প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী : প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বন্যা মোকাবিলায় সুনামগঞ্জের ডিসিকে দিকনির্দেশ

দীপক চৌধুরী : সুরমা নদীর পানি আবারও বাড়ায় আবার বন্যা। মেঘালয়ে প্রায় এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিপাতের প্রভাবে সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদীগুলোতে পানি বেড়ে তা সুরমায় প্রবেশ করছে। নদীর পানি বিপদসীমার বহু ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। ফলে জেলার নিম্নাঞ্চলে বাড়ছেই পানি। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড আশঙ্কা করছে পানি আরো বাড়বে। জানা গেছে, নিয়মিত অফিস সময়ের বাইরেও প্রশাসনিক কোনো কাজ যাতে ব্যহত না হয় বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় এজন্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন সরকারী কাজে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব ড. আহমদ কায়কাউসের নেতৃত্বে চলমান বন্যা পরিস্থিতি সংক্রান্ত বিষয়ে ভিডিও কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় গতকাল বিকেলে। ভিডিও কনফারেন্সে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মোহসীন। এসময় বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকগণ সংযুক্ত হন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ; পুলিশ সুপার জনাব মো মিজানুর রহমান; সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন; অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকগণ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমানসহ অন্যরা। ভিডিও কনফারেন্সে মুখ্যসচিব সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর নেন এবং সঠিকভাবে সমন্বয়ের মাধ্যমে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রদত্ত নির্দেশনা দিয়েছেন।

বন্যায় বিপাকে রয়েছেন কৃষিজীবী, নিম্ন আয়ের মানুষ, মজুর, সাধারণ ও ক্ষুদে ব্যবসায়ী। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সুনামগঞ্জ প্রশাসনের সতর্ক পদক্ষেপ ও আন্তরিকতা লক্ষ্যনীয়। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ বলছেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন রাস্তায় পানি চলে এসেছে। যদি এ রকম বৃষ্টি অব্যাহত থাকে তাহলে আবার ঘরে পানি উঠবে এমন আশঙ্কতাও করেছেন অনেকেই।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ এই বন্যার মধ্যেও ছাতা মাথায় দিয়ে, বন্যার পানিতে নেমে, বৃষ্টিতে ভিজে সরেজমিনে পরিদর্শন করছেন জেলা ও উপজেলার স্পর্শকাতর বিভিন্ন এলাকা। তাঁর প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যায় সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। সকল ইউএনওদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। ইতিমধ্যে কয়েকশ মেট্রিক টনের চাল, বিপুল পরিমান নগদ টাকাসহ প্রশাসনিক সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে। কয়েকদিন আগেও সুনামগঞ্জে জেলাসদরসহ বিভিন্ন এলাকায় একদফা বন্যা হয়ে গেছে। মানুষ হয়েছে পানিবন্দী। বন্যার অবনতি ঘটছে এটা সত্য। তবে এটাও সত্য যে, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের বিশাল কর্মদক্ষতায় এবং সঠিক দিকনির্দেশনায় জেলার মতো উপজেলা প্রশাসনও ভীষণভাবে সতর্ক। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে যথাসাধ্য যাওয়া, ত্রাণ দেওয়া, আবার সঠিক ব্যক্তি ত্রাণ পেয়েছে কি-না এই খবরও সংগ্রহ করে থাকেন তিনি। যা খুবই ব্যতিক্রম। শুধু তাই নয়, নিয়মিত অফিস সময়ের বাইরেও যাতে প্রশাসনিক কোনো কাজে বিঘ্ন না ঘটে এজন্যে অতিরিক্ত সময় দিচ্ছেন সরকারী কাজে। শুধু জেলার বন্যা মোকাবিলা করাই নয়, প্রাকৃতিক যে কোনোর দুর্যোগ মোকাবিলা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধেও জেলাপ্রশাসকের ছুটে চলা লক্ষণীয়। কিছু দিন আগে দিরাই থানার উজানধল গ্রামে বাউল শিল্পী রণেশ ঠাকুরের গানের ঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা শুনে পুলিশ সুপারকে সঙ্গে নিয়ে চলে আসেন ক্ষতিগ্রস্ত বাউলের বাড়িতে। বাউলের মুখ থেকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ নিজে শুনেন প্রকৃত ঘটনা। চালার টিন ও ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে নগদ টাকা ও চালের টিন দিয়ে এসেছেন তিনি। গত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসেও সুনামগঞ্জে কৃষকরা পাকা ধানক্ষেত নিয়ে ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছিলেন। কাটাতে পারছিলেন না ধান।

সেই সময় ডিসি কৃষকদের সঙ্গে ক্ষেতে নেমে পড়েন। সেই যাত্রায়ও কৃতকার্য হন। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সুনামগঞ্জের মানুষ। তাঁর কর্মদক্ষতা, আন্তরিকতা ও সুদৃষ্টি জেলাবাসীকে ভীষণ টানে। কাজের মাধ্যমে এ বন্যায় তিনি প্রতিমুহূর্তে খোঁজ রাখছেন তার প্রিয় জেলাবাসীর। আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন পূরণে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হলে সঠিক কাজটি সঠিক সময়ে করতে হবে। মেধা, শ্রম, সৃজনশীলতা শেখ হাসিনার চারিত্রিক দৃঢ়তার এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। তিনি কতটা পরিশ্রমী ও ধর্মপ্রাণ তা হয়ত অনেকেই জানেন না। দেশসেবার প্রথম শর্তই হচ্ছে মানবসেবা ও মানবিকতা। সেই দর্শন ও মানবতা রয়েছে আলোচিত জেলা প্রশাসকের রক্তেও। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ঘটনা তুলে ধরতে চাই। সাংবাদিক হিসেবে আমার মনে হয় : বাংলাদেশের জনগণ ছিল তাঁর প্রাণ এবং বাংলাদেশের ভূমি ছিল তাঁর দেহ। অন্তহীন অসুস্থ ও দুর্বল শরীরে ১৯৭২ সালের এই জুলাই মাসেই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসুস্থ হবার পরও কাজে ডুব দিয়েছিলেন। তখন তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘জনগণই যখন কষ্ট করছে তখন ঘরে বসে থাকতে পারি না।’ চিকিৎসকদের শাসন তাকে ধানমন্ডির বাড়িতে আটকে রাখতে পারেনি। বাসসের খবরের বরাত দিয়ে ওই বছরের দৈনিক বাংলার ১১ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পাঁচ দিনের অসুস্থতাজনিত বিরতিতে তার (প্রধানমন্ত্রীর) অফিস কক্ষে ফাইলপত্রের স্ত’প জমে গিয়েছিল। সারাদিন সেসবের মধ্যেই ডুব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।’ বঙ্গবন্ধুর চিন্তা, দূরদর্শীতা ও দেশপ্রেম অর্থাৎ সবকিছুই ছিল জনগণকে কেন্দ্র করেই। আগে জনগণ এরপর রাজনীতি।

এই বন্যায় দেশের অনেক এলাকায় আমনের বীজতলা আবারও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কৃষক দিশেহারা। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক বর্গাচাষিরা চড়া সুদে আনা দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণ পরিশোধের চিন্তায় চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। প্রতিক্ষণ মানুষ একটা আশা নিয়ে থাকে যে, করোনা ভ্যাকসিনের অপেক্ষায়। কিন্তু এরমধ্যে অর্থাৎ এই ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্যেও একদিকে আমরা করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছি অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা মোকাবিলাও করছি। এটাও সম্ভবত একটি যুদ্ধপরীক্ষা। মানসিক দৃঢ়তা, পরিশ্রম ও মনোবল না বাড়ালে যেকোনো যুদ্ধেই জয়লাভ কঠিন হয়ে পড়ে।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত