প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আর রাজী : মধ্যবিত্ত কে?

আর রাজী :  এই করোনাকালের নানান আলাপ-চারিতায় ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটা একটু বেশিই যেন উচ্চারিত হচ্ছে। কিন্তু কারা এই মধ্যবিত্ত? কীভাবে তা নির্ধারিত হয়?

সমাজে নানানভাবে শ্রেণীকরণ করা হয়। এর সর্বজনগ্রাহ্য কোনো পরিমাপক নাই। আর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে যে শ্রেণীকরণ করা হয় সে নিয়েও বাংলাদেশে নানান মুনির নানান মত রয়েছে।

ওসব তর্কে না গিয়ে, বিষয়টা বোঝার তাগিদ থেকে আমাদের উপমহাদেশ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক পর্যায়ে কিছু খোঁজ-খবর করে নিজের মতো করে এই স্তরবিন্যাস আমি করে নিয়েছি। আপনার যদি ভিন্নমত থাকে তাহলে খোঁজ-খবর করুন, জেনে নিন, আপনি কোন স্তরে আছেন।

আমার বিবেচনায় এই জানাটা জরুরি। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে জানতে পারলে সম্ভবত আপনার সামাজিক রাজনৈতিক ভূমিকা কী হবে তা আপনি যথাযথভাবে নির্ধারণ করতে পারবেন, আর পারবেন জনপরিসরে ঠিকঠাকভাবে কথাবার্তা বলতে। আসুন, এবার দেখে নেই কারা কোন বিত্তের মানুষ:

# অতিদরিদ্র মানুষ

অতিদরিদ্র মানুষ কাদের বলা যাবে সে নিয়ে ভিন্নমত নাই। আয়-রোজগারের বালাই নাই, ঘুমের সময় মাথা ওপরে ছাদ নাই, একবেলা খাবার জোটে তো পরের বেলা জোটে না, স্বাস্থ্য-চিকিৎসা নিয়ে ভাবনা-চিন্তাও করে না- নিজের পরিবার বা সমাজ বলেও কিছু নাই- এরাই অতিদরিদ্র। আল্ট্রা পুওর।

# দারিদ্রসীমার নিচের মানুষ

দারিদ্রসীমার নিচে কাদের অবস্থান এই নিয়েও খুব একটা বিতর্ক নাই। চার সদস্যের একটি পরিবার যাদের মাথা গুজার একটা ব্যবস্থা করতে লড়াই করতে হয়, প্রতিদিন তিনবেলা খাবারের নিশ্চয়তাও থাকে না, বার্ষিক আয় কমবেশি ৭৫ হাজার টাকা এবং যাদের অন্য কোনো সম্পদ নাই – এরা দারিদ্রসীমার নীচের মানুষ।

# নিম্ন শ্রেণী/দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ

চার সদস্যের একটা পরিবার যারা যথেষ্ট খাটাখাটনি করে বছরে তিন লাখ টাকা আয় করে, নিজেদের সাইকেল অন্তত থাকে আর সম্পদ থাকে ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকার তবে তাদের দরিদ্র/ নিম্ন শ্রেণীর মানুষ বলে গণ্য করা যায়।

# মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ

এই শ্রেণীটা একই সাথে দরিদ্র আবার ধনী শ্রেণীর মধ্যে দোল খাইতে থাকে। পেটে সামান্য বিদ্যা পড়লেই মানুষের আগ্রহ তৈরি হয় নিজেকে এই শ্রেণীর অন্তর্গত হিসেবে পরিচয় দেওয়ার। কিন্তু আদতে কে বা কারা মধ্যবিত্ত? খোঁজ-খবর নিয়ে যা বুঝলাম, তা হচ্ছে:

চার সদস্যের পরিবার, নিজস্ব মালিকানাধীন বাসায় অন্তত দুইটা ঘর আর দুইটা বাথরুম আছে, আছে পৃথক পাকের আর বসার ঘর, তারা ঋণ করে কেনা হলেও অন্তত ১৫ লাখ টাকা দামের গাড়ি ব্যবহার করে, বছরে একবার অন্তত ব্যয়বহুল তিন তারকা পর্যটনে বের হয়, বাসায় কাজের লোক রয়েছে, বাচ্চাদের শহরের ভাল মানের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে/ বেসরকারি মেডিক্যাল/ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াতে পারে, মাসে আয় অন্তত এক থেকে সোয়া লাখ টাকা আর মোট সম্পদের পরিমাণ এক কোটি টাকা তাদের মধ্যবিত্ত বলা যায়।

উচ্চবিত্ত শ্রেণীর মানুষ

এরা আমাদের দেশের “বড়লোক”। এই শ্রেণীতে আপনি আছেন মানে আপনি যা ইচ্ছে তাই কেনার সামর্থ্য রাখেন। এদের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বা বাংলো টাইপ বাসা থাকবে। বাসার প্রত্যেকের জন্য পৃথক বাথরুমসহ ঘর থাকবে, হলরুম থাকবে, সি ক্লাস সেডান গাড়ি থাকবে- হ্যারিয়ার মার্সিডিজ, শহরের সবচে দামি রেঁস্তরায় প্রায়শই যাবে, বছরে অন্তত দু বার বিদেশ ভ্রমণে যাবে, দু থেকে তিন জন কাজের লোক, দু জন অন্তত ড্রাইভার থাকবে, শহরে সবচে নামি দামি স্কুলে ছেলেমেয়েদের পড়াবে, বয়স হলে ‘উচ্চ-শিক্ষার’ জন্য তাদের বিদেশে পাঠয়ে দেবে। এদের মাসিক আয় হতে হবে দশ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এদের সম্পদের মূল্য হবে পাঁচ কোটি থেকে ১৫ কোটি টাকা। আমাদের দেশের সরকারি আমলা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যবসায়ী, অভিনেতা, খেলোয়াড়, রাজনীতিকদের অনেকেই এই উচ্চবিত্ত শ্রেণীতে রয়েছে।

এলিট/অভিজাত শ্রেণীর মানুষ

ক্ষমতা আর অর্থবিত্ত দুই যখন আপনার থাকবে তখন আপনি এই শ্রেণীতে ঢুকতে পারেন। বড় শহরের অন্যতম শীর্ষ ধনী আপনি। মার্সিডিজ, অউডি, বিএমডব্লিউ, জাগুয়ার আছে আপনার। সিক্স বিএইচকে ম্যানসনে থাকেন। যা ইচ্ছে তাই কিনতে পারেন। শহরের একাধিক বোনেদি ক্লাবের সদস্য। ছেলেমেয়েদের বিদেশে রেখে পাড়াতে পারেন। বছরে আয় অন্তত দুই কোটি টাকা। মোট সম্পদের মূল্য অন্তত ৫০ কোটি টাকা। শহরের নামি অতি দক্ষ সার্জন, সফটওয়্যার প্রোকৌশলী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রধান, মাল্টিন্যাশনালের শীর্ষকর্তা, কিছু ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের মালিক ইত্যাদি এই শ্রেণীভুক্ত।

আর আছে

# সুপার রিচ বা অতি ধনী শ্রেণী

আপনার ছেলেমেয়েদের যদি এক গ্লাস পানিও নিজে হাতে ঢেলে খাওয়ার সুযোগ না থাকে, যদি লাম্বরঘিনি ফেরারি উপহার দিতে পারেন বাচ্চাদের, নিজেরা চড়েন বেন্টলি বা মেব্যাকে। প্রয়োজনে চার্টার বিমান নিয়ে উড়াল দিতে পারেন ভিন দেশে। শহরের/সমাজের অসংখ্য অনুষ্ঠানে আপনাকেই যদি প্রধান অতিথি হতে হয় তাহলে আপনি এই শ্রেণীর। রাজনীতিক, সুপারস্টার, অভিনেতা, ক্রিকেটার, বড় জুয়েলারি দোকানের মালিক, বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, বড় শপিংমল বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক আপনি। দেড় থেকে দুইশ কোটি টাকা যদি থাকে, মাসে যদি অন্তত দুই কোটি টাকা আয় হয় তাহলে আপনি সুপার রিচ বা অতি ধনীর তালিকাভুক্ত।

# ধনীদের ধনী

আল্ট্রা রিচ বা রিচ আউট অব রিচ শ্রেণী বলেও একটা শ্রেণী আছে। এদের সম্পর্কে আমি কোনো কল্পনাও করতে পারি না। শুনেছি এরা সবাই বড় বড় বিনিয়োগকারী। তাদের আয় রোজগার নিয়েও ধারণা নাই। তবে এই শ্রেণীভুক্ত হতে হলে তাদের সম্পদের মূল্য নূন্যতম হাজার কোটি টাকা হতে হবে।

এবার খেয়াল করুন, আপনি নিজেকে নিজেই ফাঁকি দিচ্ছেন না তো?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত