প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির লাশ দাফন করি: ইউসুফ মোল্লা টিপু

এখন করোনাকাল। চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনা আক্রান্ত হয়ে অনেকেই মারা যাচ্ছেন। যারা মারা যাচ্ছেন তাদের লাশের পাশে আসে না আপনজনেরা। ভাইরাসে আক্রান্ত হবেন বলে। চরম নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে প্রতিবেশীরা ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। কবরস্থ করার আগে শেষবারের মত লাশের মুখটি দেখতে চান না স্বজনরা। এমন কঠিন সময়ে এগিয়ে এসেছেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিবেক। জীবনের ঝুকি নিয়ে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় যেখানে করোনা আক্রান্ত কেউ মারা যান সেখানেই ছুটে যায় বিবেক’র সদস্যরা। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে লাশ দাফন করেন টিম বিবেক’র সদস্যরা। বর্তমান করোনায় নিহত লাশ দাফনে আস্থা ও নির্ভরশীলতার প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছে বিবেক। আমি মাহফুজ নান্টু। আমাদেরসময়.কম, কুমিল্লা প্রতিনিধি।

কথা হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিবেক’র প্রতিষ্ঠাতা ও মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপুর সাথে। তিনি জানান, কিভাবে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির লাশ দাফন করেন, সেখানে কি পরিস্থিতি অবলোকন করেন, সেখানে হৃদয়বিধারক দৃশ্যর অবতরনা হয়, গোছল -জানাযার নামাজ ও লাশের কবরস্থ করার আনুষ্ঠানিকতা কিভাবে হয় তার আদ্যপান্ত বলেছেন। আমাদেরসময়.কম পাঠকদের জন্য এমন এমন সব ঘটনার চুম্বক অংশ তুল ধরে হলো।

আমাদেরসময়.কমঃ কবে থেকে করোনা আক্রান্ত মারা যাওয়া লাশ দাফন শুরু করেন ?

টপু : গত ১৮ মে কুমিল্লা মহানগরীতে প্রথম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান ব্যাংক কর্মকর্তা মাহবুব এ এলাহী। উনার লাশ দাফনের মাধ্যমে বিবেকের এ কার্যক্রম শুরু হয়।

আমাদেরসময়.কম : কবে থেকে এমন মহৎ কাজ শুরু করেন ?

টিপুঃ আমি মহানগর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক। বিবেকর প্রতিষ্ঠাতা। যখন করোনা শুরু হয় তখন মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছা জাগে। আমি মনে করি করোনা শুরু হয়,সেই সাথে মানুষের সেবা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এমন ক্রান্তিকালে মানুষের সেবা করতে না পারলে জীবন বৃথা। সেই থেকে ইচ্ছা জাগে। সেই ইচ্ছা পূরনে গত ২৮ মার্চ থেকে নগরীর বিভিন্ন জায়গায় জীবানুনাশক স্প্রে করি, হ্যান্ড সেনিটাইজার- মাস্ক ও খাদ্য সামগ্রী বিতরন করি। তার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরত্ব দিয়ে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে শাশের গোছল জানাযা ও কবরস্থ করি।

আমাদেরসময়.কম : করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ দাফনে আত্মীয়-স্বজনদের অনীহা রয়েছে। এমন বিষয়ে আপনার টিমের অভিজ্ঞতা শুনতে চাই।

টিপু : সত্যি বলতে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশের সাথে কতটা অমানবিক আচরণ করা হয় তা স্বচক্ষে না দেখলে বুঝা মুশকিল। প্রথমে যখন ব্যাংক কর্মকতা মাহবুব এ এলাহীর দাফন করার জন্য খবর আসে আমার টিম প্রস্তুত হয়। সবাই পিপিই,হ্যান্ড গ্লাবস,গগলস পরে মৌলভী পাড়া ওই ব্যাংক কর্মকর্তার এলাকায় যাই। রাস্তা শুনসান নিরবতা। কেউ একজন দূর থেকে দেখিয়ে দিলো মারা যাওয়া ব্যক্তির বাসা। একন আরো বিপদ। কোন রুমে লাশ তা কেউ দেখিয়ে দেয় নি। পরে দূর থেকে একজন লাশের কক্ষ দেখায়। আমরা রুমে গিয়ে যা দেখি তা বর্ণনা করা কষ্টের। মাহবুব এ এলাহীর একটি পা খাটে, আরেকটি সম্ভবত সুকেসের সাথে লাগানে। মনে হচ্ছে ছটফট ছটফট করতে মারা গেছে। কেউ এগিয়ে আসে নি। এমন একটা জায়গা থেকে লাম বের করে আনতে আমাদের ১২ জনের খুব কষ্ট হয়েছে। পরে লাশের গোছল শেষ করি। কাফনের কাফণ পড়িয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করি। বাসায় কেউ লাশের মুখ দেখবে কিনা জানতে চাই। কারো কোন সাড়াশব্দ নেই। মারা যাওয়া মাহবুব এ এলাহীর বড় ভাই এগিয়ে আসছিলেন। ঠিক ওই সময় তার জন্মদাতা বাবা- মা’র নিষেধে ফিরে যায় ভাই। এমন দৃশ্য দেখে আমার টিমের সবার চোখে পানি জমে। আমি জ্ঞান হারাই। পরে জ্ঞান ফিরলে লাশ নিয়ে জানাযার নামাজ আদায় করি। পরে কবরস্থ করি।
আরেকটি ঘটনা বলি। গত বৃহস্পতিবার একজন মাওলানা মারা গেলেন। তিনি ও তার পরিবার গত রমজানে ১৮ বার পবিত্র কোরান খতম করেছেন। যখন তিনি মারা গেলেন তখন আমরা উনার বাসায় হাজির হই। যে দৃশ্য দেখলাম তা বলি কেমনে। ঘরের ভেতর লাশ এবং তার স্ত্রী সন্তান বাহিরে থেকে তালা মারা। পরে বাড়ির মালিককে ডাকলাম। একটি তালা খুলে ফেলি। আরেকটি তালা বাকি। জিজ্ঞেস করলাম কে আরেকটি তালা মেরেছে। পরে জানতে পারলাম এলাকাবাসী। আমি খুবই অবাক হই। যাক পরে হাতুড়ী দিয়ে তালা ভাঙ্গে লাশ বের করি। তারপর দাফন কাফন শেষ করি।

আমাদেরসময়.কমঃ এখন পর্যন্ত কতজনের লাশ দাফন করেছেন?

টিপুঃ মহামারিতে মারা গেছেন। তাই তাদেরকে শহীদ বলা হয়। আমি বলবো এখন পর্যন্ত বিবেকের টিম ৮ জন শহীদ ভাইয়ের লাশ আমরা ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী দাফন করতে সক্ষম হয়েছি।

আমাদেরসময়.কমঃ কিভাবে লাশ দাফনের প্রস্তুতি নেন?

টিপুঃ আমরা ফোনেই খবর পাই। তাপর টিমের সবাইকে প্র¯তুত করি। প্রত্যেকে পিপিই পড়ি,হ্যান্ড গ্লাবস,গগলস পড়ি। আমাদের টিমে একজন ইমাম আছে। উনাকে প্রস্তুত করি। কখনো টিমের একাংশকে মারা যাওয়া ব্যক্তির বাড়ী পাঠিয়ে দেই। কবর খোঁড়ার জন্য। কবর খোঁড়ার জন্যও লোক পাই না। এখন পর্যন্ত আমাদের টিম ৩ টা কবর খুড়েছে। যাক যে কথা বলছিলাম পিপিই পড়াসহ সব রকম প্রস্তুতি নেই। তারপর মারা যাওয়া ব্যক্তির বাড়ী গিয়ে সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করি।

আমাদেরসময়.কমঃ একটি লাশ কবরস্থ করতে অনেক খরচ হয়?

টিপুঃ সত্যি বলতে আমরা যে পিপিই পড়ি তার এককটার মূল্য আড়াই হাজার টাকা। পাশাপাশি হ্যান্ড সেনিটাইজার, মাস্ক মিলিয়ে একটি লাশ দাফনে আমাদের গড়ে ৩০ হাজার টাকা খরচ। সে টাকাটা আমি আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে খরচ করি।

আমাদেরসময়.কমঃ কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

টিপুঃ অনেক সাড়া পাচ্ছি। দেশ ও দেশের বাইরে থেকে সবাই উৎসাহ দিচ্ছে। অনেকে আমাদের সাথে কাজ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করছে। এছাড়া নগরীর বাইরে থেকে লাশ দাফনের খবর আসছে। তবে আমরা আগেই বলছি আমরা যে পরিমান লোকবল তা দিয়ে সিটি কর্পোরেশনের বাইরে গিযে কাজ করা সম্ভব নয়। আরেকটা বিষয় আমরা প্রশাসনিক সার্পোটটা আরো চাই।

আমাদেরসময়.কমঃ এমন কাজের ভালো কাজের আগ্রহ সর্ম্পকে জানতে চাই

টিপুঃ আমি একজন মুসলমান। আমি বিশ্বাস করি শহীদের দাফন কাফন করার মত সৌভাগ্য আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন বলেই হযতো আমি এমন কাজ করতে পারছি। এচাড়াও আমার পরিবার আমাকে সার্পোট করছে। আমার টিমের সবাই মানুষের সেবা করার মাঝে দিয়ে নিজেদের জীবন পার করতে চান। আসলে এমন কাজে ঐশ্ব্যরিক শান্তি আছে। আমরা সে শান্তির পরশ নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।

আমাদেরসময়.কমঃ করোনার মত এমন ক্রান্তিকালে আমাদেরসময়.কম এর মাধ্যমে সবার উদ্দেশ্য যে বার্তাটি দিতে চান ?

টিপু : আমি সবার উদ্দেশ্য বলতে চাই আপনারা পাড়া মহল্লায় টিম তৈরী করুন। যারা করোনায় মারা যায় তাদের দাফন কাফনের জন্য আমাদের সবার দায়িত্ব রয়েছে। বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির লাশ থেকে ৩ ঘন্টা পর আর করোনা ভাইরাস সংক্রমন ঘটে না। তাই অদুর ভবিষ্যতে যদি কেউ মারা যায় তাহলে আপনারা লাশের দাফন কাফনের সাথে অমানবিক আচরন করবেন না। লাশের যথাযথ ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত