প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জাকারিয়া চৌধুরী : কোভিড, একটা নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখুন

জাকারিয়া চৌধুরী : দিন কয় আগে পত্রিকায় রোগীদের ভোগান্তি বিষয়ক একটা লেখা পড়েছিলাম। সেখানে রোগী দায়িত্বরত একজন নার্সকে জিজ্ঞেস করলেন – আমাকে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে রেখেছেন কেন? আমার তো কোন শ্বাসকষ্ট নেই।-

উত্তরে নার্স বললেন আপনার ইচ্ছা হলে সেটা খুলে রাখতে পারেন।যাবার বেলায় বিল হাতে পেয়ে রোগীর তো অবস্থা খারাপ। এখানে অক্সিজেনের বিল ধরা হয়েছে 37000 প্লাস টাকা। আপনি হয়তো ভাবছেন এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটাচ্ছেন ঢাকার নামকরা গুটিকয়েক হসপিটাল। এসব বিল দেয়ার সামর্থ্য যাদের আছে তারাই সেখানে যায়। এটাই ভাবছেন তো ? যারাএসবের হোতা তাদের অনেকেই সরকারের খুব কাছের লোক। এরা অবশ্য সবারই আপনজন। পাঠক চলুন এবার প্রাসঙ্গিক আলোচনায় যাই।


আমাদের দেশ সহ বিভিন্ন দেশে মেডিকেল পারপাসে যে অক্সিজেনের ব্যবহার হয় সে সব অক্সিজেন ভরা থাকে সেন্ট্রাল অক্সিজেন স্টোরেজ ট্যাংকে। স্টোরেজ ট্যাংক হাই প্রেসারাইজড হয়ে সেসব অক্সিজেন ঘনীভূত লিকুইড ফর্মে থাকে। এ পদ্ধতিতে বিপুল পরিমান অক্সিজেন অল্প স্থানে দীর্ঘদিন পর্যন্ত সংরক্ষন করা সম্ভব। চাহিদা অনুযায়ী কিংবা চাহিদার পরিমান যতই বাড়তে থাকুক না কেন, এভাবে একই সময়ে একই সাথে অক্সিজেন বাষ্পীভূত হয়ে তামার পাইপের মাধ্যমে পুরো হসপিটালের প্রতিটি বেডে চালনা করা হয়। যার যখন দরকার হয় তখন সেটাকে সেভাবেই ব্যবহার করা হয়। এই ঘনীভূত তরল অক্সিজেন এবং সেটি কিভাবে বাষ্পে পরিণত হয় চলুন তার একটি চার্ট দেখি।

অক্সিজেন মলিকিউলার ফর্মুলা O2

মলিকিউলার ওয়েট থার্টি 31.99।

বয়েলিং পয়েন্ট @ 1 atm is ( – ) 183 ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ফ্রীজিং পয়েন্ট @ 1 atm is ( – ) 218 ডিগ্রি সেলসিয়াস।


পাঠক আপনারা এখানে অক্সিজেনের ফ্রোজেন এবং নন ফ্রোজেন টেম্পারেচার কত ছিল তা মনে রাখুন। কি আঁতকে ওঠার মতো? এই ঠান্ডা অক্সিজেন সরবরাহ করা হয় ? না, মোটেও না। আপনি নিশ্চয়ই এটা বলবেন না এটার মনিটরিং হয় না কিংবা টেম্পারেচার রেগুলেট না করেই রোগীকে তা সরবরাহ করা হয়। আসলেই কি তা মনিটরিং করা যায় ? হা যায় কিন্তু করছে টা কে ? এই অক্সিজেন এর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেই রোগীর ফুসফুসে প্রবেশ করানো হয়। কাজটা করা যায় দুই ভাবে। ম্যানুয়ালি এবং অটোমেটিক্যালি। অটোমেটিক্যালি করতে গেলে সেই মানের ভেন্টিলেটর দেশের কয়টা হসপিটালে আছে ? সেসবের সংখ্যা-ই বা কত ? ধরি ৫০০ অটোমেটিক ভেন্টিলেটর আমাদের আছে। তা দিয়ে সর্বোচ্চ ৫০০০ জনকে একই সাথে ভ্যান্টিলেশন দেয়া সম্ভব। ম্যানুয়ালি কন্ট্রোল করা যায় যেসব ভেন্টিলেটর আছে সেগুলোর সংখ্যাও যদি পাঁচশো ধরি তাহলেও ইমার্জেন্সি অক্সিজেন পায় সর্বমোট ১০০০০ জন। আমাদের দেশে এই মুহুর্তে কোডিডে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কত ? এবং সেটা প্রতিদিন কি হারে বাড়ছে ভাবতে পারেন ? আমি পারিনা। কারন কোভিড ওয়ার্ডে কাজ করেছি। বেসরকারী পর্যায়ে রাত প্রতি কুড়ি হাজার টাকা রুম ভাড়া দিয়েও যে হাল দেখেছি তা উল্লেখ করা সম্ভব নয়। যদি সকল ভেন্টিলেটরও অত্যাধুনিক অটোমেটিকও হয় তাতেও এরচে বেশি রোগীকে সার্ভিস দেয়া সম্ভব নয়।

আবার মেকানিক্যালি করতে গেলে সেই লেভেলের মেকানিক্স কয়জন আছে ? ১০০-২০০-৩০০-৫০০।…..??? একটা মেশিন এক্টিভ রাখতেই ত ২৪ ঘন্টায় তিনজনের তিন শিফটের ডিউটি করতে হবে। তাহলে এই ৫০০ জন কয়টা মেশিনের রেগুলেশন মনিটর করবে ? তারা কে কয়জন কখন কোথায় কাজ করেন জানেন কেউ ?অনেক প্রশ্নের মত এসবের উত্তরও জানা হয় না কখনো। চলুন আবার অক্সিজেনের কথায় ফিরে যাই। আপনারা এতক্ষনে জেনে গেলেন, হাল আমলের ভেন্টিলেটর গুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অটোমেটিক্যালি চালিত। ফলে ধরে নেই সেটি দিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেই অক্সিজেন শরীরে প্রবেশ করানো হয়। হ্যাঁ, ভেন্টিলেটর তাপমাত্রা রেগুলেট করে। কিন্তু এর পরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? আপনি হয়তো ভাবছেন ভেন্টিলেটর থেকে বের হওয়া অক্সিজেন তামার পাইপে করে আর কতক্ষনই বা চলে। চলে কম ই । গড়ে কুড়িটা পেশেন্টের আইসিইউতে সরবরাহ করা অক্সিজেন কয়েকশো ফিট তামার পাইপ অতিক্রম করে। আইসিইউর গড় তাপমাত্রা কত জানেন? কুড়ি থেকে 25 ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। ফলে তামার পাইপগুলোর তাপমাত্রা কক্ষতাপমাত্রার নিয়মানুযায়ী একই থাকে। এ দিয়ে প্রবাহিত অক্সিজেন এর তাপমাত্রা এর কম হতে পারে বেশী নয় কিছুতেই। এমন আরামদায়ক পরিবেশ আমরা যেমন ছাড়তে চাই না তেমনি ছাড়তে চায় না কেউই। সেটা ভাইরাস বলুন কিংবা ব্যাকটেরিয়া। আয়েশী পরিবেশে শর্তহীন বসবাসের সুযোগ যদি পান, আপনি কি তা অকারনে ছেড়ে চলে আসতে পারবেন? বাস্তবতা হচ্ছে পারবেন না। সুখ কেউ হারাতে চায় না। বাংলাদেশ ছেড়ে নিশ্চয়ই সাহারার মরুতে আপনি আনন্দিত হতেন না। ভাইরাসগুলো সেরকম। বেঁচে ওঠার সুযোগ যখন পায় তখন তারা আমাদের শরীরে তাদের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক স্থানকেই বেছে নেয়। কোন না কোনভাবে এরাও তো প্রাণী তাই না !! তো সেই আরামদায়ক স্থানটা কোথায়, ভেবে দেখেছেন কখনো ? সেটি হলো ফ্যারিংস এর শেষ অংশ এবং লেরিংস এর প্রথমাংশ। যাকে লোকালি কন্ডা বলি Adam’s Apple.

এখানেই কেন তারা এসে জড়ো হয় ? কারণ এখানে কিছু কফ সব সময় জমা থাকে। এই কফই শ্লেষ্মা বা swab. কদমফুল আকৃতির ভাইরাসগুলো এখানে প্রথম তাদের কলোনি বানায়। কিভাবে বানায়? তারা সেখানকার সুস্থ সেলবা কোষে প্রবেশ করতে থাকে কোষের দেয়াল ভেদ করে। সুস্থ কোষ একে একে অসুস্থ হতে থাকে। প্রথমে হাজারে হাজারে হয়, পরে হয় মিলিওন মিলিওন। কলোনি বানানো শেষ হলে পেশেন্ট প্রথম অনুভব করে গলায় কিছুটা শুষ্ক কাশি হচ্ছে। করোনা টেস্টের জন্য এটাই কি মোক্ষম সময় ? মোটেও না । কারণ এখনও তারা টার্গেটে এরিয়ায় গিয়ে পৌঁছয়নি, তারা নিম্নমুখী চলমান অবস্থায় রয়েছে। এদিকে আপনার গায়ের টেম্পারেচার বাড়ছে, অথবা পেট খারাপ হচ্ছে, অথবা অন্য কোন লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। কিংবা কোনো লক্ষণই প্রকাশ পাচ্ছে না। এমন অবস্থাতেই সেখানে প্রতিটা ভাইরাস এক একটা সুস্থ সেল কে আক্রমণ করে এবং নিজেদের কলোনি প্রতিষ্ঠা করে। সেই কলোনিতে তাদের শুরু হয় মাল্টিপ্লিকেশন। এই মাল্টিপ্লিকেশন প্রসেস শুরুতেই দুই ভাগে ভাগ হয়। এক ভাগ যেতে থাকে স্টমাক এর লাইন ধরে। অন্য ভাগ আবার বিভক্ত হয়ে দুই ফুসফুসে চলে যায়। স্টমাকে যারা যায় তাদের বেশিরভাগই মরে স্টমাক এর এসিড দ্বারা। আর যে কিছু বেঁচে থাকে তারাই মূলত স্টমাক আপসেটের কারণ। আমি একটা বিষয় ভেবে খুব অবাক হই অনলাইনে ঝুলিয়ে রাখা প্রেসক্রিপশন মানুষ কিভাবে গিলে খাচ্ছে। রানিং ডায়রিয়ার একজন সিনিয়র সিটিজেনও দেদারসে সেসব প্রেসক্রিপশন ফলো করে ডক্সিসাইক্লিন সহ আজেবাজে ওষুধ কিনে খাচ্ছে। এমন অবস্থায় ডক্সিসাইক্লিন হিউম্যান কিলার হিসেবে কাজ করতে পারে। কি বিশ্বাস হয়না তাইনা? নিচে একটা লিঙ্ক দিচ্ছি, ইচ্ছে হলে যে কেউ চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন। http://www.webmd.com/lung/Covid-19. সেখানে ডাইজেস্টিভ সিমটম হিসেবে ডায়রিয়া/বমিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে ডক্সিসাইক্লিন কে ইনহেবিশন করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এটি শরীরে কার্যকর থাকা অবস্থায় ডায়রিয়া,বমি এবং পেটে ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। It slows down your recovery progress….

এবার চলুন ফুসফুসের দিকে ফিরে তাকাই। মনে পড়ে আপনার গলার কোথায় প্রথমে শুকনো কাশির মতো ইরিটেশন হচ্ছিল ? গলার যেখান থেকে ভাইরাস গুলো ঘর বানাতে শুরু করেছিল , সেখান থেকে নামতে নামতে একসময় পুরো ফুসফুস ভরে ওঠে এই ভাইরাসে। ফুসফুসের কোথায় তারা অবস্থান করে এটা নিশ্চয়ই জানতে চাইছেন? আপনারা সকলেই জানেন যে, ফুসফুসে রক্ত শোধন হয়। শোধিত রক্ত সারাদেহে পরিবহন হয়। অপরিশোধিত রক্ত জমা হয় হ্রৎপিন্ডে। সেখান থেকে ফুসফুসে গিয়ে শোধিত হয়। এই চক্রের বিরাম নাই। বিশ্রাম নাই। রক্ত ফুসফুসের কোথায় শোধন হয়? এ্যালভিওলাই/ এ্যালভিওলাস নামক মিলিওন মিলিওন ফুসফুসের মাইক্রোসেল সেই শোধনের কাজটা করে শোধিত রক্ত হ্রিৎপিন্ডের অন্যপাশের কুঠুরিতে পাঠায়। এই এ্যালভিওলাসে সে নিজেকে স্টিক করে নেয়। কদম ফুলের মত ভাইরাসটার যখন এতগুলো স্টিকি সেন্সর আছে তখন চাইলেও একে আপনি দ্রুত ফ্ল্যাশ আউট করতে পারবেন না। তারা নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি সেইসব অতিপ্রয়োজনীয় এ্যালভিউলাসকে ছিদ্র করে ঢুকে পরে এবং নিজেদের অবিরাম মাল্টিপ্লিকেশন চালিয়ে যেতে থাকে। আর সেসব আক্রান্ত এ্যালভিওলাই গুলোর ভেতর জমা হতে থাকে নানান ফ্লুইড, পুজ, রক্ত। ফুসফুসের ভর বাড়তে থাকে কিন্তু এক্টিভিটি প্রথমে খুব সামান্য আকারে কমতে থাকে কিন্তু সপ্তাহখানিকের মধ্যেই সেটা কারো কারো ক্ষেত্রে এক্সট্রিম লেভেলে চলে যায়। এমন এক্সট্রিম অবস্থা এলেই মানুষের মধ্যে হুশ আসে। তার আত্মীয় স্বজনেরা হসপিটালে এসে ডাক্তারের কলার চেপে ধরে বলে – কত চাস ? কত টাকা হলে তুই আমার রিতার আব্বুকে আই সি ইউ দিবি, বল শালে !!! এই ঘোড়ার দল জানে না, আই সি ইউ কে পাবে কে পাবে না তা ডাক্তারের ইছেয় কোভিডের এই দু:সময়ে অন্তত হচ্ছে না।

এদেশে তরুনরাও মারা যাচ্ছে বয়স্কদের সাথে পাল্লা দিয়ে। অনেকেরই শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যার পুর্ব অভিজ্ঞতা নেই। আমি যখন শ্বাসকষ্টে ভুগছিলাম- প্রথম দিন এসি চালু থাকা অবস্থাতেও গায়ের গ্যাঞ্জি, ট্রাউজার ছিড়ে ফেলেছিলাম। তখনও বুঝিনি শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ঘাটতি হলে কেমন লাগে। পাকা ফ্লোরে আমি লাফিয়ে লাফিয়ে উপরে উঠে দড়াম দড়াম নিচে পড়ছিলাম। নিজের অজান্তেই নিজেকে সিপিআর দিয়ে যাওয়া আর কি !! পরের দুই দিনে আমি বুঝতে পারি শ্বাস কষ্টের ভয়াবহতা।

**** পরের পর্বে বাকি কথা হবে। পাঠকের যে কোন প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর/রেমিডি বলার চেষ্টা করা হবে।

এ আর্টিকেলটি সমাপ্ত করতে যাদের পাশে পেয়েছি-

১. ডা জহির উদ্দিন মো:বাবর।
এ্যাসিস্যান্ট প্রফেসর।
এফ সি পি এস ( স্কিন ভিডি )
কুমেক।

২. ডা মো আলমাস হোসেন।
অন কোর্স ( কার্ডিওলজি )
এন আই সি ভি ডি

৩. ডা নাফিজ ইমতিয়াজ উদ্দিন আহমদ
রেজিস্টার
জেনারেল সার্জারি,
কুমেক।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত