প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাব্বির আহমেদ: গ্লোব বায়োটেক কি ২০-৩০ হাজার ট্রায়াল ভলান্টিয়ার আকৃষ্ট করতে পারবে?

সাব্বির আহমেদ : গ্লোব বায়োটেক প্রেস কনফারেন্স করে বললো, তারা করোনার candidate vaccine তৈরি করেছে। আমরা এ নিয়ে কী তুলকালাম কাণ্ডই না করছি! Candidate Vaccine আর ‘Vaccine এর মধ্যে আকাশ আর পাতালের ফারাক। আমাদের কি তা বুঝতে সমস্যা হচ্ছে? ভাইরাস ভ্যাকসিনের টেকনোলজিক্যাল দর্শন খুব সরল : ভাইরাসের অংশবিশেষ (RNA, DNA, Protein Subunit, Non-replicating virus vector) বা মৃত/দুর্বল (inactivated) ভাইরাস মানুষের বায়োলজিক্যাল সিস্টেমে ঢুকিয়ে তার সাথে দেহের সৈনিক সেলগুলোর পরিচয় ঘটিয়ে দেয়া, যাতে মূল ভাইরাসটা পরে কখনও দেহে ঢুকলে দেহের ডিফেন্স সিস্টেম চট করে তাকে চিনে ফেলে এবং শেকড় গাড়ার আগেই মেরে ফেলে।

সার্স, মার্স, ইবোলা নিয়ে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার সূত্রে ভ্যাকসিন টেকনোলজির ভালো গ্লোবালাইজেশন হয়েছে। তাই করোনার candidate vaccine তৈরি এখন তেমন দুরূহ-দুর্বোধ্য কাজ নয়। উন্নত বিশ্বের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান জানুয়ারিতেই candidate vaccine  করে ফেলেছে। উন্নয়নশীল অনেক দেশও ফেব্রুয়ারি-মার্চে candidate vaccine বানিয়ে তার উপর কাজ করছে। বিশ্বের সব বায়োটেক ল্যাব আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বায়োরিসার্চ সেন্টারে খোঁজ নিলে দেখা যাবে অসংখ্য candidate vaccine এর মধ্যে তৈরি হয়ে আছে। candidate vaccine ডিজাইন করা মোটামুটি প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। বেশিরভাগ গবেষকরা এতো প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করেন না। প্রিক্লিনিক্যালের উচ্চতর ধাপে বা হিউম্যান ট্রায়ালে গেলে এগুলো নিউজে আসে।
অবশ্য বেশিরভাগ ক্যান্ডিডেইট ভ্যাকসিন হিউম্যান ট্রায়ালে যায় না। প্রিক্লিনিক্যাল পর্যায়ে থেমে যায়। তার কারণ, করোনার ভ্যাকসিন তৈরি যতটা না “ডিসকভারি”, তার চেয়ে অনেক বেশি ‘ভেঞ্চার’। খুব high-investment ভেঞ্চার। অনেকটা মহাকাশ মিশনের spacecraft বানানোর মতো। উৎকর্ষতম প্রযুক্তি লাগে, State-of-the art ল্যাব লাগে, সেরা বিজ্ঞানী-বায়োটেকনোলজিস্ট লাগে। আর বিশাল অংকের বিনিয়োগ লাগে। উৎপাদন-সাপ্লাইয়ের কথা পরে,minimum standard  বজায় রেখে প্রিক্লিনিক্যাল আর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করতেই লাগে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মতো। টাকার অংকে বললে, দুই হাজার কোটি! [২] এতো টাকা কেন লাগে? ভ্যাকসিন তৈরির ৪ টা পর্ব। প্রথমে আসে Explorator পর্ব : যেখানে candidate vaccine ডেভেলাপ করে ছোট ছোট প্রাণীর উপর তার কার্যকারিতা দেখা হয়। এটা ল্যাবেই হয়; খরচ তেমন নেই।

এখানে সফলতা পেলে যাওয়া হয় Preclinical Evaluation পর্বে। অ্যানিমেল ট্রায়াল পর্ব এটা। প্রথমে ইদুর, গিনিপিগ, খরগোশ, পরে বানরের উপর সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ট্রায়াল হয়। বিশ্বের অনেক দেশ/প্রতিষ্ঠান এ পর্বে আছে। ২ জুলাই পর্যন্ত বিশ্বে মোট ১২৯ টা ক্যান্ডিডেইট ভ্যাকসিন WHO এর প্রিক্লিনিক্যাল মূল্যায়ন তালিকায় আছে। এর মধ্যে মিশর আছে, ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম আছে। আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া, কাজাখস্তান আছে। উন্নত দেশগুলো তো আছেই। সব কিছু ‘পারফেক্ট’ পাওয়া গেলে Clinical Evaluation (হিউম্যান ট্রায়াল) পর্ব শুরু হয়। WHO এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮টা candidate vaccine এ মুহূর্তে Clinical Evaluation পর্বে আছে।

হিউম্যান ট্রায়ালটা হয় তিন ধাপে। প্রথম ধাপে অল্প সংখ্যক হিউম্যান ভলান্টিয়ারের উপর ট্রায়াল করে ভ্যাকসিনের efficacy আর safety দেখা হয়। দ্বিতীয় ধাপে দেখা হয় ভ্যাকসিনটা সবার জন্য নিরাপদ কি না, কার কী ধরনের পার্শ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, কাকে কী ফড়ংব দিতে হবে, ইত্যাদি বিষয়। এ কারণে ট্রায়ালে বিভিন্ন বয়স ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে অন্তর্ভূক্ত করতে হয়। তৃতীয় ধাপে একই ট্রায়াল হয়, তবে আরো বিস্তৃত পরিসরে; হাজার হাজার মানুষ নিয়ে। সবকিছু ঠিক থাকলে আসে শেষ পর্ব : Vaccine Production and Distribution.

ভ্যাকসিন নিয়ে সমস্যা হলো, এটা শরীরে ঢুকে বায়োলজিক্যাল সিস্টেমের অংশ হয়ে যায়। তাই ঠিকমতো কাজ না করলে, malfunction করলে অনাকাক্সিক্ষত স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে, জীবন বিপন্ন হতে পারে। করোনা ভ্যাকসিনের ব্যবহারকারী হবে কোটি কোটি মানুষ। ফলে ঝুঁকির মাত্রাও এখানে সীমাহীন। সামান্য ভুল হলে অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে; ভ্যাকসিন গবেষক-উৎপাদক-সাপ্লায়ারের অস্তিত্ব বিলীন হবে, জেল জরিমানা হবে। বড় Business RiskI আছে। হিউম্যান ট্রায়াল সফল না হলে, অন্যরা আগে বাজারে ভ্যাকসিন নিয়ে আসলে, বা ভ্যাকসিনটা মানুষ পছন্দ না করলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ জলে যাবে।

এ কারণেই, সরকারি অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো বায়োটেক বা ফার্মা কোম্পানি ভ্যাকসিন উৎপাদনে হাত দেয় না। সরকারি অর্থ শুরুতে আসে R&D funding হিসেবে। পরে আসে advance purchase commitment হিসেবে। ভ্যাকসিন দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের Moderna-NIAID, যুক্তরাজ্যের Oxford University-AstraZenec এবং চীনের CanSino-BIB। এরা সবাই যৌথ উদ্যোগ। আমরা দেখেছি, বৃটিশ সরকার সারা গিলবার্টকে ভ্যাকসিন রিসার্চের অর্থ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার মডার্নাকে দিয়েছে ৪৮৫ মিলিয়ন ডলার, Oxford-AstraZenec কে দিয়েছে ১.২ বিলিয়ন ডলার! CanSino- BIB কে অর্থায়ন করেছে চীন। এগিয়ে থাকা তিনটি ক্যান্ডিডেইটই সম্ভবত সফল হবে এবং ভ্যাকসিন বাজারে আনবে। এতে সুবিধাই হবে। সোর্স ডাইভারসিফিকেশনের কারণে কোনো একক ব্লকের কাছে াvaccine monopoly থাকবে না। Vaccine Nationalism এর আশংকাও থাকবে না; প্রোডাকশন লাইসেন্স এর আওতায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে ভ্যাকসিন বানানো শুরু করা যাবে। (ভারতের Serum Institute যেমন Oxford-AstraZenec এর সাথে উৎপাদন চুক্তি করে ফেলেছে)।

[৩] গ্লোব বায়োটেক এ দেশের কোম্পানি; তারা সত্যিকার অর্থে বড় কিছু করলে তা সবার মতো আমাকেও আবেগতাড়িত করবে। তবে আমি বিজ্ঞান আর যুক্তিকেও আবেগের পাশে রাখি। নিজের ভেতর প্রশ্ন চলে এলে আমি থামিয়ে দেইনা। প্রশ্নগুলো শুনি। উত্তর খুঁজি। এই যেমন, আমার ভেতর এখন অনেক প্রশ্ন আসছে। গ্লোব বায়োটেক Exploration আর Preclinical এর মাঝামাঝি আছে; তারা কি হিউম্যান ট্রায়ালের শেষ ধাপ পর্যন্ত যাবে? তখন হাজার হাজার ভলান্টিয়ারের উপর এ ক্যান্ডিডেইট ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে হবে। (Moderna তৃতীয় ধাপে মোট ৩২ হাজার জনের উপর ট্রায়াল করছে)। গ্লোব বায়োটেক কি ২০-৩০ হাজার ট্রায়াল ভলান্টিয়ার আকৃষ্ট করতে পারবে?

ঠিকমতো প্রোটোকল মেনে করোনা ভ্যাকসিনের হিউম্যান ট্রায়াল শেষ করতেই দুই হাজার কোটি টাকা লাগার কথা। তাদের কি সেই বিনিয়োগ সামর্থ আছে? কারা তাদেরকে টাকা দিবে? সরকার? ব্যাংক? জয়েন্ট ভেঞ্চার করবে? ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে টাকা তুলবে? ভ্যাকসিনের পারফরমেন্স প্রিসিশন বোঝার জন্য যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি লাগে তা কি তাদের আছে? উন্নয়নশীল দেশগুলোর যারা vaccine নিয়ে কাজ করছে তারা কোনো না কোনো নামী বিশ্ববিদ্যালয় বা ল্যাবের সাথে যুক্ত হয়েছে। Human life matters গ্লোব বায়োটেক কাদের সাথে collaboration করছে? এদেশে আমরা শিশুদের প্যারাসিটামলে ভেজাল দিই। করোনা গোপন করে ডাক্তারদেরকে আক্রান্ত করি; তারা দলে দলে মারা যায়। ভুয়া কাগজে ঋণ নিয়ে ব্যাংক খালি করে ফেলি; আমানতকারীরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে। আমার বিশ্বাসের ভিত কতোবার যে নড়েছে।

[৪] প্রেস কনফারেন্সে ড. আসিফ মাহমুদের উপস্থাপনা ভালো লেগেছে। খুব গোছানো, পরিপাটি। তার আবেগতাড়িত হয়ে পড়াটাও সবাইকে নাড়া দিয়েছে। তবে তিনি সানোফি, নোভার্টিস, মার্ক, জনসনের রিসার্চ প্ল্যানিংয়ের দিনতারিখ উল্লেখ করে, করোনা ভ্যাকসিন কাজে তাদের পিছিয়ে থাকার ইংগিত করে যেভাবে বলেছেন ‘…. many big boys are lagging behind’ সেটা ভালো লাগেনি। করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে করা প্রেস কনফারেন্সের ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্স থাকে। অনেক শেয়ার হয়; দেশে বিদেশে অনেকে শুনে। এখানে এভাবে কারো নাম ধরে কিছু না বললেই ভালো লাগতো। ইন্ডাস্ট্রি etiquetteবলে একটা জিনিষ আছে। সেটা মানতে হবে। তাছাড়া, সানোফি-জনসন-মার্কের মতো জায়ান্টরা কি তাদের R&D সিক্রেট জানতে দেয়?

ড. আসিফ আরও বলেছেন, সানোফি, নোভার্টিস, মার্ক, জনসনকে ছাড়িয়ে গ্লোব বায়োটেকের Top ৫০ তে চলে আসার চান্স আছে। কাম অন, ম্যান! গ্লোব বায়োটেক বাতিঘর হোক। কোয়ালিটি মেডিসিনের জন্য পৃথিবী জুড়ে তাদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ুক। মানুষের জন্য কমদামে মানসম্মত ওষুধ বানিয়ে তারা উদাহরণ হোক। তখন তাদের অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসিয়ে দেবো। তবে আমরা আবেগী জাতি। আবেগ যখন উথলে উঠে, তোড়ে ভেসে যাই। নিজে ভেসে যাই, ক্ষতি নেই; অন্যকে টেনে নিতে না চাইলেই হতো। কিন্তু তা হচ্ছে না। ভাইরাল হওয়া একটা পোস্ট থেকে quote করি : ‘আসিফ মাহমুদ ভাই যখন বলছিলেন যে আমরা করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছি, কথাটি বলতে বলতেই উনার কাঁন্না চলে আসছে! বাংলাদেশের একটি প্রতিষ্ঠান সাহস নিয়ে দাবি তো করতে পারল যে তারা আবিষ্কার করছে, সফল হোক ব্যর্থ হোক সেটা পরের বিষয়। অথচ আমরা একটা অভিনন্দন পর্যন্ত জানালাম না। চীন বা আমেরিকা এই দাবি করলে এই আমরাই আবার অভিনন্দনে অভিনন্দন জানিয়ে বাংলার আকাশ বাতাস মাতিয়ে দিতাম, আসলেই আমরা এক ভণ্ড জাতি। বিন্দু পরিমাণ কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদেরই নেই, এই জন্য এদেশে জ্ঞানী মানুষ জন্মায় না। কারণ জ্ঞানীদের কদর এদেশে নেই।’ আপনার ভাইরালের মিছিলে আমি যোগ দিইনি। জোরালো কোনো কারণও দেখিনি। কিন্তু এতেই আমি ভণ্ড হয়ে গেলাম কেন বুঝতে পারছি না। নিজের পরিমিতিবোধ নিয়ে আমার তো বরং গর্ব হচ্ছে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত