প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফরিদ কবির: লেখক, নাট্যকার বা চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদকে ভুলে যাওয়া কিছুটা কঠিনই হবে

ফরিদ কবির: হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় আশির মাঝামাঝি সময়ে। সে সময় বাংলাবাজারে নসাস-এর ইফতেখার রসুল জর্জের ওখানে প্রায়ই আড্ডা দিতে যেতাম। জর্জ ভাইয়ের ওখানে নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতেন হুমায়ূন আহমেদ, হেদায়েত হোসাইন মোরশেদ, ইমদাদুল হক মিলনসহ আরো অনেকেই। আমিও প্রায়ই যেতাম সেখানে। হুমায়ূন ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় সেখানেই। পরে শহীদুল্লাহ হলে থাকতে এক-দুবার এবং আজিমপুরের বাসায় কয়েকবার গিয়েছি।
সে সময় সাহিত্যের অন্যান্য বইয়ের পাশাপাশি ভৌতিক রচনা, মানে, হরর উপন্যাস খুব পড়তাম। একদিন হুমায়ূন ভাইয়ের আজিমপুরের বাসায় তার সেলফে দেখি, স্টিফেন কিং-এর ‘সালেমস লট’ বইটি। স্টিফেন কিং-এর বেশ কিছু বই তার সংগ্রহে ছিলো। দেখে আমি হুমায়ূন ভাইকে বললাম, ‘সালেমস লট’টা কি আমি কয়েকদিনের জন্য নিতে পারি? হুমায়ূন ভাই সাফ না করে দিলেন। বললেন, আমি তো কাউকে বই ধার দিই না। আমি বললাম, আপনি আমাকে দেন, আমি ঠিক সাত দিন পর ফেরত দিয়ে দেবো। বইটা ছিলো বেশ মোটা সাইজের, প্রায় সাড়ে সাত শো পৃষ্ঠার। তার ওপর ইংরেজি ভাষায়। তিনি বললেন, সাত দিনে এটা তুমি শেষ করতে পারবে না। আমি বললাম, পারবো। আপনি দেন। তিনি এক মুহূর্ত কী ভেবে বললেন, না। আজ পর্যন্ত আমি কাউকে বই দিইনি। আজ তোমার জন্য নিয়মটা ভাঙতে চাই না। তুমি চাইলে এখানে এসে পড়তে পারো।

কিন্তু ঘণ্টাখানেক আড্ডা দিয়ে চা-টা খেয়ে যখন উঠতে যাবো, তিনি নিজেই বইটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, নাও। তোমাকে না করতে খারাপ লাগছিলো। তবে ৭ দিন পর ঠিকঠাকমতো বইটা দিয়ে যাবে। বইটা সাত দিনের মাথায় ফেরত দেওয়া হয়নি। মাসখানেক পর আমার সঙ্গে তার দেখা। তিনি বললেন, তুমি তো বইটা দিলে না? এ কারণেই আমি কাউকে বই দিই না। ভেবেছিলাম, নিজের এই নিয়মটা ভাঙবো …। কিন্তু তুমি সেটা হতে দিলে না। কালই বইটা ফেরত দিয়ে দেবে। আমি বললাম, আচ্ছা। কালই দিয়ে আসবো। পরের দিন নানা কারণে হুমায়ূন ভাইয়ের বাসায় যাওয়া হলো না। ভাবলাম, পরের কোনো ছুটির দিনে বইটা ফেরত দিয়ে আসবো। কিন্তু আমার কপাল খারাপ। তার আগেই একটা অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেলো। হুমায়ূন ভাই আমাকে দেখেই রেগে গেলেন, তিনি পকেট থেকে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে বললেন, এই টাকাটা রাখো। এক কপি ‘সালেমস লট’ নিউ মার্কেট থেকে কিনে নিও। আর আজকেই আমার বইটা ফেরত দিয়ে দিও। আমি বললাম, টাকা লাগবে না। বইটা কালই ফেরত দিয়ে আসবো।

সেদিনই আমি বইটা ফেরত দিয়ে এলাম। এরপর অনেক দিন তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়নি। ধানমণ্ডিতে যখন ওঠেন, তখন তার বাসায় আমার কখনোই যাওয়া হয়নি। তবে, এখানে-সেখানে বিভিন্ন আড্ডায় দেখা হতো। দেখা হলেই তিনি জানতে চাইতেন, হুমায়ূন আজাদ আর তোমার সেই ঘটনাটা বলো…। আশেপাশের অনেকেই জানতেন, তিনি কোন ঘটনাটা শুনতে চান! তবু আমি বলতাম, কোনটা হুমায়ূন ভাই? তিনি বলতেন, ওই যে, ‘তুমি এতো কুৎসিত, তোমার মেয়ে এতো সুন্দর হলো কী করে,… সেটা? আমি বলতাম, আপনি তো জানেনই, তবে…। তিনি বলতেন, তবু তুমি শোনাও। হুমায়ূন আজাদের কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণটা তুমি অবিকল নকল করতে পারো। বলো? তিনি এমনভাবে বলতেন, যে আমাকে বলতেই হতো। ঘটনাটা শোনার পর তিনি ঠা ঠা করে হাসতেন।

না। একবার না, যখনই তার সঙ্গে কোথাও দেখা হতো, তিনি এই গল্পটা শুনতে চাইতেন। আর, প্রতিবারই ঠা ঠা করে হাসতেন, যেন এই প্রথমবারই শুনলেন। হুমায়ূন আজাদের সঙ্গে আমার অনেক ঘটনাই আছে, কিন্তু তিনি শুধু এ ঘটনাটাই শুনতে চাইতেন। কেন? সেটা কখনো তাকে জিজ্ঞেশ করা হয়নি। কিছু কথা কখনোই মানুষের জানা হয় না। এর উত্তরটাও যেমন আমার কখনোই জানা হবে না। (পুরোনো পোস্টই নতুন করে দিলাম। কারণ এ তো ঠিক, লেখক, নাট্যকার বা চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদকে ভুলে যাওয়া কিছুটা কঠিনই হবে)। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত