প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী: রক্তে করোনাভাইরাসের এন্টিবডি কমে গেলে কী ঘটে?

ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী: করোনা আক্রান্ত ব্যাক্তির দেহে তৈরি ইমিউনিটি বেশীদিন স্থায়ী হয়না বলে সম্প্রতি হৈচৈ শুরু হয়েছে এবং সচেতন মহলও এই হুজুগের বাইরে নন। এই আতঙ্কের মূলে আছে নেচার মেডিসিন সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়া সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্র। কিন্তু অনুজীববিজ্ঞানী হিসেবে মনে করছি, এ ধরনের আতঙ্ক তৈরির পেছনে কারণ হিসেবে অসম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর নির্ভর করা এবং মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউনিটি) সম্পর্কে সম্যক ধারনা না থাকা অনেকাংশে দায়ী। চলুন এর ব্যাখ্যা জেনে নেই।

ভাইরাসের বিরুদ্ধে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দেয়ার জন্য মানুষের দেহে ইমিউন সিস্টেমের যে কয়টি ভাগ কাজ করে, রক্তে উপস্থিত এন্টিবডি তার মধ্যে শুধুই একটা। যেকোন জীবাণুর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরী এবং সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা (যাতে পরবর্তীতে ওই জীবানু আর রোগ সৃষ্টি করতে না পারে) নিশ্চিত করার জন্য রক্তে CD4 T-cell (যা হেল্পার T-cell নামেও পরিচিত) সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধরেনের T-cell, মানবদেহের ইমিউন সিস্টেমের বাকি সব উপাদানকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। T-cell দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এসব বিষয়ের মধ্যে আগে আক্রমণ করা কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট এন্টিবডি তৈরি করা যেমন আছে, তেমনি ভাইরাসকে এবং ভাইরাস আক্রান্ত দেহকোষকে মারতে পারে এমন অন্যান্য উপাদানও আছে। আর এর সবগুলো মিলেই মানবদেহে কোন একটি জীবাণুর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর ইমিউনিটি তৈরি হয়। তাই, রক্তে শুধুমাত্র এন্টিবডির পরিমাণ কমে যাওয়া মানেই ইমিউনিটি শেষ হয়ে যাওয়া নয় মোটেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নভেল করোনাভাইরাস (SARS-CoV-2)-এর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট CD4 T-cell তৈরি হয় কিনা।

এ বিষয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপরের সারির জার্নাল Nature Reviews Immunology-তে এপ্রিলের ৩০ তারিখ প্রকাশিত একটি রিপোর্টে নিশ্চিত করা হয়েছে, নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তের CD4 T-cell, এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে ১০০% সক্রিয় থাকে।

তার কিছুদিন পরেই, গত মাসে আরেক শীর্ষস্থানীয় জার্নাল Cell-এ প্রকাশিত গবেষণায় SARS-CoV-2 ভাইরাসের বিরুদ্ধে CD4 T-cell-এর ঠিক একই ধরনের সক্রিয়তার উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। তার মানে, অবশ্যই নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী ইমিউনিটির শক্ত প্রমাণ ইতিমধ্যেই পাওয়া গিয়েছে। তাহলে কয়েকমাস পরে এন্টিবডি কেন কমে যায়? কমে যায় কারণ সাধারনত সিজনাল ভাইরাসের ক্ষেত্রে রক্তে উপস্তিত এন্টিবডি সারা বছর ধরে বজায় রাখা শক্তির এক ধরনের অপচয়, যা মানবদেহের বুদ্ধিমান ইমিউন সিস্টেম কমিয়ে রাখতে চায়। পরবর্তীতে যখনই ভাইরাস আবার আসে, CD4 T-cell আবার তার মেমরি থেকে নির্দিষ্ট এন্টিবডি আবার তৈরি করতে পারে। অতএব ইমিউনিটি যে পাওয়া যাবে, তা বোঝা গেলো। কিন্তু উপরের দুইটি গবেষণাতেই খুব আশাব্যাঞ্জক আরেকটি বিষয় দেখা গিয়েছে।

Nature Revies Immunology এবং Cell-এ প্রকাশিত দুইটি গবেষণাতেই নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত না হওয়া (এবং এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি একেবারেই অনুপস্থিত এমন) কিছু মানুষের রক্তেও SARS-CoV-2 ভাইরাসের বিরুদ্ধে সক্রিয় CD4 T-cell পাওয়া গিয়েছে!! অন্য আরেক গবেষণায় এমনও দেখা গিয়েছে যে কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে ১৯৮৫ এবং ১৯৯২ সালে সংগ্রহ করে রাখা রক্তেও নভেল করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে সক্রিয় হওয়া CD4 T-cell ছিল। এটা কীভাবে সম্ভব? সম্ভব এই কারনে যে, SARS-CoV-2 ছাড়াও আরো চার ধরনের করোনাভাইরাস আমাদের সিজনাল সর্দি-জ্বর (common cold) ঘটিয়ে থাকে। আর এদের বিরুদ্ধে আক্রান্ত হলে যে নির্দিষ্ট CD4 T-cell তৈরি হয়, তা SARS-CoV-2 কে-ও চিনতে পারে, তাই তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়। এতে করে বোঝা গেলো, করোনাভাইরাস গোত্রের কোন একটি দিয়ে আক্রান্ত হলে যে ইমিউনিটি তৈরি হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে SARS-CoV-2 এর মত কাছাকাছি ভাইরাসের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে।

সবমিলে বোঝা যায়, (১) আক্রান্ত ব্যাক্তির রক্তে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি তৈরি হয়, (২) সাধারণ সর্দি-জ্বরের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ (যেগুলো আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে আছে) SARS-CoV-2 এর বিরুদ্ধে অনেক ক্ষেত্রে ইমিউনিটি দিতে পারে, এবং (৩) এই ইমিউনিটি অনেক বছর ধরে বজায়া থাকতে পারে। তাই, শুধু একটি রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে, সামগ্রিক চিত্র বিবেচনায় না নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পরা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

সবশেষে বলি, করোনাভাইরাস নিয়ে অনেক ধরনের নতুন তথ্য এসেছে এবং আরো আসবে। এসবের কিছু আশা জাগানিয়া আবার কিছু হতাশাজনক হবে। অনেকেই এসব তথ্য নিজের মত করে বুঝে মিডিয়াতে আতংক ছড়িয়ে দেন, যা আমাদের এমনিতেই বিষিয়ে উঠা জীবন আরো বিপন্ন করে তুলে। আর ভাইরাল হওয়ার জন্য আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে ভাল উপায় আর কী হতে পারে? তাই এই অবস্থায় চোখ-কানের সাথে মাথাটাও খোলা রাখা খুব জরুরি। সবাই অনেক অনেক ভাল থাকবেন।

লেখক,
অণুজীববিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্য গবেষক
কো-অর্ডিনেটর, মাইক্রোবায়োলজি প্রোগ্রাম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

সর্বাধিক পঠিত