প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাসকাওয়াথ আহসান: দাবায়ে রাখতে না পারা বাংলাদেশ

মাসকাওয়াথ আহসান: “বাংলাদেশ সুস্পষ্টভাবে স্থায়ী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র”-এই মন্তব্যটি সমাজ গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খানের। ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া এই মানুষটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায়; রাষ্ট্র-ব্যবস্থাপনার ভেতর-বাইরে থেকে দেখেছেন; নিরন্তর গবেষণায় এই রাষ্ট্রের টেকসই চরিত্রটি খুঁজে পেয়েছেন।

এই বন্যার মধ্যে একজন নারীকে অসহায়ভাবে গাছে বসে থাকতে দেখার একটি ছবি ফেসবুকে দৃশ্যমান। এই নারীর ছবিটি বাংলাদেশের সতত সংগ্রামশীলতার ছবি; আবার বেঁচে থাকার গভীর প্রত্যয়ের ছবি।

বাংলাদেশের একজন প্রবাসী শ্রমিক সারাদিন নির্মাণ কাজ করে; বাসায় ফিরে স্নান শেষে; ধোপ-দুরস্ত কাপড় পরে; একটু সুগন্ধী লাগিয়ে জার্মানির বন শহরে একটি সংগীত আড্ডায় আসতেন কিছু পেয়াজু ভেজে নিয়ে বন্ধুদের সামনে পেশ করার জন্য। এই সংগীত রসিক মানুষটি গল্পে গল্পে ফিরে যেতেন বরিশালে শৈশবে শোনা গানের স্মৃতিতে; ফেলে আসা প্রিয় জনপদের উঠোনে। বাচ্চা দুটো একটু দাঁড়িয়ে গেলে এই পিতা বাংলাদেশের গ্রামে ফিরে গিয়ে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য টাকা জমাচ্ছেন।

বাংলাদেশের মানুষ আসলে এইসব মহৎ আকাংক্ষায় বেঁচে থাকে। অনেক হিসাব করলে দেখবেন, অসুন্দর-অসততার মানুষ আসলে নেই। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে সুন্দর ও সত্যের আকাংক্ষা থাকে। কেবল অনুকূল পরিবেশ পেলে তা বিকশিত হয়।

পাকিস্তানের করাচীতে রাজায়-রাজায় যুদ্ধে প্রাণ যাবার ঝুঁকি নিয়ে উলু-খাগড়া জীবনে বেঁচে থাকা বাংলাদেশের মানুষের তার সন্তানকে শিক্ষিত করার দুর্মর চেষ্টা দেখে; “বাঙালি অতীশ লংঘিল গিরি তুষারে ভয়ংকর; জ্বালিল জ্ঞানের দ্বীপ তিব্বতে বাঙালি দীপংকর;” এই কবিতার অন্তর্নিহিত অর্থের দেখা পেয়েছি যেন।

শরণার্থী জীবনে আফঘানরা কিছুটা সহিংস হয়ে যায়; যেটা স্বাভাবিক; সন্ত্রাসী তালিবানরা সাধের ঘর পুড়িয়ে উচ্ছেদ করে দিলে তারা ঘর পোড়া অসহায় আশ্রয়হীন হিসেবে করাচীতে আবার ঘর বেঁধেছে; সেই বামিয়ানের খোলা হাওয়ায় পূর্বপুরুষের স্মৃতিঘন বড় বাড়ি ছেড়ে; এই কাঁচা-আবাদির ছোট ঘরের অনিশ্চিত জীবনে মনের সুষমা হারিয়ে যেতে বাধ্য।

করাচীতে শরণার্থী জীবন নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনের দায়িত্ব দিয়েছিলাম মাস্টার্সের সোশ্যাল সায়েন্সের ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ কোর্স প্রজেক্ট হিসেবে। তাদের গবেষণায় উঠে এলো, বাঙ্গালিরা কোন সন্ত্রাসী কাজে জড়িত হয় না; আর তাদের শিশুদের শিক্ষার হার বেশি। আফঘানরা তাই তাদের শিশুদের বাঙালি শিশুদের সঙ্গে মিশতে বলে। আফঘান শিশুরা এইভাবে অনেক বাংলা শব্দ শিখে গেছে।

পাকিস্তান প্রশাসনের একাত্তরের গণহত্যা অস্বীকার প্রবণতা থেকে করাচীতে শরণার্থী বাঙ্গালিদের অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকতে হয়েছে। যে অর্থনৈতিক কাঠামোর মানুষ তারা; তাতে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে কাজ পাবার অনিশ্চয়তায় পাকিস্তানে রয়ে গেছে। সাধারণ মানুষকে পেটের ভাতের কথা ভাবতে হয়; চাঁদাবাজি করে বিরিয়ানি খেয়ে আর নধর শরীরে বাংলাদেশের জার্সি পরে ক্রিকেট গ্যালারিতে যে খোকন সোনারা বসে ইতিহাসের জাবর কাটে; তাদের মত চাঁদাবাজি আর দলীয় ভিক্ষাবৃত্তির জীবনের চেয়ে; আরব সাগরে মাছ-শিকার করে ক্ষুধার অন্ন জোটানো যে অনেক গর্বের।

শরণার্থী জীবন এমন জীবন; যেখানে ফেণীর এককালের সম্পন্ন ঘরের আদরের কন্যাটিকে সাগর ভাঙ্গনে উন্মূল হয়ে করাচীতে এসে গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়। কিন্তু সততার কারণে, দান-অনুদান সতত প্রত্যাখ্যানের মাঝ দিয়ে সমাজে মর্যাদা জিতে নেবার অনন্য ক্ষমতা এই বাঙালি নারীদের। সন্তানের শিক্ষার জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করে একটু বাড়তি আয়ের চেষ্টা করেন এই মায়েরা। নাগরিকত্ব কার্ড না দেবার আদিম বায়ানাক্কার মাঝেও; অনেক বাঙালি বংশোদ্ভুত তরুণ-তরুণী এখন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। নির্বোধ প্রশাসন যন্ত্র সম্ভাবনা হত্যার সব রকম গোলকধাধা তৈরির চেষ্টা করলেও; বাঙালি যে অদম্য।

এইরকম জীবন সংগ্রামে পারদর্শী যে মানুষেরা তাদের দমিয়ে রাখা অসম্ভব। বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত “দাবায়ে রাখতে পারবানা” বাক্যবন্ধের দ্যোতনা খুঁজে পাওয়া যায় সংগ্রামশীল বাঙালি জীবনে।

বাংলাদেশে প্রতিটি বাবা-মা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠান। বাচ্চাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে বাবা-মা উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন। বাংলাদেশ সরকার বিনামূল্যে পাঠ্য-পুস্তক উপহার দেয় বছরের প্রথম দিনেই। স্কুলে খুব ভালো মানের শিক্ষা ছাত্র-ছাত্রীরা যে পায়; এমন প্রতীয়মান হয় না। শিক্ষকদের গুরুত্ব না দিয়ে, অল্প বেতন দিয়ে, থানার দারোগা থেকে ইউপি চেয়ারম্যান, বিরাট ইউএনও স্যার; এদের মনিব সেজে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ছাত্রলীগের নেতা এলাকা পরিদর্শনে এলে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষককে দাঁড়িয়ে পুষ্প-বর্ষণ করতে হয়। জোর করে সম্মান আদায়ের ‘ফ্লাওয়ার ব্যান্ড’ যেন স্কুলগুলো। এমপি সাহেব, মন্ত্রী সাহেব কতো বড় ইয়েটা অর্জন করেছেন; তার বর্ণনা দিতে হয় ফুলে-ফুলে-মানপত্রের বিশেষণের আতিশয্য প্লাবনে।

মর্যাদাহীন শিক্ষকতা পেশায় বেশির ভাগ তারাই এসেছেন; যারা আর কোন কাজে টিকতে পারেননি। তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের সমসাময়িক শিক্ষার উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। ইন্টারনেট যুগ শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রী উভয়ের জন্য এমন ইশকুল খুলে দিয়েছে যে; জ্ঞান তৃষ্ণা থাকলে শিক্ষার সব উপকরণ এই ভার্চুয়াল লাইব্রেরিতে উপস্থিত।

বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে মানুষের যে চিন্তা-দ্যোতনা চোখে পড়ে; তা স্থিতিশীল ও চিরস্থায়ী রাষ্ট্রের ইঙ্গিত দেয়। সমাজ-রাজনৈতিক সচেতনতার এমন জমজমাট আড্ডা পৃথিবীতে বিরল।

অন্যদের তুলনায় বাঙালি কিছুটা বেশি ক্রিটিক্যাল, কিছুটা সন্দেহ প্রবণ, কিছুটা রাগী-অভিমানী; আসলে পারফেকশনিস্ট। এটা অমূল্য এক গুণ; এটা প্রাচীন গ্রীসে চোখে পড়তো। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের চায়ের স্টলগুলোকে এ কারণে আমি এরিস্টোটলের পাঠশালা বলি।

নিউজরুমের ডেস্কে বসে বা বড় জোর দু’চারটি কেন্দ্রে গিয়ে নির্বাচন কাভার করতে করতে মনে হয়েছিলো; নির্বাচনের অন্তর বুঝতে গ্রামাঞ্চলে যেতে হবে। ঠিক করলাম নির্বাচনে অংশ নেবো। নির্দলীয় নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার লেখক হিসেবে; আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বিকল্পধারা বাংলাদেশকে পছন্দ হলো। বি চৌধুরীর আপনার ডাক্তার ও মাহী বি চৌধুরীর তৈরি করা টিভি অনুষ্ঠান পছন্দ করতাম আমি। ফেসবুকের ফ্রি লোডার ইতিহাসান ভাইদের মতো রাজনীতিবিদের মধ্যে বিশুদ্ধ ধর্ম-যাজক খোঁজার অভ্যাস নেই; ফলে বাংলাদেশের প্রচলিত মানে বি চৌধুরীকে ইউরোপীয় বিকশিত গণতন্ত্রের দেশের মানের একজন রাজনীতিবিদ মনে হয়েছে আমার।

বি চৌধুরী উপদেশ দিলেন, গ্রামের উঠোন বৈঠকে সাধারণ মানুষের কথা শুনতে; নিজে কম বলতে। এই নির্বাচনে অংশ নেবার গবেষণা-পদ্ধতি আমাকে ঋদ্ধ করেছে। আমার স্কুল-কলেজ জীবনের এক বন্ধু প্রতিপক্ষ ছিলো। প্রতিপক্ষ ছিলেন আরেকজন প্রবীণ মানুষ ছিলেন; যিনি আমার নানা-দাদার যুগের লোক ও তাদের পরিচিত। ফলে আনন্দময় একটা মাস কাঠিয়েছি। এ কী অপরূপ রূপে মা তোমার হেরিনু পল্লী জননী।

নির্বাচনী বিতর্কে আমার প্রতিপক্ষের বন্ধু বলেছিলো, আজ মাসকাওয়াথ যে আইডিয়াগুলো দেবে আমি তা মনে রাখবো। যদি নির্বাচনে জিতি কাজগুলো করবো। সে নির্বাচনে জিতেছে; নিজেও আইডিয়াবাজ স্কুল-কলেজ থেকেই; ফলে আইটি ভিলেজ, ফ্রুট এক্সপোর্ট প্রমোশান জোন, এলাকার শিক্ষা-স্বাস্থ্যের দেখভাল, আইনের শাসন নিশ্চিত করা; যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ করা, এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখা এসবই করেছে সে জনপ্রতিনিধি হিসেবে।

এই এলাকায় কম্যুনিটি রেডিও চালু করে শিক্ষা-তথ্য-বিনোদন যোগাযোগের কাজটি করছে আমার আরেক শৈশবের বন্ধু; যে নির্বাচনী গবেষণায় আমার সহযাত্রী ছিলো। সে-ই নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীর হাতে বন্ধুর হাত রেখে রেডিও প্রতিষ্ঠা ও ফ্রুট প্রমোশান জোনের কাজ করছে। আরেক বন্ধুকে দেখলাম ফ্রুট প্রমোশান জোনের কাজে হাত লাগিয়েছে নেহাত ভালোলাগা থেকে। উদ্দেশ্য মহৎ হলে চারপাশের মালিন্য তাকে স্পর্শ করেনা; এর প্রমাণ বোধ হয় আমার স্কুলের বন্ধু বৃত্তটি। আমাদের আশৈশব চর্চিত দর্শন, হাত বাড়ালেই বন্ধু। বাংলাদেশেই এমন একটি এলাকা আছে; যেটাকে গ্রামও বলা যাবে না-শহরও বলা যাবে না; অথচ আধুনিক জনপদ এটি; আড়ানী এর নাম; রাজশাহী থেকে খুব কাছে বড়াল নদীর ধারে এর অবস্থান। এই এলাকাটির কেসস্টাডির মাঝে আমি ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে দেখি।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকায় এমন ভালো কাজ-প্রগতির কাজ আবহমান ধরে চলে আসছে। অর্থনীতির হঠাত আলোর চমকানিতে প্রচুর টাকা-পয়সার লেনদেন হওয়াতে অপ্রস্তুত মানুষের কেউ কেউ দুর্নীতিতে জড়িয়ে নিজেদের দুখী করেছে; জীবন-মৃত্যু-স্মরণে মালিন্য এনেছে। তাদের জন্য আমার বড্ড মায়া হয়। আরেকবার সুযোগ পেলে এরা হয়তো সরল গল্পের জীবন যাপন করতেন।

একটা কথা প্রচলিত আছে, অহংকার পতনের মূল। নিজের ভেতরে নিজের ধর্ম-বর্ণ-জাত-জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিন্দুমাত্র শ্রেষ্ঠত্বের বোধ থাকা মানেই; ঐ লোকটি সময়ের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে।

ডেট-এক্সপায়ার্ড প্যারাসিটামলের মতো সে পড়ে আছে ফেসবুকের ড্রয়ারে। দুখী প্যারাসিটামলের ধারণা সে হয়তো মানুষের মাথা ব্যথা-জ্বর সারাতে পারবে; অথচ বেচারা প্যারাসিটামল জানেনা সে কার্যকারিতা হারিয়ে; অর্থহীন চুনের গোলামাত্র।

ফেসবুকে ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়া টর্চের আলোয় যারা দেশপ্রেম ও ধর্মপ্রেম দেখানোর চেষ্টা করেন; তাদের নিয়ে তো মহতের লজ্জা পাবার মতো অবস্থা বলা যায়।

চিন্তার অচলায়নে বন্দী এই কমনসেন্স বর্জিত মানুষগুলো হচ্ছে আধুনিক জীবনের এবসার্ডিটির বিনোদন; যে বিনোদন আপনি হিরো আলম কিংবা শিল্পী মাহফুজের গানে পান। তাই কলতলার ঝগড়ার অতসী কাঁচে অনেক বড় করে তোলা তিক্ততার গল্পটিকে নেহাত বিনোদন হিসেবে নিয়ে; ড আকবর আলী খানের মন্তব্যের অনুরণনে বাংলাদেশকে সুস্পষ্টভাবে স্থায়ী ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখি; আর বাঙ্গালিকে দেখি বিশ্বমনীষার খোঁজে জ্ঞান পিপাসু এক জাতি হিসেবে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত