প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সশ্রদ্ধ স্মরণ সাহারা খাতুনকে

মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু: আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এডভোকেট সাহারা খাতুনের প্রয়ানে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাঁর স্বজন-সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানাই। সাহারা খাতুন দেশের সমকালীন ইতিহাসে দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিবেদিত একনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের একজন। অবিবাহিত থেকে আইনজীবীর পেশায় জীবিকা চালিয়ে সাদামাটা জীবনযাপন করে রাজপথ থেকে আইনসভা পর্যন্ত ওঠা তিনি একজন লড়াকু রাজনৈতিক কর্মীর প্রতিচ্ছবি। দুরূহ দায়িত্বের নিরীখে একজন নারীর বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়া বিশেষ উচ্চতা নির্দেশ করে।

সম্প্রতি আরেকজন নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে আমি লিখেছিলাম, কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। রাজনীতিবিদদের জন্য সমালোচনা থাকবেই। সে-কথার পুনরুক্তি করে বলতে চাই, একজন মানুষের জীবনাবসান হলে তাঁকে স্মরণ ও মূল্যায়ন তাঁর জীবনের সামগ্রিকতায় হওয়া উচিত। এখন ফেসবুকের মতো উন্মুক্ত পরিসরে দেখা যাচ্ছে কিছু অর্বাচীন ও বিদ্বেষ পোষণকারী মানুষ সদ্যমৃত ব্যক্তিদের প্রতিও এমন অসম্মানজনক উক্তি করছে যা সামাজিক রুচি ও শালীনতাকে আহত করে। দায়িত্ব পালন করতে গেলে সকলেরই কিছু-না-কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটে। সাহারা খাতুনের কী এমন সমালোচনা আছে? সাংবাদিক সাগর-রুনির ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অপরাধী ধরার সংকল্প প্রসঙ্গে তিনি যদি ‘৪৮ ঘন্টা’ শব্দ দুটো উচ্চারণ না করতেন তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কী বলার ছিল? পরবর্তী আট বছরেও রাষ্ট্রযন্ত্র সাগর-রুনি মামলা এগিয়ে নিতে পারলো না। বেফাঁসে বলা দুটি শব্দ কি কোনো মানুষের সারা জীবনের অবদান ঢেকে দিতে পারে? এই কুৎসাকারী অর্বাচীনরা কেবল করুণা, ঘৃণা ও উপেক্ষার যোগ্য।

স্মৃতি:
৩৭ বছর আগের একটি ঘটনাসূত্রে আমার স্মৃতি উল্লেখ করছি। এখানে আমাদের জাতীয় রাজনীতি ও নারীর ক্ষমতায়ন উভয় ক্ষেত্রে বিপুল অবদান রাখা তিন নেত্রী রয়েছেন।

রাষ্ট্রক্ষমতা জবর দখলকারী হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আগুনঝরা আন্দোলনের কেবল সূচনা। ১৯৮৩ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ড. কামাল হোসেনের বাসায় বৈঠকরত ১৫-দলের নেতারা গ্রেফতার হয়ে গেলেন। খবর সংগ্রহ করতে গেলে বাইরে রাস্তায় নিজের মোটরসাইকেলে বসা অবস্থায় আর্মির লোকজন আমাকে ধরে নিয়ে গেল। যে ভ্যানে ওঠালো সেখানে আরও দু’জনকে পেলাম পরে যাদের পরিচয় জেনেছি একজন তৎকালীন নগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক লাইসুজ্জামান ও অপরজন যুবলীগের কর্মী, নাম শুধু খোকা মনে আছে। আমার পূর্বপ্রকাশিত একটি লেখা থেকে প্রাসঙ্গিক অল্প অংশ উদ্ধৃত করছি:

“…গাড়ি যে বাড়িটাতে এলো তা ১ নং হেয়ার স্ট্রিটে মন্ত্রিদের নির্ধারিত বাড়ি, ঢোকার মুখের নামফলক অনুযায়ী তখন সেখানে ‘এক নম্বর সংক্ষিপ্ত সামরিক আইন আদালত’ স্থাপিত। সে বাড়িটি এখন নেই। আমাদের তিনজনকে নামিয়ে বারান্দায় দাঁড় করানো হলো। ঘরের ভেতরে দফতর। বারান্দায় একটি চেয়ার ছিল। ক্যাপ্টেন আমাদের বললেন, ‘সিট ডাউন’। আমরা মুহূর্তটুকু কিংকর্তব্য স্থির করছি, আর খোকা সেই চেয়ারটার দিকে এগিয়ে যেতেই ক্যাপ্টেন পায়ের বুট দিয়ে তার কোমরে সজোরে এক লাথি কষালেন। খোকা কোঁৎ করে শব্দ তুলে মেঝেতে পড়ে গেলেন। আমাদের তিনজনের প্রতি ক্যাপ্টেনের হুঙ্কার, ‘সিট অন দ্য ফ্লোর।’ আমরা যন্ত্রবৎ মেঝেতে বসে পড়লাম। খোকা ধাতস্থ হতে সময় নিল।

আমাদের নাম-ধাম, পেশার পরিচয় লিখে নেওয়া হলো। দুপুর গড়িয়ে গেছে। বারান্দাতেই অ্যালুমিনিয়ামের থালায় একত্রে ভাত-মাংস-ডাল ও মগে পানি এলো। একই সময় দেখছিলাম পাশের অন্য একটি ঘরে ট্রেতে করে চিনামাটির বাসনকোসনে ছুরি-কাঁটা-চামচসমেত খাদ্য যাচ্ছে। আমরা মনে করেছি সামরিক অফিসারদের আহার। তখন ঘুণাক্ষরেও জানি না কী বিস্ময় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। জানালার পর্দা সরে যায়, আর নারীকণ্ঠ শোনা যায়। বিস্ময়ভরা উক্তি শুনলাম, ‘মঞ্জু না? আর… লাইসুজ্জামান!’ চিনতে ভুল হলো না, মতিয়া চৌধুরীর কণ্ঠস্বর। মঞ্জু আমার ডাক নাম। তারপর বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও সন্দেহ ছিল না, শুনলাম শেখ হাসিনার কণ্ঠস্বর। ওঁরা আমাদের দেখলেও আমরা নড়েচড়ে জানালার দিকে চোখ মেলতেও সাহস পাচ্ছিলাম না খোকার লাথি খাওয়ার অভিজ্ঞতায়। ওই ঘরে তিনজন বন্দি ছিলেন। তৃতীয় জন অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন। আমাদের একটু আগেই ড. কামালের বাসা থেকে এনে তাঁদের এখানে রাখা হয়েছে।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে এসে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে আওয়ামী লীগের হাল ধরার পৌনে দু’বছর পর ও-ই তিনি প্রথম গ্রেফতার হন। সে যাত্রা জেল পর্যন্ত গন্তব্য ছিল না। চার দিন পর শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। …

সেদিনের কথায় আসি। শেখ হাসিনা সরব হলেন। তাঁর ঘরে মেজর পর্যায়ের এক সেনাকর্তা এসে কথা বললেন। শেখ হাসিনার দাবি, আমাদের তিনজনের একজন সাংবাদিক, দু’জন রাজনৈতিক কর্মী। আমাদের কেন বারান্দায় বসিয়ে রাখা হয়েছে? বলা হলো, আমাদের তিনজনকে মর্যাদার সঙ্গে অন্য একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা ও সমমানের খাবার না দিলে তাঁরা তিন নেত্রীও খাবেন না। অবশেষে সেনাকর্তারা অনুরোধ করলেন, এ বেলা এভাবে চলুক, রাতে আমাদের ঘরের ব্যবস্থা করা হবে। দুপুরে খাওয়ার পর সারা বিকেল মতিয়া চৌধুরী গলা ছেড়ে একের পর এক গণসঙ্গীত ও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গান গাইলেন। গলা মেলাতে শেখ হাসিনাও কম যান না।

সন্ধ্যায় বারান্দাতেই আমাদের জন্য কম্বল এসেছিল। তবে রাত ৮টা নাগাদ ঘরের ভেতরে নেওয়া হলো, ভালো বিছানা ও সমমানের খাদ্যও এলো। নইলে শীতে না জানি কী কষ্টই পেতাম।…

পরের দিন বিকেলে বোঝা গেল আমাদের তিনজনকে অন্য কোথাও নেওয়া হবে। ব্যাজ দেখে বুঝলাম একজন কর্নেল প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন। আমাদের একজন একজন করে পাশের অফিসঘরে নিয়ে টেবিলে রাখা টেলিফোন দেখিয়ে বলা হলো, বাড়িতে ফোন করে বলতে হবে লুঙ্গি-গামছা-জামা-টুথব্রাশ-রেজর রমনা থানায় পৌঁছে দিতে। কোথায় আছি তা ইঙ্গিতেও বলা যাবে না। একটা শব্দও বেশি বলা যাবে না। ভয় দেখিয়ে বলা হলো, ‘এখানে পিটিয়ে মেরে ফেললেও কেউ কিছু জানতে পারবে না।’…

… ফোন ছেড়ে উঠে দেখি দফতর কক্ষে শেখ হাসিনা। তিনি জানতে চাইলেন আমাদের ক্যান্টনমেন্টে নেওয়া হচ্ছে কি-না। কর্নেল বললেন, না। তিনি শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করলেন, এদের কোনো টর্চার করা হবে না। বেরুনোর সময় শেখ হাসিনা বললেন, ‘ভয় পাবেন না, সাহস রাখেন, কিছু করবে না।’ ‘টাকা-পয়সা কিছু আছে?’ প্রশ্ন
করেই জবাবের অপেক্ষা না করে তিনি আমার পকেটে এক শ’ টাকার একটি নোট গুঁজে দিলেন। পেছন থেকে একটি শক্ত হাতের ঠেলা পেয়ে দরজার বাইরে গলিয়ে গেলাম।

এই এক শ’ টাকার পরবর্তী ইতিহাস করুণ ও কৌতুককর।…”

না। থাক। সে ইতিহাস এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। আমার স্মৃতিকথাটি বিস্তারিত অনেক বছর আগে দৈনিক সমকালে ছাপা হয়েছিল। এই কাহিনীতে যাঁদের নাম আছে তাঁদের মধ্যে লাইসুজ্জামান ও খোকা প্রয়াত হয়েছেন আগেই। বৃহস্পতিবার রাতে চলে গেলেন সাহারা খাতুন।

ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত