প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরজু আহমেদ : দুই প্রজন্ম আগেও কোরবানি নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিলো এই দেশে!

আরজু আহমেদ : কোরবানি করার অধিকার আমাদের পূর্ব-পুরুষেরা বহু সংগ্রাম, ত্যাগ এমনকি নিজেদের জীবনকে কোরবানি করার মধ্য দিয়েই আদায় করেছে। যে অঞ্চলে এই আমি যে প্রজন্মের মধ্যে বড়ো হচ্ছি, সেই প্রজন্ম এতটা স্বচ্ছন্দ্যে কোরবানি দিতে পারলেও- আমার দুই প্রজন্ম আগেও ঠিক একই এলাকায় কোরবানি নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রায় সব হিন্দু জমিদারই কোরবানির ব্যাপারে মুসলমানদের উপর জুলুম চালিয়েছে। এরকম অসংখ্য দলিলের মধ্যে অন্যতম হল ১৮৯৫ সালের দিকে বর্তমান ময়মনসিংহের প্রভাবশালী মুক্তাগাছার জমিদার ও টাঙ্গাইলের সন্তোষের জমিদার ঈদ উল আজহার গরু কোরবানী করার ‘অপরাধে’ বেশ কিছু মুসলমানকে অর্থদণ্ড প্রদান। (i)

এমনকি এই যে কোরবানির ঈদ এলে আজকাল যে মওসুমি পরিবেশবাদীদের উচ্চবাচ্য শুরু হয়, এটাও নতুন না। ১৯০৫ সালে চাঁদপুরের কিছু মুসলমান গরু কোরবানি করেছিলেন ৷

এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শ্রীমান গোপাল চন্দ্র মজুমদার প্রকাশ্যে রাস্তায় গরু জবাই এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাংস ধুয়ে জল অপবিত্র করার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেন ৷

আদালত অভিযুক্তদের মধ্য থেকে একজনকে এক মাসের জেল, একজনকে ৫০ টাকা, অপরজনকে ১৫ টাকা জরিমানা করেন। (ii) সেকালে ৫০ টাকা কিম্বা ১৫ টাকা ছোটখাটো ব্যাপার ছিল না।

ব্রিটিশদের নানাবিধ নীতির ফলস্বরূপ হিন্দুদের রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ হিসেবে আবির্ভাবের পর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে যে গো-রক্ষা রাজনীতির শুরু হয়- তার আশু প্রক্রিয়া ছিল অত্যাচার, জুলুম, হামলা, মামলার মাধ্যমে মুসলমানদের কোরবানির অধিকার থেকে দূরে রাখা

এই আন্দোলনের প্রথম পর্যায় ১৮৮০-এর দশকে শুরু হয়। সেসময় থেকেই পূর্ব-বংগের হিন্দু জমিদাররা প্রজাদের কোররবানি থেকে দূরে রাখতে বলপ্রয়োগ করে। ময়মনসিংহ যার উদাহরণ।

এমনকি তখনও পর্যন্ত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এই আন্দোলন সহিংস রূপ নেয় নি, অন্তত ১৮৯৩ নাগাদ এর পরবর্তী পর্যায় শুরু হবার পূর্ব পর্যন্ত। পূর্ব-বাঙলার অন্যান্য অঞ্চল একই রকম অবস্থায় ছিল।

যেমন দক্ষিণ দিনাজপুরের ফারুক হুসেন নিজ জবানবন্দিতে দেশভাগ প্রসঙ্গ স্বমন্ধে বলতে গিয়ে নিজের প্রভাবশালী হিন্দু প্রতিবেশীদের সম্পর্কে উল্লেখ করেন-

‘তারা আমাদের কখনোই কোরবানি করতে দেয় নি, এমনকি নামাজের সময় ঢাক পিটিয়ে বিঘ্ন সৃষ্টি করত’। (iii)

গো-রক্ষা আন্দোলন মূলত যতখানি না ছিল ধর্মীয় তারচে’ অধিক রাজনৈতিক। আর এই রাজনৈতিক আন্দোলন মূলত মুসলিমবিদ্বেষ বৈ কিছু না।(iv)

সে লক্ষ্যেই ১৮৯০ সালে লাহোর থেকে এই সংক্রান্ত বই বাঙলায় ছাপানো হয়। আবার বাঙলার তথাকথিত প্রগতিশীল নামধারী মুসলমানদের কেউ কেউ সেকালেও সে দলে ভেড়েন।

যেমন মীর মশাররফ হোসেনের গরু কোরবানীর বিপক্ষে ‘গো-জীবন’ নামে গ্রন্থের ভূমিকা লেখেন এলাহাবাদের গো-রক্ষা আন্দোলনের নেতা।

‘গোকুল নির্মূল আশঙ্কা’ নামে প্রবন্ধ লিখে গরু কুরবানির বিরোধিতা করেছিলেন মীর মশাররফ হোসেন। টাঙ্গাইলের মাওলানা নাইমুদ্দিন এক মাহফিলে কোরবানির বিধানের বিরোধিতা করায় তাকে কাফের বলেন।

এতে চটে গিয়ে মীর মশাররফ ঐ মাওলানার বিপক্ষে মানহানির মামলা রুজু করলে ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা ম্যাডিকেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ব্যাপক প্রতিবাদ করে। বাধ্য হয়ে মীর মশাররফ অগত্যা মামলা প্রত্যাহার করেন।

তার এই গরু কোরবানি বিরোধিতা অধুনা অসাম্প্রদায়িকতা হিসেবে অভহিত করা হয়। অথচ মুসলমানের ধর্মীয় অধিকার এর দ্বারা ক্ষুন্ন করার চেষ্টা হলেও সেটাকে কখনো এই অঞ্চলের সেকুলার সমাজ সাম্প্রদায়িক হিসেবে দেখে নি।

বাঙলায় সাম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞা ও সেকুলারিজম সম্পর্কে ধারণা নেবার জন্য এটা একটা ভালো ঐতিহাসিক পাঠ।

আজকাল যেসব মওসুমি মানবতাবাদী, পরিবেশবাদী কোরবানির বিরোধিতায় হাজির আছেন। তাদের উদ্দেশ্যও আদতে আমাদের লড়াই করে অর্জিত কোরবানির অধিকার মীরজাফরগিরি করে গো-রক্ষাবাদীদের ইচ্ছের কাছে সমর্পন করানো ব্যাতিত আর কিছুই না।

এইসবই সেকালের সেই বর্ণহিন্দুর প্রেতাত্মা এবং একালে যারা সীমান্তের ওপারে কেবল কারো গরুর মাংস পাওয়া যাবে ভেবে গোরক্ষার নাম দিয়ে পিটিয়ে মানুষ খুন করে তাদেরই স্থানীয় বরকন্দাজ। এই সত্যকেও আমাদের মানতে হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ দেশের কৃষক, মুজুর সারাবছর ধরে পালা তার একটা গরু, একটা ছাগল কোরবানির সময় বিক্রি করে একটু অর্থনৈতিক স্বস্তি পেতে চায়।

এ দেশে সবচে’ বেশি দাতব্য কাজ একদিনে কেবল কোরবানির সময়ে হয়- অথচ এরপরও এর বিরোধিতা যারা করেন- সেটা মেকি মানবিক কিম্বা অন্য কিছু নয়- বরং তাদের এই বিরোধিতা কেবল এবং কেবলমাত্র বাঙালি মুসলমানের বিপক্ষে করা ঐতিহাসিক লড়াইয়ের অংশ।

তথ্যসহায়কঃ
(I ও ii) মুনতাসীর মামুন, বাংলাদেশের উৎসব, বাংলা একাডেমী।
(iii) The Bengal Diaspora: Rethinking Muslim migration By Claire Alexander, Joya Chatterji, Annu Jalais
(iv) The Icon of Mother in Late Colonial North India: ‘Bharat Mata’, ‘Matri Bhasha’ and ‘Gau Mata’ By Charu Gupta

সর্বাধিক পঠিত