প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মারুফ কামাল খান : উচ্চশির তেজোদ্দীপ্ত নাগরিকেরা অস্তিত্বহীন ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন

মারুফ কামাল খান : লোহানী ভাইও চলে গেলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠেই এ দুঃসংবাদ। মনটা দমে গেলো। খুব দুঃখভারে আক্রান্ত হলাম। নিজেকে প্রবোধ দেয়ার জন্য একটু ভাবতে বসলাম তাঁর এই চলে যাওয়া নিয়ে।

আচ্ছা, তিনি কি আসলেই ছিলেন এতোদিন? কৈ টের পাইনি তো। হালের বৈশ্বিক করালব্যাধি কোভিড-১৯ আক্রান্ত হলে এবং এই অতিমারীতে মারা গেলেই কেবল আমরা জানলাম এবং বুঝলাম লোহানী ভাই এতকাল ছিলেন। আমাদের মাঝে কিংবা আশেপাশেই ছিলেন। অথচ আমরা কেউ তার এই থাকা, এই উপস্থিতি, এই অস্তিত্ব টের পাইনি। টের পাইনি কারণ তিনি থাকলেও না থাকার মতই ছিলেন। খুব নিষ্ঠুর ভাবে সত্যটা উচ্চারণ করলে বলতে হয় : দৈহিক ভাবে বেঁচে থাকলেও তিনি এবং তাঁর মতন মানুষেরা এই দেশে এই সমাজে অনেক আগেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছেন। আরো শক্ত করে বলতে চাইলে বলতে হয়, অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন।

এই অপ্রাসঙ্গিক বা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ার দায় তাঁদের নয়। দায় এ সমাজের। এ সমাজ এমন করে বদলে গেছে যখন লোহানী ভাইয়ের মতন লোকদের আর দেশসমাজে কোনো গুরুত্ব, কোনো প্রয়োজন, কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। সমাজকে এমন করে আমরাই, এ সমাজের মানুষেরাই, বিশেষ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা সমাজের কর্তা-কর্ত্রী, তারাই বদলে ফেলেছি। আমরা একটা নতুন দর্শনের জন্ম দিয়েছি এবং সেটাকেই আমাদের ‘মোটো’ হিশেবে মেনে নিয়েছি। এ সমাজে রাজদণ্ড হাতে থাকলেই কেবল তার অহঙ্কার থাকবে। বাকিরা সকলেই হবে তাদের অন্ধ স্তাবক। বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন ও হেনস্তা করা হবে। আর কারো আত্মমর্যাদা বোধটুকুও থাকতে পারবে না। ক্ষমতার সমর্থক হয়েও যদি আত্মসম্মানবোধ কেউ প্রদর্শন করে তবে তাকেও তুচ্ছ, গুরুত্বহীন, অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলতে হবে।

লোহানী ভাইয়েরা সেই বাস্তবতার শিকার হয়ে অনেক আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিলেন। তিনিও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মোটামুটি সমর্থকই ছিলেন কিন্তু তাঁর ভেতরে ছিল আত্মমর্যাদাবোধ। তাই অন্ধ সমর্থক বা স্তাবক হতে পারেননি। সে কারণেই লোহানী ভাইয়ের সমবয়ষ্ক বা তাঁর চেয়ে বেশি বয়সীরাও অনেকে আমৃত্যু প্রাসঙ্গিক থাকলেও তিনি থাকেননি বা থাকতে পারেননি। কুর্ণিশ না করার এবং মুখ ফস্কে সত্য বলে ফেলার সহজাত অভ্যাসের জন্য ড. আনিসুজ্জামান কিংবা সৈয়দ শামসুল হকদের মতন শেষ নিঃশ্বাস অব্দি গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা তিনি ধরে রাখতে পারেননি কিংবা হয়তো এভাবে রাখতেও চান নি।
লোহানী ভাই হলেন কামাল লোহানী। পারিবারিক পূর্ণ নাম ছিল আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। পেশা ও তৎপরতার কারণে পরিচিতি পেয়েছিলেন সাংবাদিক, সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা এবং প্রগতিশীল সাংষ্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠক রূপে। সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন, বামপন্থী সাংষ্কৃতিক সংস্থা উদীচী-র সম্পাদক ছিলেন। সমাজতান্ত্রিক চৈনিক ধারার দিকে ঝুঁকে সংষ্কৃতি সংগঠন ক্রান্তি স্থাপন করেছিলেন। এই পদগুলো গতানুগতিক ধারায় অধিকার করে থাকেন নি তিনি। প্রতিটি পদেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অতি সক্রিয়, স্পন্দনশীল, লড়াকু এবং আভিজাত্যপূর্ণ মর্যাদা ও অহংবোধে প্রদীপ্ত।

আমার নিজের মনে হয়, সাংবাদিকতা ও সাংষ্কৃতিক পরিমণ্ডলের গণ্ডিতে লোহানী ভাইয়ের পরিচিতি আবদ্ধ হয়ে পড়লেও রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শই তাকে অন্যান্য অঙ্গনের তৎপরতায় তাড়িত ও প্রাণিত করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্বাসই কৈশোর-উত্তীর্ণ বয়সে তাঁকে সক্রিয় করেছে বিক্ষোভে ও মাতৃভাষার সংগ্রামে। এই বিশ্বাসই তাঁকে ঠেলেছে কারাগারে। এই বিশ্বাসের তাড়নাতেই উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার পাট না চুকিয়েই তিনি কলেজ ছেড়ে সাংবাদিকতার পেশায় ঢুকে পড়েছিলেন।

জীবনের দীর্ঘকালব্যাপী মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর দেখানো পথের অনুসারী হয়েই থেকেছেন প্রিয় লোহানী ভাই।

পাকিস্তানী শাসনামল জুড়ে প্রগতিশীল আন্দোলনের পয়লা কাতারে থেকেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী সৈনিকের ভূমিকায় ছিলেন প্রচার ফ্রন্টে। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই তখনকার সর্বময় ক্ষমতার অধিশ্বর শেখ সাহেবের সবকিছু বিনাবাক্যব্যয়ে মেনে নিতে পারেননি বলে বেতার মহাপরিচালক পদে ইস্তফা দিয়ে ফিরে আসেন স্বাধীন সাংবাদিকতায়। সাংবাদিক ইউনিয়নের কর্মকর্তা হিসেবে একদলীয় বাকশাল পদ্ধতি প্রবর্তন ও সংবাদপত্র বন্ধের তীব্র প্রতিবাদ জানান। বাকশাল-এ সাংবাদিকদের বাধ্যতামূলক যোগদানের নির্দেশনার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং নিজে যোগদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে দুঃসহ বেকারত্বকে বেছে নেন।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উত্তরাঞ্চল থেকে দৈনিক বার্তা প্রকাশ করে কামাল লোহানীকে প্রথমে নির্বাহী সম্পাদক ও পরে সম্পাদক পদে নিয়োগ করেন। তবু তিনি তাঁরও স্তাবকতা করেন নি কখনো। রাষ্ট্রপতির ডেলিগেশনের সদস্য হিসেবে বিদেশ সফরে মনোনীত হয়েছিলেন তিনি। প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব তাঁকে বলেন, বিদেশ সফরকালে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্রাচার রক্ষায় ড্রেসকোড মানতে হয়। তাই তিনি তাঁকে অন্ততঃ একটি স্যুট সঙ্গে নেয়ার অনুরোধ জানান। রেগে গেলেন লোহানী ভাই। জেনারেলকে বললেন, এটা খুব অপমানজনক। আমার কোনো স্যুট ট্যুট নাই। ওসব পোশাক আমি পরিও না। খদ্দরের পাঞ্জাবি, সুতির পায়জামা আর শাল-মাফলার পরে জীবন কাটিয়ে দিলাম। এই পোশাক পাল্টাতে হলে বিদেশেই যাব না রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হয়ে।

তিনি যাননি। ঘটনা জানতে পেরে প্রেসিডেন্ট জিয়া হস্তক্ষেপ করেন। নিজে তাঁকে অনুরোধ করেন। কিন্তু না-যাবার যে সিদ্ধান্ত তিনি একবার জানিয়ে দিয়েছেন, তা আর পাল্টাতে রাজি হননি রাষ্ট্রপতির অনুরোধ সত্বেও।

জিয়াউর রহামানের মতন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের অনুরোধ যিনি ফিরিয়ে দেন তার পক্ষে অন্যদের হুকুম-হাকাম মেনে চলা কত কঠিন। তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ লেগে যায় লোহানী ভাইয়ের। বিরোধের জের ধরে ১৯৮১সালে দৈনিক বার্তার সম্পাদক পদে ইস্তফা দেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া জানতে পেরে আবার তাঁকে ডেকে প্রেস ইন্সটিটিউটে চাকরি দেন। এরশাদ আমলে পিআইবির চাকরি ছেড়ে তিনি সাংষ্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করেন।

১৯৯১সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবার পর কামাল লোহানীকে তিনি শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক নিযুক্ত করেন। কিন্তু সংষ্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে ষোলো মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেন। বেগম জিয়া আবার তাঁকে চাকরি দেন পিআইবি-তে। সেখানেও মহাপরিচালকের সঙ্গে মেলেনি তাঁর। মহাপরিচালক সাহেব আইনের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ধুয়া তুলে তাঁকে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে পাঠিয়ে দেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে চুক্তিভিত্তিতে শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক নিয়োগ করে। তিনি বছর দু’য়েক সে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ওপর তলার সঙ্গে সম্পর্ক খুব একটা সুখকর ছিলনা বলেই জেনেছি।

যাই হোক, আমি জীবনী লিখতে বা লোহানী ভাইয়ের চরিত্র আঁকতে বসিনি। কেবল এইটুকু বলতে চাই যে, এদেশের রাজনীতি-সাহিত্য-সংষ্কৃতি-সাংবাদিকতার অঙ্গনে লোহানী ভাইয়েরাই একটা দীর্ঘ সময়কাল জুড়ে প্রাণপুরুষ ছিলেন। নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উজ্জ্বল প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরাই ছিলেন নেতৃত্বে। আর তাঁদের অহংকার, স্পর্ধা, দ্রোহ, আত্মাভিমান, মর্যাদাবোধ ও মতামতকে রাষ্ট্রের তখনকার শীর্ষ ক্ষমতাধরেরাও খুবই গুরুত্ব দিতেন।

তবে সে দিন আর নাই। সেই সমাজও পাল্টে গেছে। রাষ্ট্রের সেই সংষ্কৃতি, ক্ষমতার সেই রসায়ন বদলে গিয়েছে। এখনকার যে ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় অহংকার তা নাগরিকদের কাছ থেকে কুর্ণিশ ও স্তাবকতা ছাড়া আর কিছুই চায়না। তাই মরে যাবার অনেক আগেই লোহানী ভাই এবং তাঁর মতো ঋজু, উচ্চশির, দীর্ঘকায় এবং তেজোদ্দীপ্ত নাগরিকেরা এ রাষ্ট্রে, এদেশে, এই সমাজে অস্তিত্বহীন ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন।

এবার ঘটলো লোহানী ভাইয়ের বায়োলজিক্যাল মৃত্যু বা দৈহিক বিদায়। আমাদের সমাজজীবনে এই দৈহিক মৃত্যুর চাইতেও মৃত্যুর অনেক আগেই নীরবে তাদের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়াটা অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। আমরা কি এ ব্যাপারটা নিয়ে কখনো ভেবেছি? আর কবে ভাববো?

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত