দীক সালিকের সে সময় কর্মস্থল ছিলো ঢাকা সেনানিবাস। তার লেখা ‘ডরঃহবংং ঃড় ঝঁৎৎবহফবৎ’ থেকে জানা যায়, পাক সেনাবাহিনীর ধারণা ছিলো বঙ্গবন্ধুর রেসকোর্সের ময়দান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন আর তা হলে তারা সেদিনই বাঙালির উপর সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয়ার প্রস্তুুতি নিয়ে রেখেছিলো। অন্যদিকে দলীয় ও ছাত্রনেতাদের প্রত্যাশা ছিলো পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার। ছিলো জনগণের প্রত্যাশাও। অথচ সেই মুহূর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেতো। কারণ পাকিস্তানিরা একে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পেতো। রেসকোর্সের পথে গাড়িতে ওঠার আগে বঙ্গবন্ধু বেগম মুজিবের পরামর্শ নেন। বেগম মুজিব তাকে বলেছিলেন, তার বিবেক যা বলে তাই করতে। বঙ্গবন্ধু তাই-ই করেছিলেন। জন্ম হয়েছিলো ৭ মার্চের মহাকাব্যের, সুচনা হয়েছিল পরাধীন জাতি থেকে বাঙালির জাতি-রাষ্ট্রের পথে চূড়ান্ত যাত্রার।

বঙ্গবন্ধুর জীবনে প্রতিটি মোড়ে-মোড়ে বেগম মুজিবের এমনি-ই সব নিপুণ হাতের ছোঁয়া। বঙ্গবন্ধুর লেখার ছত্রে-ছত্রে ছড়িয়ে আছে তার বর্ণনা। বেগম মুজিব তার অসামান্য দক্ষতায় ধারণ করেছিলেন বাংলাদেশকেও, বাংলাদেশের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে। একাত্তরে বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তানের কারাগারে, তার পরিণতি যখন অজ্ঞাত, তখনও তিনি সামলেছেন পুরো পরিবারটিকে। বন্দিত্ব থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন শেখ কামাল আর শেখ জামাল। বন্দিত্বকালীন অবস্থায় ২৭ জুলাই বড় আপার কোল আলো করে এসেছিলেন বাংলাদেশের আজকের ডিজিটাইলেজেশনের রূপকার বঙ্গবন্ধুর প্রথম দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। এসব কিছুই সামাল দিয়েছেন এই মহীয়সী নারী এক হাতে। বেঁচে থাকলে হয়তো সামলে নিতেন আজও বাংলাদেশ নামক তার বড় সংসারটিকে বড় আপার প্রেরণা হয়ে, একদিন যেমন সামলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেরণাদায়ী হয়ে। আমরা কখনই বুঝিনি তার অবদান, মূল্যায়িত হননি তিনি সেভাবে কোনদিনও তার জায়গাটি থেকে। তবে বুঝেছিল ঠিক-ই পঁচাত্তরের ঘাতকরা। তাদের বুলেটে তাই বিদীর্ণ হয়েছিলো সেদিন রাতে বেগম মুজিবের শরীরটিও। আজকে যখন কোভিডকে পরাজিত করে বাঙালির সামনে এগিয়ে চলার আর বাঙালিকে সামনে এগিয়ে নেয়ায় তার প্রাণপ্রিয় দুই কন্যার নিরলস প্রচেষ্টা, তখন এই দিনে আগস্টের ৮ তারিখে বঙ্গমাতার জন্মদিনে তার অভাবটা আরও বেশি করে অনুভূত হয়। শুধু যদি তিনি আজ তার দুই কন্যার পাশে থাকতেন। বঙ্গমাতা আজ বেঁচে থাকলে কী হতো জানি না, তবে জানি বাঙালিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ায় আপাদের পথ চলাটা আরও অনেক বেশি মসৃণ হতো।

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবংসদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত