প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

করোনাকালে সাহসের সঙ্গে লড়ে যাওয়া চিকিৎসকদের একজন খুন হলেন, অথচ কেউ বিচার চাওয়া দূরের কথা, আপনারা তার দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন!

তানভীর শুভ : ১১ বছরের চিকিৎসা জীবনে অজপাড়া গায়ের চেয়ার-টেবিল ও কারেন্টবিহীন সাবসেন্টার থেকে শুরু করে ঝা চকচকে প্রাইভেট হাসপাতালেও রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে এসেছি। অভিজ্ঞতার কোনো হের ফের নেই। গ্রামের লুঙ্গি পরে পান চিবুতে থাকা মানুষটা একজন ডাক্তারকে ঠিক যেভাবে মূল্যায়ন করে শহরের বড় অফিসার কিংবা শিল্পপতি ধনকুবের মহাশয়ের মানসিকতাও এর ব্যতিক্রম নয়। স্কুলে থাকতে বাংলা ব্যাকরণ পরীক্ষায় দুটি চিরসত্য বাণী লিখো, প্রশ্নটার উত্তরে লিখতাম-মানুষ মরণশীল ও মানুষ মাত্রই ভুল। ব্যাকরণ বইতে ‘বাঁচলে আল্লাহ বাঁচায়, আর মরলে, ডাক্তারের অবহেলা’ এই বাক্যটি চিরসত্য বাণী হিসেবে নতুন করে সংযোজনের সময় এসেছে। প্রফেসারের কাছে চিকিৎসা নিয়ে আমার মতো নগণ্য এক ডাক্তারের কাছে সে প্রেস্ক্রিপশন যাচাইয়ের কথা শুনে যেমন অবাক হয়েছি, তেমনি গভীর রাতে আমার ঘুম ভাঙিয়ে আধা ঘণ্টা কাউন্সিলিং শোনার পর পরের দিন ফার্মেসির দোকানদারের পরামর্শে ওষুধ খেয়ে তৃপ্ত হতেও দেখেছি।

কোন ডাক্তারকে দেখালে ভালো হবে, পরিচিত কোনো ডাক্তার থাকলে যেন বলে দিই , সিরিয়াল আগিয়ে দিই এই টাইপ অনুরোধ নিয়মিত করার লোকের অভাব নেই। আমি প্রথমদিকে আমার শ্রদ্ধেয় স্যারদের চেম্বারে পাঠাতাম। পরে দেখি রোগীরা ভালো হয়েও অভিযোগ করে-স্যারের নাকি অনেক ভিজিট নেন, সময় নিয়ে দেখেন না। অথচ তারা যে স্যারের চিকিৎসাতে ভালো হয়েছেন, সেটা একবারো উল্লেখ করেন না। একজন তো একবার বলেই ফেললেন, ডাক্তার ভালোই অপারেশন করেছেন, কথাবার্তা ভালো, কিন্তু শালার ব্যাটা টাকা তো অনেক রাখে। ওই রোগী নিজে সচ্ছল ও শিক্ষিত, অথচ একজন ডাক্তারের সামনে আরেক প্রফেসরকে যে ভাষায় তিরস্কার করলেন, সেটা শুনে এরপর থেকে এই সব বিষয়ে নিজেকে না জড়ানোর প্রতিজ্ঞা করেছি। আমি বলছি না এ দেশের সব রোগীই এমন, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, বেশির ভাগ রোগীর চিন্তা ভাবনাই এই টাইপ। তারা চায় ফ্রি চিকিৎসা, কিন্তু সরকারি হাসপাতালে লাইন ধরতে চায় না, তারা চায় ডাক্তার সাহেব চেম্বারে অনেক সময় দেবেন, কিন্তু সিরিয়াল গভীর রাতে পড়লেই ডাক্তার অর্থলোভী, তারা ডাক্তারের ভিজিট দিতে কার্পণ্য করে, কিন্তু ফার্মেসির দোকানদারের পরামর্শে হাজার টাকার অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক কিনে বাসায় এসে ডাক্তারের ভিজিট বেচে যাবার খুশিতে তৃপ্ত হয়।

ডাক্তার তার সব টাকা খসিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, অথচ ভারতে গিয়ে কাড়িকাড়ি টাকা খসিয়ে ভালো না হলেও তাদের মুখে তৃপ্তির হাসি সর্বদা বজায় থাকে। সঠিক চিকিৎসা সম্পর্কে কিছুই না জানা জনগণ ও পত্রিকা, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করেন। ভুল চিকিৎসার অভিযোগে রোগীর লোক ডাক্তারের গায়ে হাত তুলে, সেটার প্রতিবাদ করতে গেলে আবার টকশোতে ডাক্তারেরা অমানবিক বলে সমালোচিত হোন। অসংখ্য ভিডিও ফুটেজ আছে ডাক্তারদের লাঞ্ছনার । কিছুই হয়নি, আসামিও ছাড়া পেয়েছে সেখানে থাকা ব্যর্থ প্রশাসনের লোকেরা দুদিন পর সব ভুলে গিয়েছে। এই বিচারহীনতার ফলশ্রুতিতে খুলনাতে রোগীর লোকের হামলায় মারা গেলেন ডাক্তার রাকিব। অথচ হাতের উল্টো পিঠেই দেখতে পাই দেশের কোনো স্থানে , পুলিশ , সাংবাদিক কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট নির্যাতিত হলে প্রশাসন, পত্রিকা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ডাইরেক্ট একশানে নামার চিত্র।

দেশের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরা হলেন চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত আমাদের শিক্ষকগণ। এই সমস্যা সমাধান করা কোনো চিকিৎসক নেতার পক্ষে স্বম্ভব নয়। করোনাকালে স্যারেরা যেন সেভ থাকতে পারেন, সেজন্যে তাদের ছাত্ররাই সর্বপ্রথম আওয়াজ তুলেছে। শ্রদ্ধেয় স্যাররা যদি আমাদের তাদের নিজ সন্তান ভেবে ডাক্তারদের নিরাপত্তার দাবি নিয়ে কঠোর হন, তাহলেই কেবল এই দাবি বাস্তবায়ন স্বম্ভব হবে। স্যারদের অনেকের সন্তানেরা ডাক্তারি পড়ছে, অনেকে এই পেশায় আছে। জনগণের বিরূপ আচরণ থেকে তারাও এক সময় রক্ষা পাবেন না। বনের হাতি মারা গেলে আবেগ ভাইরাল হয়, ভিনদেশি নায়ক মারা ডিপ্রেশন ভাইরাল হয়, ভিনদেশি খেলোয়াড় করোনা আক্রান্ত হলে সহমর্মিতা ভাইরাল হয়। করোনাকালে সাহসের সঙ্গে লড়ে যাওয়া চিকিৎসকদের একজন খুন হলেন, অথচ কেউ বিচার চাওয়া দূরের কথা, উল্টো নিহত ডাক্তারের দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছেন! এই মানুষগুলোই হয়তো রাত পোহালে আবার ফ্রি চিকিৎসার জন্য ইনবক্স বা ফোনে নক করবেন। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত