প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] সম্মানী ছাড়া শো নয়: জোটবদ্ধ শতাধিক সংগীতশিল্পী

ডেস্ক রিপোর্ট : [২] আর সেই অন্ধকার থেকে খানিক আলোর রেখা খুঁজে নিতে এবার জোটবদ্ধ হলেন দেশের শতাধিক সংগীতশিল্পী। এটাকে নিজেদের প্রাপ্য অধিকার আদায় কিংবা বাঁচার লড়াই হিসেবে দেখছেন এই শিল্পীরা। তারা বলছেন, চলমান ঘরবন্দি সময়ে ফেসবুক-ইউটিউব হয়ে ওয়েবের বিভিন্ন মাধ্যমে যেভাবে ‘ফ্রি কালচার’ চলছে, সেভাবে আর চলা সম্ভব নয়।

[৩] বিষয়টি আরেকটু বিশদ ব্যাখ্যা করলেন এই প্রজন্মের অন্যতম শিল্পী মুহিন খান। তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছি, দিন যত যাচ্ছে অনলাইনে নানামাত্রিক অনুষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে। এটাকে আমি বা আমরা সবাই পজিটিভ দৃষ্টিতেই দেখছিলাম শুরু থেকে। কারণ, চলমান মহামারিতে শিল্পী হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়বদ্ধতা আছে, সবাইকে সচেতন করার কিংবা গান শুনিয়ে মন ভালো রাখার। কিন্তু হতাশার বিষয় এই, তিন মাস পেরিয়ে আমরা লক্ষ করছি এমন শোয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অথচ এর বিপরীতে বেশিরভাগ শিল্পীই কোনও সম্মানী পাচ্ছেন না। এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভেতরে প্রচুর হতাশা কাজ করছে। আমরা আসলে সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখছি না।’

[৪] আর এই অন্ধকার কাটাবার লক্ষ্যেই বিভিন্ন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীরা টানা কয়েকটি অন্তর্জাল বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ‘আর কোনও ফ্রি অনুষ্ঠান নয়।’ ২৪ জুন দিনজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার প্রতিধ্বনি মিলেছে বিভিন্ন শিল্পীর ফেসবুক স্ট্যাটাসে। এরমধ্যে বাপ্পা মজুমদার নিজের ফেসবুক দেয়ালে যেমন বললেন, ‌‘প্রথম ধাপে যাবতীয় ফ্রি পারফরম্যান্স/অ্যাপিয়ারেন্স বন্ধ করতে হবে।’

[৫] বিশেষ করে যে শিল্পীদের প্রধান উপার্জনের পথ স্টেজ শো। তাদের ভাষ্যে, সামনে অন্তত আরও এক থেকে দেড় বছর এভাবেই ঘরবন্দি থাকতে হবে। কারণ, চলমান মহামারি থেকে ক্রমশ উত্তরণ ঘটলেও সহসা স্টেজ শো আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে না। এরমধ্যে অনেকটা বিনা উপার্জনে কেটেছে তিন মাসেরও অধিক সময়। নানা মানুষের অনুরোধে তাদের গান শোনাতে হয়েছে কিংবা অতিথি হয়ে বক্তব্য রাখতে হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত অন্তর্জাল অনুষ্ঠানে। যার বেশিরভাগই ছিল বিনা সম্মানীতে!

[৬] বুধবার সন্ধ্যা গড়াতে তারই আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসে শতাধিক শিল্পীর পক্ষ থেকে। ‘শিল্পের সম্মানে- শিল্পীদের বাঁচান’ এমন স্লোগান দিয়ে শুরু করা বিবৃতিটি হলো এমন—
করোনার ছোবলে এক ভয়াবহ দুঃসময়ের মুখোমুখি আমরা। আর তাই এখন সব কণ্ঠশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক এবং সংগীত সংশ্লিষ্ট সবাই একত্রিত হওয়ার সময়। পরিচ্ছন্ন গান প্রাণে আশার আলো সঞ্চার করে। গানের ভূমিকা এবং শক্তি অপরিসীম। সেই গানকে আমরা যারা ভালোলাগা/ভালোবাসা আর পেশা হিসেবে নিয়ে নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, তারা বর্তমানে এক কঠিন দুঃসময়ের মধ্যে আছি। আমরা জানি, দর্শক-শ্রোতারাই শিল্পের শক্তি। কিন্তু করোনার ছোবলে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার্থে তা আজ অসম্ভব। লোকসমাগম এবং সংগীতের পরিবেশ ফিরে পাওয়া আজ অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে আটকে গেছে ।

[৭] উন্নত দেশের সংগীত সংশ্লিষ্টরা যখন ঘরে বসেই প্রযুক্তির মাধ্যমে উপার্জন করছেন, তখন নানা জটিলতায় আমরা এই উপার্জন থেকেও অনেক দূরে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে টেলিভিশন বা অন্যান্য মাধ্যমে স্পন্সর নিয়ে যারা নিয়মিত অনুষ্ঠান করার চেষ্টা করছেন তাদের ধন্যবাদ।

[৮] তবে ইদানীং আমরা দেখছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্নভাবে; যেমন- ফেসবুক, জুম, স্ট্রিমইয়ার্ড বা নানা মাধ্যমে লাইভ টকশো কিংবা মিউজিক্যাল অনুষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলছে। যা প্রশংসনীয় কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে আয়োজনের সম্মানী থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সংগীতযোদ্ধারা। অনেকের অপেশাদার কর্মকাণ্ডে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ভবিষ্যৎ শিল্প ও শিল্পীর পেশাগত জায়গা।

[৯] তাই বর্তমান এই সংকটময় অবস্থায় শিল্পী সম্মানী ও এই শিল্প বাঁচানোর প্রেক্ষিতে আমরা এক হয়েছি। ভবিষ্যতে যেন এই শিল্প ও শিল্পীরা বেঁচে থাকেন- সেই স্বার্থে আমরা (নিম্নে উল্লেখিত শিল্পীরা) সম্মানী ছাড়া আর কোনও অনলাইন আয়োজনে অংশগ্রহণ করবো না বলে অঙ্গীকার করেছি।

[১০] এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সহমত জানানো শিল্পীরা হলেন:

[১১] রফিকুল আলম, আবিদা সুলতানা, তপন চৌধুরী, লিনু বিল্লাহ, এস আই টুটুল, দিনাত জাহান মুন্নী, ফরিদ আহমেদ, বাদশা বুলবুল, শফিক তুহিন, মুহিন খান, পারভেজ সাজ্জাদ, ইবরার টিপু, সাব্বির জামান, রোমানা ইসলাম, সালমা আক্তার, নিশীতা বড়ুয়া, আলম আরা মিনু, শেখ জসীম, প্রতীক হাসান, কিশোর দাশ, পুলক অধিকারী, সাজিয়া সুলতানা পুতুল, গামছা পলাশ, নোলক বাবু, সাবরিনা সুলতানা বাঁধন, ঝিলিক, অনিমা রায়, অপু আনাম, রাশেদ, মোল্লা বাবু, টুটুল, সানিয়া সুলতানা লিজা, লুইপা, পিন্টু ঘোষ, সুকন্যা, আতিক, পরাণ, শেফালী, মেহরাব, রন্টি, নওরীন, বিউটি, রাজিব, দিঠি আনোয়ার, হুমায়রা, অদিতি আর্শি, মাহাদী, লায়লা, সোহাগ, খালেদ মুন্না, স্বীকৃতি, বেলাল খান, বিন্দু কণা, আশিক, বৃষ্টি, হৈমন্তী রক্ষিত, মৌসুমী মৌ, নাজু আখন্দ, সুজন আরিফ, হানিফ, দীপু আসলাম, অমিত, পৃথিল, অবন্তী সিঁথি, শিশির, প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস, স্মরণ, এম আই মিঠু, নাদিম ভূঁইয়া, শান সায়েক, চম্পা বণিক, রেশমী মির্জা, কর্নিয়া, মাসুম, মাহবুবুর রহমান সবুজ, তানজিনা রুমা, অনুপমা মুক্তি, সুমি মির্জা, বেলি আফরোজ, মুন, নির্ঝর চৌধুরী, সায়নী, রাজা বশীর, লেমিস, সুস্মিতা, মম, মুনির বাউলা, জুয়েল মোর্শেদ, আর্নিক, প্রমিত, আজমীর বাবু, পলাশ চক্রবর্তী, নয়ন, রতন, কিসলু, ঐশী, মানিক, তানবীর দাউদ রনি, মমিন বিশ্বাস, সন্দীপন, জাহিদ, খায়রুল ওয়াসী, আহম্মেদ হুমায়ুন ও রাজন সাহা।

[১২] মুহিন খান জানান, উপরোক্ত শিল্পীরা ছাড়াও তাদের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত জানাচ্ছেন আরও অনেক শিল্পী। নতুন যুক্ত নামগুলোও তারা পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করবেন।

[১৩] সবার পক্ষ থেকে মুহিন খান বলেন, ‘সবাই যে ফ্রি শো করাচ্ছেন, সেটাও নয়। ঘরে বসে আমি নিজেও বেশ ক’টি শো করেছি- যোগ্য সম্মানী নিয়ে। যদিও ফ্রি শোয়ের তুলনায় সেটির সংখ্যা একেবারেই কম। কিন্তু শঙ্কার বিষয় হলো, দিন যত যাচ্ছে ফ্রি শো করানোর প্রস্তাব ও আয়োজন ক্রমশ বাড়ছে। এরমধ্যে অনেক শো আছে না করেও পারা যাচ্ছে না। অথচ দেখা যাচ্ছে, সেই শোতে অংশ নেওয়ার জন্য আমি মোবাইলের ডাটা কিনছি ধার করে! অনুষ্ঠানে গাইছি প্রাণ খুলে। এরচেয়ে নির্মম ঘটনা একটা মানুষের জীবনে আর কী হতে পারে। এই ফ্রি কালচার থেকে আমরা মুক্তি চাই।’বাংলা ট্রিবিউন

সর্বাধিক পঠিত