প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. শোয়েব সাঈদ : হার্ড ইমিউনিটি এবং বাংলাদেশ

বাংলাদেশে কোভিড পরিস্থিতি এই জুন মাসে ব্যাপক অবনতি হয়েছে এবং এটি অপ্রত্যাশিত ছিল না। মার্চ-এপ্রিলে এক্সপোনেনশিয়াল ধাপের শুরু থেকে ইতালিতে প্রতিদিন হাজারের বেশী সংক্রমণ সংখ্যা ২ মাসের মত স্থায়ী হয়েছে, স্পেনে ছিল আড়াই মাস। বাংলাদেশে মে মাসের ১১ তারিখ থেকে সরকারী হিসেব মত সংক্রমণ সংখ্যা হাজারের বেশী হচ্ছে। এখন এই সংখ্যা কখনো ৪ হাজার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। টেস্ট সংখ্যা বাড়ার ফলে পাল্লা দিয়ে সংক্রমণের সংখ্যাও নজরে আসছে। ইতালিতে পিকে দিনে ৬ হাজার, স্পেনে ৮ হাজার, ফ্রান্সে ৫ হাজার সংক্রমণের রেকর্ড রয়েছে। কানাডায় সফল ব্যবস্থাপনায় দৈনিক সংক্রমণ ২ হাজারের নীচেই থেকেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এক পর্যায়ে দিনে ৩৮ হাজারের রেকর্ড রয়েছে। ভারতে সম্প্রতি দৈনিক ১৬ হাজার আর পাকিস্থানে দৈনিক ৭ হাজারের কাছাকাছি সংক্রমণ দেখা গেছে। বৈশ্বিক ট্রেন্ড যদি এই উপমহাদেশে সত্য হয়, তবে সংক্রমণের ব্যাপকতা আগস্ট মাস অবদি বাংলাদেশে থাকবে বলে মনে হচ্ছে। লকডাউনের শিথিলতায় ঠিক বুঝা যাচ্ছে না আমরা পিকে আছি না পিকের জন্যে অপেক্ষমাণ। ইউরোপ, নর্থ আমেরিকার অভিজ্ঞতায় সংক্রমণ পিকে উঠে নীচের দিকে নামার ধরন স্পষ্ট দৃশ্যমান হতে লেগেছে মাস খানেক।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি বুঝবার জন্যে সমস্যা হচ্ছে টেস্টের কম সংখ্যা। বাংলাদেশে টেস্ট হয়েছে মোট জনসংখ্যা ০.৩৫%, ভারতে ০.৪৪% অথচ ইউরোপ আমেরিকায় টেস্ট হয়েছে মোট জনসংখ্যার ৮-১০% মানুষের। রাশিয়া সবচেয়ে এগিয়ে জনসংখ্যার প্রায় ১১% টেস্টের আওতায় এসেছে।

তবে একটি ট্রেন্ড এখানে তুলনামূলকভাবে বোধগম্য; সংক্রমিত জনগোষ্ঠী আর টেস্টেড জনগোষ্ঠীর হারটি অর্থাৎ কতজনের টেস্ট করে কতজনের সংক্রমণ পাওয়া গেছে তার শতকরা হার। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এটি ৮.৫%, কানাডায় ৪.৫%, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৫-১২%, ভারতে ৬% কিন্তু বাংলাদেশে উদ্বেগজনকভাবে ১৮%। মৃত্যু হারে ইউরোপে যেখানে ১০-১৮% দেখা গেছে সেখানে ভারতে ৩.৩%, বাংলাদেশে ১.৩% (সরকারী ভাষ্য এবং সংজ্ঞা মতে)। মৃত্যুর হার বাংলাদেশে কম, তবে সংক্রমণের হার কখনো কখনো ২০% এর উপরে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন জেলা শহরের যে চিত্র তাতে করোনার বিস্তার সর্বব্যাপী। সংক্রমণের তীব্রতার মধ্যেও লকডাউন কাজ করছে না। যে দেশে দুই কোটির বেশী মানুষ দিনে এনে দিনে খায়, দীর্ঘদিনের লকডাউন সহ্য করার ক্ষমতা তো তাঁদের নেই। অর্থনীতির স্বাস্থ্য বনাম জনসাধারণের স্বাস্থ্য ক্রমশই একে অপরের সাথে অবাঞ্চিত তীব্র প্রতিযোগিতায় “রেললাইন বহে সমান্তরাল” এর চাইতে কে প্রাধান্যে থাকবে সেটিই মুখ্য হয়ে উঠছে।এটি একটি ভীতিকর অবস্থা, ফলে চারিদিকে পরিচিত জনের জন্যে শোকের মিছিল দীর্ঘ হয়েই চলেছে।

কোভিড সংকটে লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব, ড্রাগ, ভ্যাক্সিনের সাথে মাঝে মধ্যে আমরা হার্ড ইমিউনিটির কথা শুনতে পাই। বহুজন প্রশ্ন করেন জনসংখ্যার প্রবল চাপের বাংলাদেশে লকডাউন শিথিলতা আর স্বাস্থ্যবিধি না মানার কালচারে প্রায় ২০% সংক্রমণে হারে আমরা কি হার্ড ইমিউনিটির দিকে এগুচ্ছি কিনা? হার্ড ইমিউনিটি নিয়ে স্বচ্ছ ধারণার অভাবে অনেকেই বিষয়টি সহজভাবে বুঝতে চান।

Herd শব্দের অর্থ হচ্ছে পশুর পাল। পশুর পাল বা মূলত ভেড়ার পালের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ধারণা থেকে হার্ড ইমিউনিটির উৎপত্তি এবং প্রচলন। ভেড়ার পালের মোটামুটি ৮০% এর টিকা বা সংক্রমণের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে পালের সবাই অর্থাৎ বাকী ২০% সহ নিরাপদে থাকে। হার্ড ইমিউনিটি টার্মটির উৎপত্তি শতবর্ষ আগে হলেও খুব ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়নি। এই দশকে এটি বেশী আলোচনায় এসেছে বিশেষ করে কোভিড সংকটে।

কোভিড ভাইরাসের বেঁচে থাকার জন্যে আমাদের অর্থাৎ মানুষের দরকার। আমাদের কোষের বিভিন্ন ম্যাকানিজম ব্যবহার করে কপি করে করে চলে ওদের টিকে থাকা এবং এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে আশ্রয় নিয়ে বিস্তার ঘটানো। আপনি ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত নন কিন্তু এমন মানুষ দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে সুরক্ষিত আছেন যারা সংক্রমণ বা ভ্যাক্সিন থেকে তৈরি হওয়া এন্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ করার সৈন্যদল দ্বারা সংক্রমণ মুক্ত। এই অবস্থাকে এভাবে বলা যায় যে আপনি হার্ড ইমিউনিটি নামক একটা দুর্গের মধ্যে সুরক্ষিত আছেন যেখানে ভাইরাস আপনাকে সংক্রমিত করতে পারছেনা।

হার্ড ইমিনিউটি কাজ করে তবে তার জন্যে বিপুল সংখ্যায় পপুলেশন ইমিউনিটি অর্থাৎ জনগণের ঐ নির্দিষ্ট রোগটির প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকতে হবে। পপুলেশন ইমিউনিটি রোগ সংক্রমণের মাধ্যমে, ভ্যাক্সিনের মাধ্যমে বা মূলত উভয়ভাবে ঘটে থাকে। সংক্রমণের পর যেভাবে শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয় ভ্যাক্সিন নিয়েও একইভাবে এন্টিবডি তৈরি হয় তবে কোন প্রকার সংক্রমণ ছাড়া। বিশেষজ্ঞদের মতে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং হার্ড ইমিউনিটির জন্যে ভ্যাক্সিন হচ্ছে একমাত্র অবলম্বন। পোলিওর হার্ড ইমিনিউটির জন্যে প্রয়োজন ৮০% মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। হুপিং কফ এবং মিসেলস এর ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি কার্যকর থাকার জন্যে জনসংখ্যার ৯০% এর উপরে ইমিউন হওয়া দরকার। মিসেলস খুবই সংক্রামক ফলে এটির হার্ড ইমিউনিটির জন্যে বলা হয় জনসংখ্যার সর্বোচ্চ ৯৪% এর ইমিউনিটি দরকার। পপুলেশন ইমিউনিটি ১০০% কখনো সম্ভব নয়, সমাজের বেশ কিছু মানুষের বয়স আর শারীরিক সমস্যার কারণে ভ্যাক্সিন দেওয়া সম্ভব হয়না।

একটি রোগের হার্ড ইমিউনিটির জন্যে পপুলেশন ইমিনিউটির নির্দিষ্ট একটা থ্রেসহোল্ড লেভেল থাকে এবং এই লেভেলের মধ্যে থাকলে সময়ের ব্যবধানে ভাইরাস নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এভাবেই গুটি বসন্ত উচ্ছেদ হয়েছে এবং পোলিও একই পরিণতি বহন করতে যাচ্ছে। এই নির্দিষ্ট বিপদসীমা অর্থাৎ থ্রেসহোল্ড না মানলে বিপদ ঘুরে ফিরে আসতে পারে। ব্রিটেনে হুপিং কফ আর যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৯ সালে ডিজনিল্যান্ডে মিসেলসের ফিরে আসার ঘটনা কিন্তু এই ইমিউনিটির এই বিপদসীমা না মানার কারনেই ঘটেছিল। থ্রেসহোল্ড লেভেল অর্জনের মূল অস্ত্রটা হচ্ছে ভ্যাক্সিন।

ক্লিনিক্যাল ইনফেক্সাস ডিজিজ জার্নালের তথ্যে দেখা যায় পপুলেশন ইমিউনিটির থ্রেসহোল্ডের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে ৭০ দশকে। কোভিড ভাইরাস SARS-CoV-2 এর প্যাথো-ফিজিওলজি সম্পর্কে এখনও তেমন জানা যায়নি। কোভিডের ক্ষেত্রে এই থ্রেসহোল্ড লেভেল সম্পর্কে এখন পর্যন্ত এমন কোন গবেষণাজাত তথ্য উপাত্ত নেই যার ফলে কোন উপসংহারে পৌছা যায়। জন হপকিন্স ব্লোমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের সংক্রামক ব্যাধির বিশেষজ্ঞদের মতে রোগের সংক্রমণ সক্ষমতার উপর ভিত্তি করে হার্ড ইমিউনিটির জন্যে পপুলেশন বা জনসংখ্যার ইমিউনিটি দরকার ৫০-৯০%। একই ধরণের ভাইরাসের তথ্য উপাত্তের আলোকে ধারণা করা হচ্ছে কোভিডে দরকার ৭০% থ্রেসহোল্ড লেভেল। কোভিডের মত আগ্রাসী এই রোগের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন অনেক ঝুঁকিপূর্ণ আর ব্যয়বহুল।

কোভিডের ক্ষেত্রে সামাজিক সংক্রমণের মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি অর্জনে গুরুতর কিছু সমস্যা আছে। ইনফেকশনের পর এন্টিবডি পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু আমরা এখনও জানিনা এই এন্টিবডির ধরণ এবং পুনরায় সংক্রমণরোধে কার্যকারিতা। যুক্তরাষ্ট্রের এলার্জি আর ইনফেক্সাস রোগ বিষয়ে ন্যাশনাল ইন্সিটিউটের ডিরেক্টর ডঃ এন্থনি ফাউচি বলেন যে এন্টিবডি টেস্ট কোভিড ইমিউনিটির গ্যারান্টি দিতে এখন পর্যন্ত সক্ষম নয়। করোনা গোত্রের অন্যান্য ভাইরাসের ক্ষেত্রে এটি সত্য হলেও কোভিডের ক্ষেত্রে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। সার্স আর মার্স ভাইরাস সংক্রমণে সৃষ্ট এন্টিবডির স্থায়িত্ব ২-৩ বছরের বেশী থাকে না। সার্স-সিওভি-২ অর্থাৎ কোভিড-১৯ সম্পর্কে গত ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত আমরা কিছুই জানতাম না, এখন এই ৬ মাসে অনেক তথ্য পেয়েছি বটে, তবে হার্ড ইমিউনিটির পলিসি তৈরিতে অর্জিত তথ্য একেবারেই অপ্রতুল। বৈজ্ঞানিক তথ্য উপাত্ত আসার সাথে সাথে পরিস্থিতি আর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ঘটবে। এন্টিবডির স্থায়িত্ব যদি এক বছর হয় তবে এক কৌশল, দীর্ঘ মেয়াদী হলে আরেক কৌশল। হার্ড ইমিউনিটির কৌশলে তাই ভ্যাক্সিন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। কোভিডের মত রোগে সেখানে বয়স্করা আর ইমিউন কম্প্রোমাইজ পপুলেশনের মৃত্যুর ঝুঁকি খুব বেশী, সেখানে ভ্যাক্সিন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করার পথে হাঁটার মানে হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু।

উপসর্গবিহীন সংক্রমণের সংখ্যা অনেক যা সাধারণত টেস্টের আওতায় আসে না। টেস্টের আওতায় আসা সংক্রমণে দেখা যাচ্ছে কানাডার ৫% লোক আর বাংলাদেশে ২০% মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। এই হারটি যদি সমস্ত পপুলেশনের ক্ষেত্রে স্ট্যান্ডার্ড ধরি তাহলেও সংক্রমণের মাধ্যমে হার্ড ইমিউনিটি’র ৭০% লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো অসম্ভব বিষয়। ধারণা করা যায় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সংক্রমণ শহরের তুলনায় কম। হার্ড ইমিউনিটির ক্ষেত্রে ভাইরাস সবচেয়ে কম সংক্রমণ ঘটায় এমন বয়সের হিসেবটি সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অবশ্য ৪০% জনসংখ্যার বয়স ২০ বছরের নীচে এবং এই ক্ষেত্রে তাদেরকে ইমিউনিটির আওতা থেকে বাদ দেবার প্রশ্নটি প্রশ্নবোধক। কানাডার কুবেকে বাচ্চাদের স্কুলে ফিরে যাবার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে কুবেকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হোরাচিও আরুদা বলেন এই ভাইরাসে বাচ্চাদের গুরুতর অসুস্থ হবার বিষয়টি খুবই বিরল। কানাডার মত উন্নত বিশ্বে এটি দৃশ্যমান চিত্র হলেও পাক ভারত উপমহাদেশের ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী বিপদজনক ট্রেন্ড হচ্ছে কোভিডে বহু শিশুর মৃত্যু। পাকিস্থানের শুধু সিন্ধু প্রদেশে ১০ বছর বয়সের নীচে প্রায় হাজার খানেক শিশু কোভিডে মারা গেছে। বাংলাদেশে ২০ বছর বয়সের নীচে মৃত্যুর হার ১০%, ১০-২০ বছর বয়স পর্যন্ত ৭%। বাচ্চাদের ইমিউনিটি বেশী থাকার কারণে বড় ধরণের অসুস্থতা না থাকলে SARS-CoV-2 তাদের কাবু করার কথা নয়, কিন্তু পাক-ভারত উপমহাদেশে ব্যতিক্রমটি লক্ষণীয়। এই সব স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোতে বৈশ্বিক নয়, ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় ডাটা আমলযোগ্য। হার্ড ইমিউনিটি অর্জনে বাচ্চাদের অরক্ষিত রেখে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়টিতে গুরুতর নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। তাছাড়া বাচ্চাদের অসুস্থ হবার বিষয়টি বাবা মা আর পরিবারের উপর প্রবল চাপ জনিত মানসিক সমস্যার কারণ। টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসীর অধ্যাপকের মতে বাধ্যতামূলক ভ্যাক্সিন প্রোগ্রামের বদলে বাচ্চাদের ভাইরাসে সংক্রমিত হতে দেওয়াটা রিমোট অপশনের বিপদজনক বিষয়। এখানে ইমিউনিটির পাশাপাশি অসুস্থ হবার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চিকেনপক্সের মত কম বিপদজনক রোগের ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটির পথে হাঁটা আর কোভিডে মত গুরুতর বিষয়ে একই পথে এগুবার বিষয়টি তুলনাযোগ্য নয়, বিপদ অনেক বেশী। এখন পর্যন্ত তথ্য উপাত্তে দেখা যাচ্ছে কোভিড -১৯ এ মৃত্যুর হার ফ্লু এর চাইতে ১০ গুন বেশী। বাংলাদেশে সতের কোটি জনসংখ্যার বিবেচনায় প্রায় ৭০% জনগণের মধ্যে সংক্রমণ ঘটার সুযোগ করে দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির ধারণা শুধু উচ্চাভিলাষী নয়, ভ্যাক্সিনের অভাবে অসম্ভবও বটে। এতে আমরা বিপুল সংখ্যক সিনিয়র সিটিজেনদের হারাতে পারি। হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের মূল অস্ত্রটা হচ্ছে ভ্যাক্সিন। ভ্যাক্সিন ছাড়া লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কোটি কোটি মানুষের বেঁচে থাকার বেপরোয়া ধারণা বুমেরাং হতে বাধ্য।

সুইডেন সম্ভবত হাঁটতে চেয়েছিল হার্ড ইমিউনিটির পথে। সুইডিশ সরকার ৫০ জনের বেশী জমায়েত নিষিদ্ধ করে ঘরে থাকার কিছু গাইডলাইন দিয়েছিল মাত্র। রেস্তোরাঁ, স্কুল, পার্ক সবই খোলা ছিল। ইউরোপের অনেক দেশের চাইতে সুইডেনে সংক্রমণের মাত্রা কম কিন্তু এই পথে হাঁটতে গিয়ে একই অর্থনৈতিক, শিক্ষা আর সাংস্কৃতিক সক্ষমতার প্রতিবেশী অন্য তিনটি স্কেন্ডিনেভিয়ান দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছে সুইডিশরা। নরওয়ে আর ফিনল্যান্ড লকডাউনে গেছে শুরু থেকেই, মৃত্যুর হার সুইডেনের চাইতে প্রায় ১০ গুন কম। সুইডেনে মৃতদের ৮৬% ছিল সিনিয়র সিটিজেন। সুইডেনে সংক্রমিত মধ্যে মৃত্যুর হার ৯%। ড্রাগ আর ভ্যাক্সিন ছাড়া হার্ড ইমিউনিটির পথে হাঁটতে গেলে মোট জনসংখ্যা ৯% মারা যাবার সম্ভাবনায় দেখা যাবে সুইডিশদের ৭৫ বছরের বেশী বয়সের সিনিয়র সিটিজেনদের অধিকাংশকেই হারাতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে কোভিড-১৯ স্পেসিফিক/নির্দিষ্ট ড্রাগের অভাবে সংক্রমণ প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন হচ্ছে মূল অবলম্বন। হার্ড ইমিউনিটির জন্যে সংক্রমণ নয়, ভ্যাক্সিনটাই আসল। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছে দিনরাত ভ্যাক্সিন উদ্ভাবনে। ভ্যাক্সিন বের হলেও ২০২০ সাল নাগাদ সবার জন্যে ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। ভ্যাক্সিন হার্ড ইমুউনিটির অপরিহার্য অংশ, তাই ২০২১ সালের মাঝামাঝি নাগাদ ভ্যাক্সিন নির্ভর হার্ড ইমিউনিটির কথা ভাবতে পারি যদি সব ঠিকঠাক থাকে অর্থাৎ এখন পর্যন্ত নীরব অগ্রগতির আশানুসারে এবছর নাগাদ যদি কার্যকরী ভ্যাক্সিন পাওয়া যায়।

ভ্যাক্সিন না পাওয়া পর্যন্ত সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সংক্রমণ প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। এই উপায় ব্যর্থ হলে স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে গিয়ে বহু মানুষের মৃত্যু হবে। সামাজিক আর শারীরিক দূরত্ব আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটা হার্ড ইমিউনিটি আর ভ্যাক্সিন এর মত একই কায়দায় সংক্রমণের চেইনটাকে নষ্ট করে দেয় ফলে সমাজে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা কমে গিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর চাপ কমে আসে, সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়। সামাজিক আর শারীরিক দূরত্ব সহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া আর অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের বহু দেশের সাফল্যের উদাহরণ তো চোখের সামনেই রয়েছে।

লেখকঃ কলামিস্ট এবং মাইক্রোবিয়াল বায়োটেক বিষয়ে বহুজাতিক কর্পোরেটে ডিরেক্টর পদে কর্মরত।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত