প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] দুর্জয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কেন ?

ডেস্ক রিপোর্ট : [২] আষাঢ় মাসের গল্প। যখন তা লিখিত ধারাভাষ্যের উপলক্ষ্য হয়। তখন পাঠকশ্রেণি দরজা বন্ধ করে। বদ্ধ ঘরে চানাচুরের মত করে খেতে খেতে বলতে থাকেন, বাহ বেশ ভালই লাগছে ! আষাঢ়ে গল্প রচনা করবার মধ্য দিয়ে মজা করা যায়। ব্যক্তি বা গোষ্ঠিগত পর্যায়ে ক্ষতিও করা যায়। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে বা আলোকে রচনাকারী ব্যক্তিসত্তা নিজেও জানেন, সত্য ও সুন্দরকে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছি। পারিনি আদতে স্বচ্ছ জলে ভাসতে ! কর্পোরেট সংস্কৃতির অসংস্কৃতি এখন সংবাদ মাধ্যমকেও গ্রাস করেছে। প্রতিবেদক হয়ে মালিক পক্ষের মন জয় করতে তাই চাকুরে জীবনকে সঙ্গী করেও শান্তি নেই। পেশা টিকিয়ে রাখতে লিখে জানাতে হয়, এখন আষাঢ়ে গল্পের আসর চলবে। সেই আসরের গল্প শুনিয়ে কারো রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। ব্যবসায়ী মন বুঝতে চায় না কিংবা সাংবাদিকতার নামে সাংঘাতিক গোত্রের সত্তা কখনই ‘বোধ’ নামক উদ্রেকে ভেসে নিজেকে প্রশ্ন করায় না, আমি কী সঠিক কাজ করছি ? এই প্রশ্ন ও উত্তরের মাঝেই শুধু দার্শনিক মত এর উন্মেষ হয় না, নৈতিকতার আশ্রয়ে প্রশ্রয় পায় বিবেক। কিন্তু আজকের যান্ত্রিক জীবনে বিবেক নিষ্ঠুর হয়ে যন্ত্রকে চিন্তার আকাশের ‘যান’ করছে না। সে মনে করছে, যে এক্সপ্রেসে উঠেছি, এই বাহক -এ পিষ্ট হয়ে যারা মরে যাবার যাক, আমাকে গন্তব্যে পৌঁছুতে হবে। যেন এক পরাজিত সত্তার গোপন হাসির উচ্ছল লক্ষ্য। তেমন কিছুই হচ্ছে বাংলাদেশে। ভাল কথা, আষাঢ় মাস চলছে বাংলায়। আজ ১০ আষাঢ় !

 

[৩] বাণিজ্যে সফল হতে যেয়ে দেশের সংবাদমাধ্যমে ব্যবসায়ীদের অনুপ্রবেশ। বাড়ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সে কারণেই অর্থের জোরে সংবাদমাধ্যমের শীর্ষ এক পক্ষ অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে বলছে, তুমি যে চেইন ক্যাফে ব্যবসা করে খাওয়াটা খেতে দিচ্ছো, সেখানে পাত্রের মধ্যে তেলাপোকা, টিকটিকি পাওয়া যাচ্ছে। অন্য পক্ষ সংবাদপত্রের আপার ফোল্ডারে শীর্ষ সংবাদ পরিবেশন করে বলছে, তুমি ভুমি দস্যু। এতে করে তাঁদের তো ফলত সমস্যা হচ্ছে না। হচ্ছে জনগনের। তাঁরা সংবাদ দেখে সব কিছু বিশ্বাস করছে। তাই বিশেষ বিশেষ সংবাদমাধ্যমে ভীন্ন ধরণের পরিকল্পনা করে এই নেতিবাচক অভিযাত্রায় যখন আষাঢ়ে গল্পের অবতারণা করা হচ্ছে, তখনও নতুন করেই এক ধরণের সংকট সৃষ্টি করছে। একটু স্বার্থ ও একটু অর্থের জন্য ইমেজ নষ্ট করার এমন উদ্যোগ সাংবাদিকতাকে পরিচিত করায় না। হালে তেমনই ঘটছে।

[৪] নাইমুর রহমান দুর্জয়। একজন সংসদ সদস্য হিসাবে পরিচিত করবার আগে তাঁর সত্যিকারের পরিচয়টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রথমত নিজের নামকরণের সার্থকতায় থাকা এক ব্যক্তিসত্তা। অজেয় হয়ে একদিন বিকেএসপি থেকে উঠে এসে ওভার বাউন্ডারি মারার সবিশেষ যোগ্যতায় থেকে বলেছিল, অফস্পিনটা আমি রপ্ত করতে পেরেছি। ‘অজেয়’ ! তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের উন্নত অধ্যায়ে খেলাটা হয় নাই। যৌক্তিক কারণে বাংলাদেশ যখন প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেছিল ভারতের বিরুদ্ধে, তিনিই বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অথচ অভিষেক টেস্ট স্কোয়াডে আকরাম খান, আমিনুল ইসলাম বুল্বুলের মত জ্যেষ্ঠরা দলে ছিলেন। এদিকে ওই ম্যাচে সেই ডান হাত ঘুরিয়ে ১৩২ রানে ৬ উইকেট নিয়ে দুর্জয় ফলত বলতে চেয়েছিল, আমরা বাংলাদেশ, এসে গিয়েছি, দেখা হবে।

সাংস্কৃতিক ঐতিহাসিকতার বিচারে দুর্জয় তাই এক অদম্য সত্তা। নিজের ডাক নামটার সাথে চরিত্রের অদ্ভুত এক মিলের মাধ্যমেই তাঁর জাত চিনে নেয়া যায়।

[৫] দ্বিতীয়ত, তিনি রাজনীতিক মরহুম অধ্যক্ষ সায়েদুর রহমান এর সন্তান। তাঁর পিতা একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। মহান জাতীয় সংসদে পুত্র হিসাবে দুই দুইবার করে সংসদে যেয়ে নাইমুর রহমান দুর্জয় প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন, পিতা বেঁচে না থাকলেও আমি তো আছি মানিকগঞ্জের মানুষগুলোর মাঝে। যদিও তাঁর মনে আফসোস আছে, আজ যদি পিতা সায়েদুর রহমান বেঁচে থাকতেন, কতই খুশী হতেন। এদিকে পুরোপুরি রাজনৈতিক ঘরানায় পরিবেষ্টিত দুর্জয়ের পরিবার। মা নীনা রহমান খোদ মানিকগঞ্জের জেলা মহিলা লীগের নেতৃস্থানীয় বলিষ্ঠ চরিত্র। দুর্জয় তাই একদিনে উঠে আসা বুর্জুয়া শ্রেণির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা রাজনীতিক নয়। ছোটবেলা হতেই বাড়ির অন্দরমহলে রাজনীতি ছিল, সেই রাজনীতি করতে যেয়ে যখন আজ তাঁকে একটি বিশেষ শ্রেণি বলতে চাইছে, তুমি সৎ সত্তা নও, তখন দুর্জয়ের ব্যক্তিত্ব, অতীত, বর্তমান বলে, তোমরা তোমাদের স্বার্থকে বড় করে দেখতে চাইছো বলে যা খুশী বলতে পারো না। লিখতে পারো না।

[৬] তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচক হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, দায়িত্ব নিয়ে আছেন আরেকটি বিশেষ পর্যায়ের নেতৃত্ব দিয়ে। তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট। তিনি আস্থা ও সুনামের সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। খেলোয়াড়দের মধ্যে ঐক্য অটুট এবং তাঁদের মৌলিক- যৌগিক সমস্যা নিরসনে কোয়াব নামের এই সংগঠন এর নেতৃত্ব তাঁর ওপরে থাকার কারণও আছে। কারণ, তিনি গণমুখী ও মিশুক স্বভাবের অস্তিত্ব। কোভিড- ১৯ মহামারিতেও ‘কোয়াব’ ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট অসহায় মানুষগুলোর পাশে ছিল, তাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অর্থাৎ নেতৃত্ব দেয়ার একটা অভ্যাস তাঁর মাঝে সব সময় ছিল, আছে। নেতা হতে চাইলে সমাজে কিংবা রাষ্ট্রে দুষ্টু শক্তির জন্ম হয়। তাঁরা প্রতিরোধ করতে চায়। সেই প্রতিরোধের অংশ হিসাবে একটি বলয় বলাতে চাইছে, নাইমুর রহমান দুর্জয়, তুমি সঠিক পথে নেই। কিন্তু সংগঠক হয়েও একজন দুর্জয় বড় নাম, ক্রিকেট বুঝতে পারার ক্ষমতাটা আছে বলেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এত দূর আসতে পেরেছে, কারণ, দলে মেধাবীদের অবস্থান নিশ্চিত করতে দুর্জয়ের অবদানকে ছোট করে দেখবার সুযোগ কম।

[৭] চতুর্থত, দুর্জয় একজন ব্যবসায়ী। জীবনের ঘাত প্রতিঘাতকে মোকাবেলা করত একজন রাজনীতিক হিসাবে বৃহৎ কিছু করা কি যায়? বাংলাদেশের বাস্তবতায় অসৎ হলে যায়। কিন্তু সবাই কি সে পথে হাটতে পারে ? যদি সৎ হয়ে পাশে থাকতে হয়, তবে ব্যবসা জীবনকে আলিঙ্গন করতে হয়। দুর্জয় তাই ক্রিকেট যেদিন ছেড়েছিলেন, তিনি নিয়ত করেছিলেন, বাবার পদাংক অনুসরণ করেই নগর- পল্লী মিলিয়ে মানুষগুলোর পাশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে থাকতে হবে। হালাল উপায়ে উপার্জন করে এলাকার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে। তারজন্য অর্থেরও দরকার। ব্যবসায়ী হলেন। রাজনৈতিকভাবে যা করা যায় না, নিজের পেট কাটা পয়সা খরচ করে তাই এলাকার মানুষগুলোকে নিরাশ করেন নাই। অথচ, একজন সংসদ সদস্যের কাজ হল, আইন প্রণয়ন করা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় এলাকার উন্নয়ন করতে পেরেছো কিনা, সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছো কিনা— এসব কিছুই বড় তাঁদের জন্য। বাধ্য হয়ে তাই রাজনৈতিক এমন এক কৃষ্টিকে সহযাত্রী করতে হয় যখন, কর্মীদের সাথে গল্প করতেও এক ঘন্টায় ৫০০০ টাকা খরচ হয়ে যায়। লাল চায়ের বিলটা তো তাঁকেই দিতে হবে।

[৮] দুর্জয়ের সামান্য ব্যবসায়িক পরিসর বেড়েছে। বাড়তেই পারে। কেহ না কেহ বড় কিছু করবে তো। তাহলে একটা কাজ করা যাক। দেশের সব ব্যবসা চার পাঁচটা শীর্ষ গ্রুপের কাছে দিয়ে দেয়া যাক। সব কিছুর নিয়ন্ত্রনে তাঁরা থাকুক। দুর্জয়রা কেন ব্যবসা করতে পারবে ? মনে রাখতে হবে, একটি শিক্ষিত পরিবার থেকে উঠে আসা, রাজনৈতিক বলয় হতে উঠে আসা, ব্যবসা অঙ্গন থেকে উঠে আসা নাইমুর রহমান দুর্জয় যদি ভাল ব্যবসায়ী হতে পারেন, তাতে করে তো গর্ব হওয়ার কথা। পাওয়ার প্ল্যান্টের মালিক হতে পেরেছেন, এর জন্য অভিনন্দন দেয়াটা জরুরী। কারণ, তিনি বাংলাদেশের সেই বীর, যার হাত ধরে বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ খেলতে গিয়েছিল।

[৯] দুর্জয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ক্লাব পর্যায়ে অসংখ্য ম্যাচ খেলেছেন। আজকের পর্ব শেষ করা হচ্ছে একটি ভীন্ন ধরনের তথ্য তুলে ধরে। সম্ভবত সালটি ১৯৯৩। তিনি রাজশাহীতে খেলতে গিয়েছেন। বিভাগীয় শহরের মনি বাজার তথা জেলখানার মাঠে খেলা। একটি বড় টুর্নামেন্টের সেমি ফাইনাল ম্যাচ। ঢাকা থেকে তিনি এবং জাতীয় দলের সাবেক পেসার সাইফুল যথারীতি মাঠে হাজির। বিপক্ষ দলের শাহনেওয়াজ শানু, সঞ্চয়েরা খুবই ভাল খেলছে। চাপ নিয়ে দুর্জয় মাঠে নামলেন। আটটি ছক্কা মেরেও উচ্ছ্বাস নেই তাঁর শরীরে। ক্যারিবিয়ান গ্রেটদের মত করে চুইংগাম চাবিয়ে দুর্জয় আলাদা এক সত্তা ছিল। খেলার মাঠে সব কিছুকে স্বাভাবিক করে দেখার দৃষ্টান্ত ছিলেন। ওই সেই ভিভ রিচারডসের মত ! দুর্জয় সহজ করে সবকিছুকে জয় করতে চাইতেন। জয় করেছিলেনও। একদিন বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব হাতে পেয়েছিলেন। তাঁর চোখে ‘ছল’ নেই, যে কেহ তাঁর চোখে রাখতে পারে চোখ ! অজান্তেই সেও বলবে, তিনি আমাদেরই লোক। যারা উঠে পড়ে লেগে আছে, দুর্জয় ঠেকাও আন্দোলনে, তাঁদেরকে বলতে হবে, অদম্য হয়েই দুর্জয়ের সবকিছু চলুক, তিনি নিরাশ করবেন না। তিনি চ্যাম্পিয়ন। তিনি একজন নেতা। ঘরে, মাঠে সব জায়গায়।ক্রীড়ালোক

সর্বাধিক পঠিত