প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] সিলেটে যে যুদ্ধে ‘হিরো’ ডাক্তাররা

ডেস্ক রিপোর্ট : [২] সিলেটের ‘কোভিড আইসিইউ’ ওয়ার্ডে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন ডাক্তাররা। মৃত্যু পথযাত্রী রোগীদের ফিরিয়ে আনতে প্রাণপণ লড়াই চালাচ্ছেন তারা। দিন নেই, রাত নেই- রোগ এবং রোগীকে নিয়ে অন্তহীন যুদ্ধ চলছে। এতে কখনো সফল হচ্ছেন ডাক্তাররা, আবার কখনো বিফল হচ্ছেন। তবে সফলতার মাত্রাই বেশি। সিলেটের আইসিইউতে রোগী মৃত্যুর সংখ্যা কম। এজন্য ফ্রন্টলাইন করোনা যোদ্ধা ডাক্তারদেরকে কৃতিত্ব দিচ্ছে অনেকেই। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় নিজেও জানিয়েছেন, ‘সিলেটবাসীর দোয়ার কারণেই এমনটি হচ্ছে।

[৩] তবে ডাক্তারদের যে টিম রয়েছে তারা হাল ছাড়ছেন না। যুদ্ধ করছেন। এ কারণে সফলও হচ্ছেন।’ সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল কোভিড রোগীদের জন্য একমাত্র হাসপাতাল। আর কোথাও নতুন করে এখনো কোভিড চিকিৎসাসেবা শুরু হয়নি। অনেক অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে। পুরাতন হাসপাতাল হওয়ার কারণে রোগীরা স্বস্তি বোধ করছেন না। অনেকেই হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসায় যেতে আহাজারি করছেন। ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার সংকট চলছে। গাদাগাদি করেই থাকতে হচ্ছে রোগীদের। এরপরও হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার হার বেশি। ইতিমধ্যে এই হাসপাতাল থেকে প্রায় দু’শজনের মতো রোগী বাড়ি ফিরেছেন। তাদের বাড়ি বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায়। মার্চ থেকেই এই হাসপাতালে কোভিড চিকিৎসাসেবা শুরু হয়। আর চিকিৎসাসেবা শুরুর পর থেকেই নেয়া হয় প্রস্তুতি। ছিল না আইসিইউ। ফলে মার্চেই তাৎক্ষণিক ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে দুটি আইসিইউ বেড এনে এই হাসপাতালে সংযোজিত করা হয়। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১৩টি আইসিইউ বেড সংযোজিত করা হয়েছে। এখন হাসপাতালে ১৫টি বেডের একটি আইসিইউ ওয়ার্ড রয়েছে। একদিকে চলে চিকিৎসাসেবা অন্যদিকে প্রস্তুতি। এ নিয়ে বিতর্ক সিলেটে। আগে থেকে সতর্ক হননি সংশ্লিষ্টরা। গত ১০ দিন ধরে হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংকট চলছে। রোগীর জায়গা হচ্ছে না।

[৪] চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বাস্তবিকভাবে সিলেট হাসপাতালে এসে যারা ভর্তি হন তারা অনেকেই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এসে ভর্তি হন। তাদের প্রায় সবার অক্সিজেন সাপোর্ট লাগেই। অনেক রোগীর আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন। ফলে আইসিইউতে রেখেই তাদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো সিলেটে আইসিইউতে মৃত্যুর সংখ্যা কম।

[৫] হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. সুশান্ত কুমার মহাপাত্র জানিয়েছেন, গত তিন মাসে তাদের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ জন রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। এই মৃত্যু কোনো ভাবেই কাম্য নয়। একটি মৃত্যুই চিকিৎসকের কাছে বড়। সুতরাং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও হাসপাতালের চিকিৎসকরা যুদ্ধ করছেন। যখন কোনো রোগী হাসিমুখে বাড়ি ফিরে এর চেয়ে আনন্দের কিছুই নেই। আইসিইউর জন্য একাধিক দক্ষ ডাক্তার টিম রয়েছেন। তারা দিন কিংবা রাত সব সময়ই রোগীকে নিয়ে যুদ্ধ করছেন। এ কারণে দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে সিলেটের শামসুদ্দিন হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যু হার কম।

[৬] তিনি জানান, এতেও তারা সন্তুষ্ট নয়। আরো যাতে ভালো চিকিৎসা দেয়া যায় সেদিকে তারা মনোনিবেশ করছেন। সিলেটের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নর্থইস্ট গত ১৫ দিন ধরে কোভিড চিকিৎসা শুরু করেছে। সব মিলিয়ে তারা গতকাল পর্যন্ত ১০৮ জন করোনা আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন।

[৭] হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, তার হাসপাতালে উপসর্গ, কোভিড মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১৬ জন রোগী মারা গেছেন। মৃত্যুর সংখ্যা যাতে আরো কমানো যায় সেজন্য তারা চিকিৎসাসেবা আরো ভালো করার চেষ্টা করছেন। তারাও একাধিক দক্ষ ডাক্তার টিম তৈরি করেছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে সিলেট বিভাগে এ পর্যন্ত ৪৬ জন করোনা রোগী মারা গেছেন। কোনো ভাবেই এই মৃত্যু সংখ্যা কম নয়। বরং এই সংখ্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন সব মহল।

[৮] মৃত্যু কমাতে হলে চিকিৎসা সেবা উন্নত করার বিকল্প নেই বলে জানান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তবে সেই সাপোর্ট তারা কম পাচ্ছেন। এরপরও সিলেটের চিকিৎসকরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে কাজ করছেন। ওসমানীর উপ- পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় জানিয়েছেন, সিলেটে কোভিড চিকিৎসায় আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার ডা. ইউনূসুর রহমান। শুরুতে অনেকেই ভয়ে নমুনা সংগ্রহ করতে রোগীর কাছে যেতেন না। তিনি নিজেই ওসমানী থেকে শামসুদ্দিনে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করেন। কোভিড ওয়ার্ডে ডাক্তারদের নিয়ে ঘুরে আইসিইউ পরিদর্শন করেন। কখনো কখনো নিজের ডিউটির বাইরে গিয়ে নিজেই রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি শামসুদ্দিন হাসপাতালে ডাক্তার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আগে হাসপাতালের মোট ডাক্তার ছিলেন ১২ জন। এখন সেখানে ডাক্তার সংখ্যা ৩৫ জন। মেডিসিনের তিনজন কনসালটেন্ট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামর্থ্য অনুযায়ী স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরতরা গিয়েও রোগীর সেবায় নিয়োজিত হচ্ছেন। ফলে ডাক্তারদের আন্তরিকতার কারণেই মহামারি করোনার সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব হচ্ছে। এখন লড়াই চলছে চিকিৎসা সেবার পরিধি বাড়ানো নিয়ে। সেই লড়াইয়েও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা আন্তরিক হয়ে কাজ করছেন।

[৯] এদিকে সিলেট বিভাগে প্রতিদিন বাড়ছে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। বিভাগের মধ্যে শুধু সিলেট জেলাতেই আক্রান্ত ১৩ শ’র বেশি। এ পর্যন্ত বিভাগে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ২১৪৩। আর ইতিমধ্যে করোনা জয় করে সুস্থ হয়েছেন ৪৫১ জন। অর্থাৎ মোট আক্রান্তের প্রায় ২১ ভাগ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এর মধ্যে সিলেটে ১৪০ জন, সুনামগঞ্জে ১০০ জন, হবিগঞ্জে ১৪২ জন ও মৌলভীবাজারে ৬৯ জন। বর্তমানে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ২০৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে ৫৫ জন সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে ১১৬ জন, হবিগঞ্জের হাসপাতালে ২৭ জন ও মৌলভীবাজারে ৫ জন।

[১০] স্বাস্থ্য বিভাগ সিলেটের সহকারী পরিচালক ডা. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, চিকিৎসকরা কোভিড নিয়ে প্রথম পর্যায়ে কিছুটা ভয়ে ছিলেন। কিন্তু সেই ভয় এখন আর নেই। ফলে রোগীর চিকিৎসা প্রদানে গাফিলতি কম হচ্ছে। আর আন্তরিকতার সঙ্গে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার কারণেই মৃত্যুর সংখ্যা আনুপাতিক হারে কম। আরো যাতে ভালো চিকিৎসা দেয়া যায় সে কারণে ডাক্তারদের মোটিভেশন করা হচ্ছে।মানবজমিন, যুগান্তর

সর্বাধিক পঠিত